রাঙামাটির প্রভাবশালী অটোরিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনে বেশ কিছু ফ্যাক্টর গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ভূমিকা রাখবে। এইসব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন প্রার্থী ও ভোটারদের সাথে কথা বলেছে পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম। কিন্তু বেশ কিছু প্রশ্ন তৈরি হলেও উত্তর মেলেনি সবকিছুর। তবে খোলামেলাভাবেই অনেক নেতা বলেছেন নিজেদের আকাংখা,চাওয়া পাওয়ার কথাও। এসব খোলামেলা আলোচনা আর কথোপকথনে উঠে এসেছে শহরের প্রভাবশালী এই সমিতির নানান মেরুকরণ,ফাকফোঁকর।
এক সংগঠন,দুই নাম !
রাঙামাটিতে কাল যে অটোরিক্সা চালকদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে,সেই সংগঠনটির দুটি নাম আছে ! সংগঠনটি শ্রম অধিদফতরে রাঙামাটি জেলা অটোরিক্সা শ্রমিক ইউনিয়ন নামে নিবন্ধিত হলেও সমাজসেবা অধিদফতরে রয়েছে ‘বেবিট্যাক্সি চালক কল্যাণ সমিতি’ নামে। সমবায়ে কোন নিবন্ধন নেই সংগঠনটির। তবে কাল অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে সংগঠনটি ‘রাঙামাটি জেলা অটোরিক্সা শ্রমিক ইউনিয়ন’ নামেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে রাঙামাটি জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রূপনা চাকমা বলেন,‘একটি মানুষের তো একটাই নাম থাকে,আমরা একটাকেই অনুমোদন দিয়েছি,কিন্তু তারা অন্য কোন নামে,অন্য কোথাও থেকে রেজিস্ট্রেশন নিলে আমরা কিছু জানিনা।’
এই বিষয়ে অটোরিকশা চালক সমিতির বর্তমান সভাপতি অলি আহমেদ বলেন,এটা আগের পুরনো নাম,যেটি আমরা সমাজসেবা থেকে নিবন্ধন নিয়েছি,অন্যটি শ্রম অধিদফতর থেকে নতুন করে পরে নেয়া হয়েছে। দুটি নাম থাকলেও একই নেতৃত্বই বিষয়টি সমন্বয় করে দুটি সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালক করে বলে জানিয়েছেন তিনি।
নিবন্ধন নেই সমবায়ে !
রাঙামাটি বেবিট্যাক্সি চালকদের কোন সংগঠনের নিবন্ধন নেই রাঙামাটি জেলা সমবায় কার্যালয়ে। দেশের অন্যান্য জেলায় এবং এমনিক রাঙামাটি পিকআপ মিনিট্রাক সমিতি,রাঙামাটি সড়ক পরিবহন চালক সমবায় সমিতি এবং উপজেলার বিভিন্ন চালক ও শ্রমিক সংগঠন সমবায়ে নিবন্ধিত হলেও অটোরিক্সা চালকদের এই সংগঠনটি সমবায়ে নিবন্ধিত নয়। নিবন্ধিত না হয়েও চালকদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা সংগ্রহ ও তহবিল সমৃদ্ধ করা যায় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে রাঙামাটি জেলা সমবায় কর্মকর্তা ইউসুফ হাসান চৌধুরী জানিয়েছেন, কোন সংগঠনই সমবায়ে নিবন্ধন ছাড়া কোন সমিতি পরিচালনা ও কোন নিয়মিত চাঁদা সংগ্রহ বা তহবিল সমৃদ্ধ করতে পারেনা। এটা যদি কেউ করে,সেটা নিয়ম বহির্ভূত।’ রাঙামাটি শহরের অটোরিক্সা চালকদের কোন সংগঠন সমবায়ে নিবন্ধিত নেই এবং তাদের নির্বাচন সম্পর্কেও কিছু জানেননা বলে জানিয়েছেন এই সমবায় কর্মকর্তা।
