শংকর হোড় ॥
হ্রদে পানি কম নাকি লোভ কোন কারণে কাপ্তাই হ্রদের মাছ আহরণের প্রথম সপ্তাহে ব্যবসায়ীদের লোকসানে সম্মুখীন হতে হয়েছে? এমন প্রশ্ন এখন জেলে-ব্যবসায়ীদের। এক সময় বিএফডিসি মাছ আহরণ শুরুর প্রথম সপ্তাহে আহরণের রেকর্ড নিয়ে গর্ব কিংবা তৃপ্তি করলেও এবার সেই রেকর্ডে অতৃপ্তি দেখা দিয়েছে বিএফডিসি থেকে শুরু করে জেলে, ব্যবসায়ীদের মধ্যে। মাছ আহরণের রেকর্ড এখন যেন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে সব পক্ষের। মাছ আহরণের প্রথম দিন এত বেশি মাছ অবতরণ হয়েছে যে শেষ পর্যন্ত প্রচুর মাছ নষ্ট হয়ে পুনরায় হ্রদেই ফেলে দিতে হয়েছে। এই নিয়ে বিএফডিসি, ব্যবসায়ী ও জেলেরা দোষ দিচ্ছেন পরস্পর-পরস্পরকে।
সংশ্লিষ্টরা জানায়, কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণে নিষেধাজ্ঞা এবার ৯০ দিনের বদলে ১০৭ দিন ছিল। হ্রদে পানি কম থাকায় দুই দফায় ১৭ দিনের মেয়াদ বাড়ানো হয়। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল, পুরো মাসটাই যেন বন্ধ রাখা হয়, কিন্তু সব দিক বিবেচনায় নিয়ে বিএফডিসির পরামর্শে জেলা প্রশাসন মাছ আহরণের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে ১৭ আগস্ট মধ্য রাত থেকে। এরপর জেলেরা মাছ ধরতেই রীতিমত চোখ কপালে উঠার মত অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এত মাছ পেয়ে খুশিতে আত্মহারা জেলে, প্রথমদিনের লক্ষ্যমাত্রা প্রত্যাশার চাইতে বেড়ে যায়। আর সেই মাছ পরিবহন কিংবা প্রক্রিয়াজাত করার মত বরফ না থাকায় প্রচুর মাছ নষ্ট হয়ে যায়। আবার অনেকেই সব ব্যবস্থা করে ঢাকায় মাছ পাঠাতে পারলে প্রতি ড্রামের খরচ তুলতেই রীতিমত গলদঘর্ম অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। কোন ব্যবসায়ী লাভের মুখ দেখলে অনেকেই মৌসুম শুরু করেছেন লোকসানের খাতা খুলে।
বিএফডিসির সূত্র জানায়, গত বুধবার মধ্যরাত থেকে কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণ শুরু পর প্রথম দিন অর্থাৎ ১৮ আগস্ট বিএফডিসির চারটি অবতরণ ঘাটে মাছ অবতরণ করা হয়েছে প্রায় ১৮৫ টন। গত বছর মাছ আহরণ শুরুর পর প্রথম দিন অবতরণ হয়েছিল ১৫৪ টন মাছ। এই বছর এই পরিমাণ মাছ থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩৭ লাখ টাকা। গত বছর হয়েছিল সাড়ে ২৭ লাখ টাকা। এবছর ২য় দিন শুক্রবার চারটি কেন্দ্রে মাছ অবতরণ হয়েছে ১১৬ টন মাছ। গত বছর ২য়দিন অবতরণ হয়েছিল ৯৭ টন মাছ। এই বছর দ্বিতীয় দিনে আয় হয়েছে ২৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা আর গত বছর হয়েছিল ১৭ লাখ ৫১ হাজার টাকা। ৩য় দিন বিকাল পর্যন্ত প্রায় ৯০ টন মাছ অবতরণ করা হয়েছে। গত বছর এদিনে মাছ অবতরণ হয়েছিল ১০৬ টন মাছ। এদিন সরকার রাজস্ব পেয়েছে ১৮ লাখ টাকা, গত বছর এদিনে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ১৯ লাখ টাকা। রাঙামাটি সদর কেন্দ্র ছাড়া বাকি তিনটি উপকেন্দ্র হচ্ছে কাপ্তাই, মহালছড়ি ও মারিশ্যা। এই চারটি কেন্দ্রের মাধ্যমে সরকার কাপ্তাই হ্রদে অবতরণকৃত মাছের ওপর থেকে রাজস্ব আদায় করে।
এদিকে গত বছরের তুলনায় এবার সবদিক থেকে মাছ ও রাজস্ব বেশি পাওয়া গেলেও মৌসুমের শুরুতেই অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে বাকি সময়গুলোতে মাছ পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় পড়েছে ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, তারা জেলেদের অতিরিক্ত মাছ ও পোনা মাছ না ধরতে বললে সব মাছই তাদেরকে দেয়া হেেচ্ছ, এতে যেমন কাপ্তাই হ্রদে মাছের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে, তেমনি অতিরিক্ত মাছের জন্য প্রকৃত দামও পাওয়া যাচ্ছে না, এতে লোকসান টানতে হচ্ছে।

