দীঘিনালা প্রতিনিধি
দীঘিনালায় যেন কোনভাবেই বন্ধ হচ্ছে না পাহাড় কাটা। আড়ালে, আবডালে, বিভিন্ন কৌশলে চলে পাহাড় কাটা। কোন জায়গার সংবাদ পেলে প্রশাসনের অভিযান, ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা, জরিমানা আদায় করা হয়। তখন সেটি তাৎক্ষণিক বন্ধ হলেও পরে আবার অন্য কোথাও কৌশল পাল্টিয়ে নতুন করে শুরু হয় পাহাড় খেকোদের পাহাড় কাটা। জেলার দীঘিনালায় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে পেলোডার দিয়ে কাটা হচ্ছে পাহাড়। ঘটনাটি উপজেলার মেরুং ইউনিয়নের ছোটমেরুং-চোংড়াছড়ি সড়কে ১৬নম্বর নামক স্থানে মসজিদ সংলগ্ন।
বর্তমান ঘটনাটি এরকম নতুন এক কৌশলে শুরু করা হয়েছে। দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে পেলোডার। গভীর রাতে পাহাড় কেটে ভোরে পেলোডার সরিয়ে ফেললেও পরের রাতে আবার একই কায়দায় অব্যাহত থাকে পাহাড় কাটা এমনটাই অভিযোগ এলাকাবাসীর।
অথচ আইনে রয়েছে, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন- ২০১০-এর ৪ ধারার ৬ (খ) এ বলা আছে, ‘কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কতৃক সরকারী বা আধা সরকারী বা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করা যাইবে না।’
প্রায় সপ্তাহ যাবত রাতে পাহাড় কাটার যজ্ঞ চলছে স্থানীয়দের নিকট থেকে এমন সংবাদ পেয়ে বৃহষ্পতিবার মধ্যরাতে সরেজমিনে গিয়ে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়। রাত ৯টার দিকে পাহাড় কাটা শুরু হয়েছে এমন খবর পাওয়ার পর রওয়ানা করা হয়। সাংবাদিক যাওয়ার সংবাদ কোন না কোন ভাবে পেয়ে পৌছার আগেই সরে যায় পেলোডার। ফিরে আসার পর রাত ১২টার দিকে আবারো শুরু করা হয় পাহাড় কাটা। আবারো রাত সাড়ে ১২টার দিকে পৌছলে পাওয়া যায় সত্যতা।
দেখা যায়, বিশালাকৃতির পাহাড়টি কাটা প্রায় শেষ পর্যায়ে। পাকা সড়কের পাশের অংশটি কাটার বাকি; সেটি কাটা হবে সবার শেষে। কারণ সে অংশ কর্তনকৃত অংশকে আড়াল করে রাখার কাজ করছে। প্রথম পর্যায়ে পাহাড়টির প্রায় ৮/১০ ফিট উচ্চতার সমান কেটে নিচু করা হয়েছে। এরপর দ্বিতীয়বারের মতো কাটা অংশটি আরো ৩/৪ ফিট নিচু করার জন্য আবারো কাটা হচ্ছে। প্রায় সপ্তাহখানেক ধরে মুল পাকা সড়কের পাশে পাহাড় কাটা চললেও রহস্যজনক ভাবে বিষয়টি যেন সবার অজান্তেই ঘটে চলেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন ধরেই রাত গভীর হলে পেলোডার দিয়ে পাহাড় কাটা শুরু হয়, চলে ভোর রাত পর্যন্ত। সারাদিন পেলোডারটি ঘটনাস্থল থেকে দুরে সরিয়ে রাখা হয়। এমন তথ্যের প্রেক্ষিতে বৃহষ্পতিবার রাতে ঘটনাস্থলে যাওয়া হয়। দ্বিতীয়বার কাটার সময় আবারো ঘটনাস্থলে পৌছলে পেলোডারের চালক সাংবাদিকের উপস্থিতি দেখেই স্টার্ট বন্ধ করে সট্কে পরেন। এগিয়ে আসেন নুরুল কালাম ওরফে ভূট্টো নামের এক ব্যক্তি। যিনি মেরুং (দক্ষিণ) ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
জানতে চাইলে তিনি জানান, এটি তাঁর নিজস্ব পাহাড়। এখানে একটি খামার বাড়ি করার জন্য তিনি পাহাড়টি কাটাচ্ছেন। পাহাড় কাটাতো বেআইনি, অনুমতি না নিয়ে রাতের অন্ধকারে পেলোডার দিয়ে কাটা কি আইন সঙ্গত; এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোন উত্তর দেননি।
