সুহৃদ সুপান্থ
বেশ ঘটা করেই গেলো ৩ সেপ্টেম্বর নিজেদের বার্ষিক সাধারন সভা শেষ করেছে রাঙামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থা। সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত পর্যটনের অভিজাত অডিটোরিয়ামে বিপুল আয়োজনে,উপস্থিতির সুযোগ ছিলোনা সংবাদকর্মীদেরও। ফলে জেলার বরেণ্য কিছু ক্রীড়াবিদ সম্মাননা দেয়ার সংবাদও আসেনি জাতীয় বা আঞ্চলিক গণমাধ্যমগুলোতে। এনিয়ে অনুষ্ঠানেই কথা বলেছেন একাধিক অতিথি। তাতে কিইবা যায় আসে জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্তাদের।নিয়তির কি নির্মম পরিহাস,সংবাদকর্মীদের না ডেকে,বহু কিছুই আড়াল করার চেষ্টার সাধারন সভায় ঠিকই এড়ানো যায়নি অনভিপ্রেত কিছু পরিস্থিতি,বাকবিতন্ডা । কিন্তু সব আলোচনা ছাপিয়ে এখন মূল আলোচনায় সভা উপলক্ষ্যে প্রকাশিত ‘বার্ষিক প্রতিবেদন’ নিয়েই। এই প্রতিবেদনেই জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের সাবেক খেলোয়াড় চম্পা চাকমা জাতীয় দলে খেলাকালিন তার সাথে ‘নেপোটিজম’ বা স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলেছেন তারই সতীর্থ খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে ! অথচ কি আশ্চর্য,চম্পা এখনো বিসিবির অধীনে আম্পায়ার হিসেবে কাজ করছেন ! খোদ জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রকাশনায় জাতীয় দল নিয়ে এমন অভিযোগে বিস্মিত ক্রীড়াঙ্গনের মানুষ। বিস্মিত ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা। তবে সবচে মজার ব্যাপার হলো, এই অভিযোগের দায় স্বীকার করছেন না, জেলা ক্রীড়া সংস্থার কেউই। অন্যদিকে চম্পা চাকমা বলছেন-‘আমিতো এমন কথা বলিনি’!
রাঙামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার বার্ষিক প্রতিবেদনে চম্পা চাকমা সম্পর্কিত বর্ণনার ২৮ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে ‘‘সে বছর আবার আফ্রিকার টিমের সঙ্গে খেলার ডাক আসে। কিন্তু খেলার পরিবর্তে তাকে সাইড লাইনেই বসে থাকতে হয়েছিলো এক্সটা খেলোয়াড় হিসেবে। পরে যখন আবার ফিরে ওডিআই টিম হয়,চম্পা তখন ভেবেছিলেন এবার বোধ হয় সুযোগ পাবে,কিন্তু বিধি বাম, দলের কিছু খেলোয়াড়ের নেটোটিজমের কারণে সেবারও ডাক পায়নি।এরপর টি-২০ ম্যাচ থেকেও বাদ দেয়া হয়। এতে হতাশ হয়ে পড়ে চম্পা,যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তার মূল্যায়ন হয়নি।’
এমন অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বর্তমানে জোরারগঞ্জে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে শারীরিক প্রশিক্ষক হিসেবে চাকুরিরত চম্পা চাকমা বলেন,‘ আমিতো জাতীয় দলে নেটোটিজমের শিকার হইনি কখনো, তাহলে এমন কথা কেনো বলব ?’ মূলত জেলা ক্রীড়া সংস্থার অফিস সচিব লালু ভাই আমার সাথে যোগাযোগ করে তার একটি বায়োডাটা দেয়ার জন্য আমি একজন দিদির লেখা সেই বায়োডাটা কপি করে তাকে দিয়েছি। সেটা পড়েও দেখিনি ভালো করে। এমন কথাতো সেখানে থাকার কথা নয়। আমি তবুও জেলা ক্রীড়া সংস্থার সেক্রেটারিও অন্যান্যদের সাথে কথা বলছি এখনই,এটা কোনভাবে সংশোধন করা যায় কিনা। কারণ আমি বিসিবির নিয়মিত আম্পায়ার হিসেবে কাজ করছি। তারা এটি দেখলে আমার জন্যও সমস্যা হবে।’