আছে দলীয় প্রভাবও
রাঙামাটি অটোরিকশা চালক সমিতির বেশিরভাগ সদস্যই বিএনপির অনুসারি হিসেবেই পরিচিত। বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জাতীয় নির্বাচনে এর প্রভাবও দেখা যায়। আবার অটোরিক্সা চালকদের নেতৃত্বে যারা এসেছেন বিভিন্ন সময়ে এদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলো বিএনপির সমর্থক। এবারো তাই স্বাভাবিকভাবেই রাজনীতির প্রভাব থাকবেই । রাঙামাটি জেলা বিএনপি ও আওয়ামীলীগের শীর্ষ কয়েকজন নেতার সাথে কথা বলে সেই ইঙ্গিতই মিললো। তবে কৌশলগত কারণে নিজেদের প্রার্থীর নাম সরাসরি প্রচার করে প্রচারণায় নামেননি তারা।
রাঙামাটি জেলা বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, প্রায় সবগুলো পদেই আমাদের নিজস্ব প্রার্থী আছে এবং জয়ের ব্যাপারেও আমরা আশাবাদী। যদি সরকারি দল চাপাচাপি না করে তবে আসবাবপত্র সমিতির নির্বাচনের মতো এখানেও নীরব ভোট বিপ্লবে আমাদের প্রার্থীরাই বিজয়ী হবে।
অন্যদিকে অটোরিক্সা চালক সমিতিকে বরাবরই সাংগঠনিকভাবে দুর্বল আওয়ামীলীগ। তবে সাম্প্রতিকবছরগুলোতে আগের চেয়েও অবস্থান সুদৃঢ় করেছে তারা। সভাপতি ও সম্পাদক পদের দুই প্রার্থী নিজেদের নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে দাবি করলেও তারা দুজনই আওয়ামীলীগের সমর্থক হিসেবেই পরিচিত।
রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতারা কৌশলগত কারণেই এই নির্বাচনের প্রার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয় চেপে রাখতে চাইছেন। শীর্ষ এক নেতা জানালেন, যেহেতু এই সমিতিতে বিএনপির ভোট বেশি,সঙ্গত কারণেই আমরা অরাজনৈতিকভাবে নির্বাচনে এগোতে চাই এবং বিজয়ী হতে চাই।
আওয়ামীলীগ ও বিএনপির একাধিক নেতার সাথে কথা বলা বোঝা গেছে,সরাসরি নির্বাচনের মাঠে না থেকেও এই নির্বাচনে ঠিকই খেলছেন তারা নেপথ্যে থেকেও। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা উভয়েই চাইছেন নিজেদের সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়ী করতে।
সদস্য পদ স্থগিত,কিন্তু ঠিকই নির্বাচনে !
রাঙামাটি অটোরিক্সা চালক সংগঠনের দীর্ঘদিনের নেতা হিসেবেই পরিচিত আব্দুল জলিল মজুমদার। তিনবার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জলিল বর্তমান কমিটির আগের কমিটির সভাপতি হিসেবে সর্বশেষ দায়িত্ব পালন করেছেন। এবারো সভাপতি পদেই প্রার্থী। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো গত দেড়বছর ধরেই তার সদস্য পদ স্থগিত ছিলো সংগঠনে ! শুধুই তিনি নন,তার কমিটির সাধারন সম্পাদক মনোরঞ্জন বড়–য়া,বেলাল হোসেন ও হাফেজ নুর ইসলাম এর সদস্যপদও স্থগিত ছিলো তহিবল তছরূপের অভিযোগে। অথচ জলিল এবং বেলাল দুজনই এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন সভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদক পদে !