ঘটনাস্থলের পার্শ্ববর্তী বাসিন্দা মো. শামছু মিয়া (৫৫) জানান, প্রায় এক সপ্তাহ থেকে পাহাড়টি কাটা হচ্ছে। তবে কখনো দিনের বেলায় কাটা হয় না, শুধু রাতে কাটা হয়। শুধু রাতে কেন কাটা হয় এমন বিশেষ কারণ তিনি বুঝতে পারেননি। এক প্রশ্নের জবাবে শামছু বলেন, মেরুং এলাকার ভূট্টো এই পাহাড়টি কাটাচ্ছেন বলেন তিনি জানেন।
এর পর দিন সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে পেলোডারটি পাওয়া যায়নি। পরে খোঁজ করে দেখা যায় রাতের সেই পেলোডার দিনে অবস্থান করছে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৫কি.মি. দুরে ছোটমেরুং দাখিল মাদ্রাসার পাশেই একটি বাড়ির সামনে। অনেক চেষ্টা করেও পেলোডারের চালকের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
ছোটমেরুং বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি এবং ভিডিপি (গ্রাম প্রতিরক্ষা দল) ক্লাবের সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘রাতে পাহাড় কাটার বিষয়টি আমি শুনেছি। পাহাড় কাটা বেআইনী, এব্যাপারে প্রশাসনের তদন্তপূর্বক ব্যাবস্থা গ্রহন প্রয়োজন।’
মেরুং ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ৬নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, আমি মেম্বার হলেও বিষয়টি কেউ আমাকে অবগত করেনি। বিষয়টি লোকজনের নিকট শুনেছিলাম। এর পর ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখব ভেবেছি কিন্তু ব্যাস্ততার কারণে যাওয়া হয়নি। তবে অবৈধভাবে পাহাড় কাটার ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত পূর্বক আইনী ব্যাবস্থা গ্রহনের জন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন হেলাল মেম্বার।
খাগড়াছড়ি পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলনের সভাপতি প্রদীপ চৌধুরী জানান, দীঘিনালায় এর আগেও কয়েকবার পাহাড় কাটার ঘটনা ঘটেছে, তখন আইনী প্রক্রিয়ায় পাহাড় কাটা বন্ধও করা হয়েছে; মামলাও করা হয়েছে। আর বর্তমান সরকার পরিবেশ সুরক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতিতে অটল। তাই পাহাড় কাটা বন্ধ করতে এবং অপরাধিকে বিচারের আওতায় আনতে প্রশাসন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আরো সচেষ্ট তৎপরতা প্রয়োজন। সর্বশেষ প্রয়োজনে পরিবেশ আদালতে যাওয়া হবে বলেও জানান প্রদীপ চৌধুরী।
ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ নেতার এমন কান্ডে উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হাজি মোহাম্মদ কাশেমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি উনার জানা নেই। পাহাড় কাটা বেআইনি। আওয়ামীলীগ কোন বেআইনি কাজের পক্ষে না। এ ঘটনায় প্রশাসন তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আরাফাতুল আলম জানান, পাহাড় কাটা আইনত নিষেধ রয়েছে। ঘটনাটি যাচাই করে দেখা হবে, কেউ যদি বেআইনিভাবে পাহাড় কাটে তার বিরুদ্ধে আইনগতভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