তবে ভিন্ন ভাষ্য দিচ্ছেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মামুনুর রশীদ ও সেক্রেটারি শফিউল আজম।
অ্যাডভোকেট মামুন বলছেন, ‘লেখাজোকার এসব বিষয় দেখেছে সেক্রেটারি ও অফিস সচিব। আমাকে শুধুমাত্র বলেছে,প্রকাশনাটি দেখে দিতে, আমিতো প্রতিটা লেখা আর ওভাবে পড়িনি। কারণ লেখা তো তারাই দিয়েছে। আমি লেখা পেয়েছি,দিয়েছি। লেখার তথ্য বা অন্যান্য বিষয়ে সেক্রেটারি বলতে পারবে।’ জাতীয় দলে ‘নেপোটিজম’র বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘এটা আসলে আমিও খেয়াল করিনি। দেখলে হয়ত রাখতাম না।’
অন্যদিকে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারন সম্পাদক শফিউল আজম বলছেন, ‘আমরা জয়া চাকমা ও চম্পা চাকমার তথ্য ঠিক সেইভাবে পাইনি। তাই ইন্টারনেটের সহায়তা নিয়ে কিছু তথ্য নিয়েছি। আমি ব্যস্ততার কারণে এটা তাড়াহুড়োয় খেয়াল করিনি। এটা ভুল হয়ে গেছে। এমন বিষয় প্রকাশনায় যাওয়া ঠিক হয়নি। এখন তো আর কিছু করারও নেই।’
তবে রাঙামাটির প্রবীণ সাংবাদিক ও ক্রীড়া সংগঠক সুনীল কান্তি দে বলছেন,‘ এখন এর-ওর উপর দোষ চাপিয়ে লাভ নেই,এর দায় সংশ্লিষ্ট সকলের । জেলা ক্রীড়া সংস্থা এর দায় এড়াতে পারেনা। এমন স্পর্শকাতর ইস্যুতে সতর্ক থাকতে হয়। মন চাইলো আর যা খুশি লিখে দিলাম আর প্রকাশনা করে ফেললাম, সেটা তো হয়না।’
রাঙামাটি জেলা ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও ক্রীড়া সংগঠক নাছিরউদ্দিন সোহেল বলছেন, রাঙামাটি থেকে অনেকেই জাতীয় দলে খেলেছে,জাতীয় পর্যায়েও বিভিন্ন লীগে খেলেছে। আমরা কখনই শুনি নাই যে, রাঙামাটির কাউকে জাতীয় পর্যায়ে বঞ্চিত করেছে বা বৈষম্য করেছে। চম্পার সাথেও এমন কোন ঘটনা ঘটেছে বলে শুনিনি। আর চম্পা নিজেও তো বিষয়টি অস্বীকার করছে। তাহলে কেনো এমন অভিযোগ জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রকাশনায় ? এই কারণে বিসিবির সাথে আমাদের দুরত্ব তৈরি হতে পারে,এর দায় কে নিবে?’
রাঙামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারন সম্পাদক ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়ার বরুন দেওয়ান বলছেন, ‘ যদি চম্পা না বলা সত্ত্বেও এটি ছাপা হয়,তবে তো বিষয়টি অত্যন্ত দু:খজনক। এসব বিষয়ে অনেক সতর্ক থাকতে হবে সবাইকে। জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রকাশনায় এমন ভুল বিষয় থাকা উচিত নয়। বিষয়টি আমাদের সবার জন্যই দু:খজনক।’
