অরণ্য ইমতিয়াজ
১৯৭৫ সাল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবাওে নৃশংস হত্যার পর স্তব্দ আওয়ামীলীগ সারাদেশে ধীরলয়ে ঘুরে দাঁড়ালেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সেই ঘুরে দাঁড়ানোটা বেশ দীর্ঘায়িতই হয়,আঞ্চলিক রাজনীতির নানা মেরুকরণে। বদিউল আলম-রেহানউদ্দিন-সুদীপ্তা দেওয়ানরা নৌকা মার্কা আর দলের পতাকা উর্ধে তুলে ধরে রেখে পাহাড়ে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রিয় দলটিকে। কিন্তু পুরো জেলার পৌরসভা,উপজেলা, এমনকি ইউনিয়ন পরিষদগুলোতেও আওয়ামীলীগের প্রার্থী,সমর্থিত প্রার্থী কিংবা নেতা-কর্মীর জয়ের স্বপ্ন যেনো কল্পনারও অতীত। নির্বাসিত জীবন শেষে ভারত থেকে ফেরত আসার পর ১৯৯১ সালে জীবনের প্রথম সংসদ নির্বাচনে দাঁড়িয়ে সবাইকে চমকে দিয়ে নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন পেয়ে এবং বিজয়ী হয়ে,পাহাড়ের রাজনীতিই চিত্রই যেনো বদলে দিয়েছেন একজন দীপংকর তালুকদার ! তিনিই স্বাধীন দেশে পার্বত্য রাঙামাটিতে নৌকা প্রতীকের প্রথম সংসদ সদস্য। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। দলের সাধারন সম্পাদক থেকে ১৯৯৬ সাল সভাপতি হওয়ার পর তিলে তিলে পাহাড়ের এপ্রাপ্ত থেকে ওপ্রান্ত গড়ে তুলেছেন দলের শক্ত ভীত। জেলা উপজেলা ছাড়িয়ে দূর ইউনিয়নেও তিনি সংগঠিত করেছেন আওয়ামীলীগকে। স্বাধীনতার পর শহরকেন্দ্রীক আওয়ামীলীগ যে দুরপাহাড়ের সবচে দুর্গম এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে এর কৃতিত্ব পুরোটাই দীপংকরের। এখন শুধু সংসদ সদস্যই নয়, জেলার বেশিরভাগ উপজেলা ও ইউনিয়নের বিজয়ী চেয়ানম্যান,ইউপি সদস্যরাই নৌকা প্রতীক ও আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী। নাহ্,সারাদেশের মতো ‘বিতর্কিত’ নির্বাচনে নয়, পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর শক্ত প্রতিরোধ আর লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়েই বিজয়ী তারা।
আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র হুমকির মোকাবেলা করে নিজের দল ও দলীয় নেতাকর্মীদের রক্ষায় জীবনের সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেছেন বারবার। লংগদু’র মতো একসময়কার বিএনপি ঘাঁটিতে পরিণত করেছেন আওয়ামীলীগের শক্ত ঘাঁটিতে। যে এলাকায় একসময় নৌকা বা আওয়ামীলীগের নামও উচ্চারণ করা যেতোনা,সেখানেও এখন নৌকার জয়ধ্বনি।
এসব কারণে দুরের উপজেলা,ইউনিয়ন কিংবা প্রত্যন্ত এলাকার একজন সাধারন কর্মীর কাছেও বিপুল ব্যাপক জনপ্রিয় দীপংকর তালুকদার। এই জনপ্রিয়তার কারণেই তিনি বারবার বিনাপ্রশ্নেই নির্বাচিত হয়েছেন সভাপতি কিংবা সংসদ সদস্য হিসেবে। কিন্তু সময়ের ফেরে বদলেছে বহুকিছুই,বহু কাছের মানুষ দূরে সরেছে,দূরের মানুষ কাছে এসেছে। তবে এবারের আওয়ামীলীগের সম্মেলনেই সম্ভবত রাজনৈতিক জীবনের ভিন্ন চেহারা দেখলেন লড়াকু দীপংকর।