আব্দুল জলিল অভিযোগের বিষয়ে বলেন, আমাদের সদস্য পদ স্থগিত ছিলো এটা সত্য,তবে আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ ছিলোনা,অভিযোগ ছিলো মনোরঞ্জন বড়–য়ার বিরুদ্ধে ৩ লক্ষ ১৭ হাজার টাকার,বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে ৯২ হাজার টাকার,হাফেজ নূর ইসলামের বিরুদ্ধে ৩৬ হাজার ৫০০ টাকার এবং অফিস সহকারি সঞ্জিত দাশের বিরুদ্ধে ২৯ হাজার টাকার! আমার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মে অভিযোগ ছিলেনা।’ তবুও কেনো সদস্য পদ,চাঁদা গ্রহণ ও ভাতা প্রদান স্থগিত ছিলো’- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ আমি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলাম,পরে সাধারন সভায় এই বিষয়টির মীমাংসা হয় এবং এ কারণেই আমি নির্বাচনে অংশ নিতে পারছি।’
তবে সভাপতি পদের আরেক প্রার্থী পরেশ মজুমদার দাবি করেন, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের কোন সুরাহা হয়নি। সাধারন সভায় এনিয়ে আলোচনাও হয়নি,একজন প্রসঙ্গটি তুললে সাধারন সম্পাদক বলেছিলেন,‘এটা নিয়ে বিরোধ করার দরকার নাই।’ যাদের সদস্যপদ স্থগিত ছিলো,তারা কি করে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এটা আমার বোধগম্য নয়। আমি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কাছেও বিষয়টি জানতে চেয়েছি,তারা কোন সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি।’ তিনি দাবি করেন, জলিল মজুমদারের কাছেও টাকা পাবে, নইলে তার সদস্যপদ কেনো স্থগিত ছিলো দেড় বছর ?’ পরেশ মজুমদার বলেন, সমিতির প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকার হিসাব তো দিতে হবে,সেটা কে দেবে ?
বর্তমান সভাপতি অলি আহমেদও বিষয়টি যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারাই যদি নির্বাচনে অংশ নিতে পারে,তবে তো কিছুই বলার নেই। এটা সংগঠনের জন্যই খারাপ উদাহরণ হলো।’
এই প্রসঙ্গে বর্তমান কমিটির সাধারন সম্পাদ শহীদুজ্জামান মহসিন রোমান বলেন,কিছু সমস্যা ছিলো,সেটা সাধারন সভায় সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতেই সমাধান হয়েছে। কোন প্রকার আর্থিক সমস্যা নাই। আর সংগঠন চালাতে গিয়ে অনেক বিষয় হয়,সেটাই হয়তো হয়েছে,এটা আমরা ঠিক করে নিয়েছি এবং অডিট রিপোর্টও ঠিক আছে। ’
মাঝে মাঝে আসেন ‘অতিথি নেতা’ !
রাঙামাটি অটোরিক্সা চালকদের সংগঠনটি শহরে বেশ প্রভাবশালী। শহরবাসির একমাত্র পরিবহন হওয়ায় তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছার কাছেও তাই জিম্মি থাকতে হয় শহরবাসিকে। এনিয়ে আছে নানান ক্ষোভ,বক্তব্যও। তবে মজার ব্যাপার হলো এই সংগঠনটির নেতৃত্ব দিতে বরাবরই বাইরে থেকে চালক নন,এমন ব্যক্তিদের ধার করে আনা হয়েছে ! গঠনতন্ত্রে না থাকলেও সদস্যদের গণসাক্ষর সংগ্রহ করে কখনো হাসান মাহমুদ বাদশা,কখনো এসএম আব্দুল কাদের,কখনো জাহাঙ্গীর আলম মুন্না আবার সর্বশেষ শহীদুজ্জামান মহসিন রোমানকে আনা হয়েছে নেতৃত্বে। অথচ এদের কেউই চালক নন,অথচ চালক কমিটির সম্পাদক !