এদিকে অতিরিক্ত মাছের বোঝা বন্ধ করতে রাঙামাটির দুই ব্যবসায়ী সমিতি এক বেলা মাছ অবতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শনিবার তাদের এক জরুরি বৈঠক শেষে রাঙামাটি মৎস্য ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতি ও কাপ্তাই হ্রদ বৃহত্তর মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির দুই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক উদয়ন বড়ুয়া ও আ. শুক্কুরের স্বাক্ষরে এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এতে বলা হয়, মৎস্য ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে এবং কাপ্তাই হ্রদে মাছের ভারসাম্য রক্ষার্থে দুপুর তিনটার পর মাছের বোট অবতরণঘাটে আসতে পারবে না। কেউ অমান্য করলে দশ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। এই সিদ্ধান্ত ২৫ আগস্ট পর্যন্ত বলবৎ থাকবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
রাঙামাটি মৎস্য ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক উদয়ন বড়ুয়া বলেন, জেলেদের ছোট জাল দিয়ে মাছ ধরার জন্য বিএফডিসি থেকে বলা হলেও অনেক জেলেই বড় জাল ব্যবহার করছে, এতে হ্রদের পানি কম থাকায় হ্রদের তল থেকেও মাছ আহরণ হচ্ছে। আর পানি কম থাকায় পোনা মাছ বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ না থাকার কারণে আহরণকৃত মাছ বেশিরভাগ পোনা রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, এত মাছের জন্য আমাদের ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি ছিল না, তারপরও যারা ঢাকায় মাছ পাঠিয়েছে তাদের অনেকেই লোকসান দিয়ে মাছ বিক্রি করেছে, এক সাথে এত মাছ হওয়ার কারণে ঢাকায়ও ভালো দর পাচ্ছি না। আবার দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে করতে মাছের গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে অনেক ব্যবসায়ীর মাছ ফেলে দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের পরিবহন ও বরফের হিসাবে ১০০ টনের বেশি মাছ পরিবহনের সক্ষমতা নেই আমাদের। সেই জায়গায় মাছ হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ।
তিনি আরো বলেন, ঢাকায় গিয়ে এক ড্রাম মাছের সব মিলে খরচ পড়ে ২৭০০-২৮০০ টাকা, আর আজ আমি রেইট পেয়েছি এক হাজার টাকা। এভাবে তো লোকসান দিয়ে ব্যবসা করা সম্ভব না। এর থেকে উত্তরণের জন্য আপাতত কয়েকদিনের পর এক বেলা মাছ অবতরণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, এরপর যারা মাছ আনবে তাদেরকে জরিমানা করা হবে।
বিএফডিসির বিপণন কর্মকর্তা শোয়েব সালেহীন বলেন, তিনদিনের আমাদের প্রায় ৭৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। গত বছরের তুলনায় সেটা অনেক বেশি। মাছের দাম না পাওয়া ও ফেলে দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জেলেদের লোভের কারণে এতবেশি মাছ প্রথমদিকে ধরা পড়ছে। আমরা ব্যবসায়ীদের সময় নির্ধারণ করে দিলেও তারা সময় মানছেন না। সময় মেনে চললে এবং লোভ সংবরণ করতে পারলে জেলে, ব্যবসায়ীসহ সকলের মঙ্গল হত।
বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের(বিএফডিসি) রাঙামাটি অঞ্চলের ব্যবস্থাপক লে. কমান্ডার তৌহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা ব্যবসায়ীদের নির্দেশনা দিয়েছিলাম, যেহেতু হ্রদে এখনো পানি কম, তাই প্রথম দিকে মাছ কম আহরণের জন্য, কিন্তু তারা সেটা শুনেননি। তাদের দাবি, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই কাজটি করার কারণে প্রথমদিকে এত বেশি মাছ আসছে। তাদেরকে সময় নির্ধারণ করে দিলে সেটাও তারা মানেননি। তবে আজ(শনিবার) থেকে দেখতে পেলাম তারা এক বেলা মাছ আনছেন। তিনি আরো বলেন, এত পরিমাণ ছোট মাছ পাওয়া গেছে যে তার অত চাহিদা নেই। যার ফলে মাছগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অনেকেই কিছু মাছ হয়তো ফেলে দিয়েছেন।