তবে সবচে মজার ব্যাপার হলো,আওয়ামীলীগের এবারকার জেলা সম্মেলনে যারা প্রকাশ্যে দীপংকরের বিরোধীতা করে মাঠে নেমেছেন,তারা প্রায় সবাই শহরকেন্দ্রিক নেতা। তাদের বেশিরভাগই রাঙামাটি জেলা কমিটির শহুরে নেতা,পৌর কমিটি কিংবা সদর উপজেলার নেতা।
পাহাড়টোয়েন্টিফোর আওয়ামীলীগের অন্তত ২২ জন দায়িত্বশীল নেতার সাথে কথা বলেছে নাম প্রকাশ না করার শর্তে,যারা বর্তমান কমিটির পক্ষে কিংবা বিপক্ষে নানাভাবে ভূমিকা রাখছেন। মজার ব্যাপার হলো, অনুসন্ধান বলছে,জেলা শহরের বাইরের উপজেলাগুলোর প্রায় সব নেতাই দীপংকর-মুছার পক্ষে কথা বলছেন ! বিপরীতে জেলা শহরের নেতারা দীপংকরের বিরোধীতা করছেন ! বিষয়টি বিস্ময়কর বটে।
রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কমকে বলছেন-‘ দীপংকর তালুকদার আমাদের মূল্যায়ন করেননি। আমি বারবার গিয়েও একটা কাজ পাইনি,আমার মেয়ের চাকুরির জন্য বলেও কাজ হয়নি। কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাইনি। যেকোন সিদ্ধান্ত তিনি সেক্রেটারির সাথে কথা বলেই নিয়ে নেন, আমাদের মতামতের গুরুত্ব নেই। তাই আমরা পরিবর্তন চাইছি।’
সদর উপজেলা আওয়ামীলীগের এক নেতা বলছেন,দীপংকর তালুকদার জেলা পরিষদ পুনর্গঠনসহ নানা কাজে সবসময় উপজেলার নেতাদের মূল্যায়ন করেছেন,আমাদের সদর ও পৌর কমিটিকে মূল্যায়ন করেননি। এমনিক জেলার নেতাদেরও মূল্যায়ন করেননি। এর খেসারত তো দিতেই হবে।’
পৌর আওয়ামীলীগের এক নেতা বলছেন-‘ দীপংকর তালুকদার আমাদের পাত্তা দেননা। তার সাথে দেখা করতে,কথা বলতেও আমাদের সাধনা করতে হয়। তার মুডের উপর নির্ভর করে সবকিছু। এভাবে তো রাজনীতি হয়না। তাই আমরা পরিবর্তনের পক্ষে।’
মজার ব্যাপার হলো,জেলার নেতাদের বেশিরভাগের বক্তব্যেই প্রায় একই সুর। ব্যক্তিগত প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি,চাওয়া-পাওয়া,পাওয়া-নাপাওয়ার ক্ষোভের প্রতিধ্বনিই করছেন তারা।
বিপরীতে উপজেলা নেতারাই যেনো এক একজন ভীষণ কমিটেড,দলের কাছে,ব্যক্তি দীপংকরের কাছে।
লংগদু উপজেলা আওয়ামীলীগের একজন নেতা বলছেন-‘ একটু খেয়াল করলেই দেখবেন,যারা দীপংকরের বিরোধীতা করছেন,তারা আদতে কারা ? এরা প্রত্যেকেই সুবিধাভোগী। আরো বেশি সুবিধা ভোট করতে না পারায়,এরা দীপংকরের উপর ক্ষুদ্ধ। এদের কাছে দলীয় স্বার্থ নয়,নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থই মুখ্য। এই স্বার্থপরদের কাছে দল নিরাপদ নয়।’
লংগদু উপজেলা আওয়ামীলীগের আরেক নেতা বলছেন-‘জেলা শহরে বসে মিছিল মিটিং করাই রাজনীতি নয়,তৃণমূলে কিভাবে আমরা কি করি,সেটা জেলার এইসব নেতারা জানেওনা। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে ভোটের পরিসংখ্যান দেখেন,উপজেলাগুলো কত ভোট দিয়েছে আর জেলাশহরের এইসব হেভিওয়েট নেতারা কত ভোট আনতে পেরেছেন।’
বাঘাইছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি বৃষ কেতু চাকমা বলছেন,‘ আপনারা দেখে যেসব নেতাদের দাদা (দীপংকর তালুকদার) জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বানিয়েছিলেন,পৌরসভার মেয়র মনোনয়ন দিয়েছিলেন, তারাই প্রকাশ্যে আজ বিপক্ষে। কেনো জানেন ? আরো বেশি সুবিধা পায়নি বলে ! দ্বিতীয়বার চেষ্টা করেও চেয়ারম্যান হতে না পারায়,পৌরসভায় মনোনয়ন পেয়েও পরাজিত হয়ে আবার মনোনয়ন না পাওয়ায়, আবার অনেকেই ব্যক্তিগত আরো বেশি সুযোগ সুবিধা না পাওয়ায় এখন দীপংকর বিরোধীতার নামে অপরাজনীতি করছে।’
জেলা আওয়ামীলীগের দীপংকর সমর্থক এক নেতা বলছেন-‘যে নেতারা জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের জন্য পাঁচটা ভোট আনার ক্ষমতা রাখেনা,যাদের রাজনীতি জেলা শহরে বসে দলীয় কার্যালয় আর জেলা পরিষদ ও উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদারি কাজের ভাগাভাগি অবধি,তাদের কাছে দল ও রাজনীতি কোনটাই নিরাপদ নয়।’
সাবেক পৌর মেয়র হাবিবুর রহমান বলছেন,‘ যারা দীপংকর তালুকদারের বিরোধীতা করছে,তারা কারা ? আপনারা একটু তাদের নিকট অতীতের কার্যক্রমগুলো দেখুন। তারা কাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে এবং করছে,সেটা আওয়ামীলীগের তৃনমূল নেতাকর্মীরা জানে। কোন ষড়যন্ত্রেই কাজ হবেনা।’
কাউখালী উপজেলা আওয়ামীলীগের এক নেতা বলছেন,‘ যে নেতার নিজের উপজেলায় (নানিয়ারচর) আওয়ামীলীগ চেয়ারম্যান প্রার্থী দিতে পারেনা বছরের পর বছর,ইউনিয়নগুলোতে আওয়ামলীগের অস্তিত্ব নাই,প্রার্থী দেয়াতো দূরের কথা, সেই নেতাই পুরো জেলায় আওয়ামীলীগকে নেতৃত্ব দিতে চায়,বিষয়টি হাস্যকর। ওনি আগে নিজের উপজেলায় আওয়ামীলীগের ভীত দাঁড় করিয়ে দেখাক যে তিনি পারেন,তারপর আমরা বিবেচনা করব তাকে নির্বাচিত করব কিনা।’
কাউখালী উপজেলা আওয়ামীলীগের একজন শীর্ষ নেতা বলছেন,‘ তারা পরিবর্তনের কথা বলছে। অথচ একই ব্যক্তি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ছিলেন,এখন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান। আবার দলের সভাপতিও হতে চায়,সংসদ সদস্যও হতে চায়। একই ব্যক্তির যদি সব পদ লাগে বাকিরা কি করবে ? কিজন্য রাজনীতি করবে ? আঙ্গুল চুষবে ? পরিবর্তনের কথা বলে একজনকে সব খাওয়ানোর আয়োজন আমরা মানিনা।’
কাপ্তাই উপজেলা আওয়ামীলীগের একজন নেতা বলছেন, সংসদ নির্বাচনে যে নেতারা নৌকার পক্ষে ভোট চাইতে মাঠেই নামতে পারেনা,‘চাপত আছি’ বলে পালিয়ে বেড়ায়,তারাই এখন দাদা (দীপংকর)’র বিরোধীতা করছে। কেনো,কাদের ইশারায় করছে,এসব কাউন্সিলরা বুঝে গেছে।’