এই বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলম মুন্না বলেন, অনেক বছর আগে আমাকে কিংবা বাদশা ভাই,কাদের ভাইদের যখন দায়িত্বে আনা হয়েছিলো,তখন অটোরিক্সা চালকদের মধ্যে নেতৃত্বের অভাব ছিলো,ছিলো নানান সমস্যা। এখন আর নেতৃত্বের সমস্যা নেই। অনেক তরুণ ও যোগ্য চালক আছেন যারা নেতৃত্ব দিতে পারেন। এখন আর বাইরে থেকে নেতা না এনে নিজেদের মধ্য থেকেই নেতৃত্ব নির্বাচন করা উচিত তাদের।
বর্তমান সাধারন সম্পাদক ও আবারো একই পদে প্রার্থী শহীদুজ্জামান মহসিন রোমান বলেন, আমি নিজের ইচ্ছায় এখানে আসিনি,চালকরা গণসাক্ষর নিয়ে চেয়েছে বলেই এসেছি। তারা আমাকে তাদের তহবিল সংরক্ষন এবং বিপদে আপদে পাশে পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়েই ডেকেছে,আমিও সাড়া দিয়েছি। তারা না চাইলে থাকব না। ’
‘চালক’ নেতৃত্ব চান অনেকেই
অতীতে বারবার অতিথি নেতৃত্ব ডেকে আনলেও এবার নিজেদের মধ্য থেকেই নেতৃত্ব চান অনেক চালক। তারা বলছেন,চালকের সুখ দু:খ চালক ছাড়া অন্য কেউ বুঝবেনা।
সভাপতি পদের প্রার্থী পরেশ মজুমদার বলেন, এটা তো সত্যি চালকের দু:খ চালক ছাড়া অন্য কেউ বুঝবেনা। এটা প্রমাণিতও। বাইরে থেকে বারবার আমরা নেতৃত্ব ধার করে এনেছি,এতে কি লাভ হয়েছে সংগঠনের ? আমি মনে করি নিজেদের ভেতর থেকেই নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। বাইরের মানুষ,মালিক কিংবা অন্য কেউ কখনই একজন চালকের কষ্ট,অনুভূতি,আবেগ বুঝবেনা। শ্রমিকের নেতৃত্ব শ্রমিক থেকেই আসা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাধারন সম্পাদক প্রার্থী আবুল কালাম চুঙ্গু বলেন, অবশ্যই আমাদের চালকদের নেতৃত্ব চালকদের মধ্য থেকেই বেছে নিতে হয়। একজন মালিক নিজেই যদি চালক সমিতির নেতা হয়,তবে সে চালকের স্বার্থ দেখবে নাকি মালিকের স্বার্থ দেখবে ?
বর্তমান কমিটির সভাপতি অলি আহমেদ বলেন, চালকের দু:খ,বেদনা বুঝবে আরেকজন চালক,মালিক বা অন্য কেউ একজন চালকের দু:খ বুঝবেনা। যোগ্য হোক কিংবা যে রকমই হোক,চালক সমিতির নেতৃত্ব অবশ্যই একজন চালককেই দিতে হবে। শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব শ্রমিকের হাতে না থাকায় সমস্যা হয় বলেও জানান তিনি।
৭০০ গাড়ী ১১০২ চালক !
রাঙামাটি অটোরিক্সা চালক শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্র জানিয়েছে,রাঙামাটি শহরে প্রায় ৭০০ গাড়ী চলাচল করে। তবে সমিতির সদস্য হিসেবে আছেন ১১০২ জন সদস্য। বর্তমান কমিটি তাদের মেয়াদে প্রায় সাড়ে তিনশত জনকে সদস্য করেছে বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো। সাধারনত পেশাদার চালক লাইসেন্স থাকলেই একজন চালক সমিতির সদস্য হতে পারেন। তাকে প্রাথমিকভাবে ২৭ হাজার টাকা ভর্তি ফি দিতে হয়। এর বাইরে একজন চালককে গাড়ী চালালে প্রতিদিন ১০ টাকা করে জমা দিতে হয় সমিতিতে। সেই সাথে সমিতির প্রত্যেক সদস্যকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিমাসে ৪০ টাকা চাঁদা দিতে হয় সমিতিকে। বর্তমানে সমিতির তহবিলে দুই কোটিরও বেশি টাকা আছে বলে জানিয়েছেন সমিতির দায়িত্বশীলরা।