এই নেতা বলছেন-‘এই লড়াইটা মূলত দীপংকরের বিরুদ্ধে নয়। এটা আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধেই। এখানে একটি আঞ্চলিক দলের হয়ে যারা আওয়ামীলীগকে সেই দলের পকেট সংগঠন করতে চায়,তারাই আমাদের নেতৃত্বের বিরোধীতা করছে।’
কাপ্তাই উপজেলা আওয়ামীলীগের দায়িত্বশীল একজন নেতা বলছেন-‘জেলা শহরে যেসব নেতারা বসে সবাই মিলেও জেলা শহরের কেন্দ্রগুলোতে দলীয় প্রার্থীকে জেতাতে পারেননা,তারাই পরিবর্তনের নামে নাটক করছে। এসব আমরা বুঝি। এসব নেতারা দাদার সাথে ছাড়া কোনদিন নিজ উদ্যোগে একটা উপজেলা সফর করেছে ? খোঁজ নিয়েছে আমরা কেমন আছি ? এদের আমরা চিনি।’
সব মিলিয়ে লড়াইটা যেনো জেলা বনাম উপজেলার। জেলা কমিটির বেশ কিছু নেতার সাথে আছেন রাঙামাটি সদর উপজেলা ও রাঙামাটি পৌর কমিটির শীর্ষ নেতারা। অন্যদিকে উপজেলার নেতারাও বেশ সংঘবদ্ধ। ধারণা করা হচ্ছে,উপজেলার কাউন্সিলরদের ভোটের দুইতৃতীয়াংশেরই বেশি ভোট পাচ্ছেন দীপংকর। দীপংকরের সাথে তার পছন্দের প্রার্থী হিসেবে সাধারন সম্পাদক পদে পাড় পেয়ে যাবে মুছা মাতব্বরও। নিখিল বা কামাল, কোন প্যানেল করেননি এমন দাবি করলেও,তাদের সমর্থকরা প্রায় সবাই একই হওয়ায়,সেই আলোচনা ধোপে টিকছেনা। ফলে দীপংকর জিতলে মুছা জিতবেন,এমনটাই ভাবা হচ্ছে। তবে এসব ভাবনা যাদের উপর নির্ভর সেই কাউন্সিলররা সব চুপচাপ। সম্ভবত ব্যালটেই সব প্রশ্নের জবাব দেবেন বলে পণ করে আছেন।
প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে মোট ২৪৬ জন ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। যার মধ্যে সবচে বেশি কাউন্সিলর কাপ্তাইয়ে,সেখানে ২১ জন কাউন্সিলর আছেন,যাদের ভোট ফলাফল নির্ধারনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। উপদেষ্টা কমিটির ১৬ জন,জেলা কমিটির ৭৪ জন, লংগদু উপজেলার ১৬ জন,কাউখালীর ১৬ জন,রাজস্থলীর ৭ জন, নানিয়ারচরের ১২ জন, জুরাছড়ির ৮ জন, বিলাইছড়ির ৯ জন, বাঘাইছড়ি উপজেলা কমিটির ১৯ জন, বাঘাইছড়ি পৌর কমিটির ৯ জন, রাঙামাটি সদর উপজেলার ১১ জন,বরকল উপজেলার ১১ জন এবং রাঙামাটি পৌর কমিটির ১৭ জন কাউন্সিলরই নির্ধারন করে দেবেন ভোটের ফলাফল। তবে এদের মধ্যে রাঙামাটি সদর ও পৌর কমিটির যৌথ ভোট ২৮ টি,অন্যদিকে নয় উপজেলা ও বাঘাইছড়ি পৌরসভার ভোট ১২২ টি ! জেলা কমিটির ৭৪ আর উপদেষ্টা কমিটির ১৬ জন,যার মধ্যে আছেন উপজেলা থেকেও,তাদের ভোটই হয়ে উঠবে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।
যাদের ভোট বেশি সেই বাঘাইছড়ি,কাউখালী,লংগদু এবং কাপ্তাইয়ের কাউন্সিলররা কিন্তু চুপচাপ ! শহুরে বড় নেতা,দাপুটে কাউন্সিলর আর ভোটের রাজনীতিতে ব্রাত্য হয়ে থাকা ছোট দুয়েকটি উপজেলার গুরুত্বহীন নেতাদের বাগাড়ম্বর এর মেলায় তারা যেনো ধীরস্থির,শান্ত,চুপচাপ। এ যেনো ভয়াবহ ঝড়েরই আভাস ! কে জানে উপজেলার সাধারন কাউন্সিলরদের সাধারন ভোটেই ভেসে যায় কিনা যাবতীয় সব অহংকার,স্বার্থ কিংবা রাজনীতির কূটিল সব সমীকরণ !
