অবিশ্বাস্য হলেও সত্য,পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড় কিংবা সবুজ উপত্যকার যেকোন স্থানে চাইলেই যেতে পারবেন আপনি, ভরা পূর্ণিমায় কিংবা বৃষ্টিভেজা মৌনমুখর বিকেলে, উঁচু নীচু পাহাড়ে ক্লান্তি হয়তো আপনাকে কাবু করবে, কিংবা সশস্ত্র কিছু মানুষের মুখোমুখি হতে পারেন কদাচিৎ, কিছু মৃদু প্রশ্নবাণে পাড়ও পাবেন, কিন্তু পাহাড় দাপিয়ে বেড়ানো ৪ আঞ্চলিক দলের একজন শীর্ষ,প্রভাবশালী নেতাও নেই,যিনি চাইলেই পারবেন,পাহাড়ের সবখানে আপনার মতো ঘুরে বেড়াতে পারবে। নিজেদেরই সৃষ্ট ফ্রাংক্টেনস্টাইনের কাছেই আজ বন্দী জীবন তাদের। তাই নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা ছাড়া কোথাও যেতে পারেন না তারা,এমনকি সশস্ত্র জীবন ছেড়ে জনপ্রতিনিধি হওয়া নেতারাও আইনশৃংখলাবাহিনীর সহায়তা ছাড়া যেতে পারেন না কোথাও ! এমন অবিশ্বাস্য কঠিন বাস্তবতায় পরষ্পর বৈরি চার সংগঠনের দুটি নেমেছে ভোটের মাঠে,আর দুই সংগঠন আছে তাদের ঠেকাতে ! ভোটে নামা দুই দল গত ২০ বছর ধরে পাল্টাপাল্টি হামলায় নিজেদের প্রায় এক হাজার নেতাকর্মী সমর্থককে গুলি করে পাখির মতো হত্যা করলেও গত ২ বছর ধরে তাদের সম্পর্ক বেশ হৃদ্যতাপূর্ণ এবং ঘনিষ্ঠ। দুই পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে নিজেদের পৃথক পৃথক প্রার্থী দিয়ে দুইজন দুইজনকে বিজয়ী করতে মরিয়া চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে তারা। দুটি দলই নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত না হওয়ায় ‘স্বতন্ত্র’ পরিচয়ে নেমেছে নির্বাচনী মাঠে।
কিন্তু এই দুই সংগঠন থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন সংগঠন করা এদের বিদ্রোহীরাও সমানতালে সক্রিয় আছেন এই দুই মূল দলকে ‘উচিত শিক্ষা’ দিতে। ফলে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোও মুখে মুখে যতই বাগাম্বর করুক না কেনো,তলে তলে তাকিয়ে আছে এই চারদলের খামখেয়ালী কিংবা করুণা অথবা সহযোগিতার দিকেই। আঞ্চলিক এই চারদলের ভোটের গতিপ্রকৃতিও দ্বিধারায় বিভক্ত।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি : দলটির প্রতিষ্ঠাতা মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন আওয়ামীলীগের প্রার্থী কুমার সমতি রায়কে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৫ সালে বাকশালে যোগদান করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তিনি জনসংহতি সমিতি গঠন করে সশস্ত্র গেরিলা সংগঠন ‘শান্তিবাহিনী’ গঠন করে আন্ডারগ্রাইন্ডে চলে যান। শুরু করেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই,কিন্তু ১৯৮৩ সালে নিজ দলের একদল বিপদগামী’র হাতে নিহত হন তিনি মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা। তার মৃত্যুর পর দলের দায়িত্ব নেন জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা সন্তু। দীর্ঘ দুই দশক সশস্ত্র রাজনীতির পর ১৯৯৭ সালে পার্বত্যচুক্তির মাধ্যমে ২ হাজার সশস্ত্র গেরিলাসহ আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা। এরপর ২০০১ সালের প্রথম নির্বাচন বর্জন করে তারা। ২০০৬ সালের বাতিল হওয়া নির্বাচনে লক্ষী প্রসাদ চাকমাকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। কিন্তু সেই নির্বাচিত অনুষ্ঠিত না হওয়ায় ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শান্তিবাহিনীর সাবেক কমান্ডার ও দলটির প্রভাবশালী নেতা ঊষাতন তালুকদারকে প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামান তারা। কিন্তু সেবার ৫৩ হাজার ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে থেকেই ভোটের মাঠ থেকে বিদায় নিতে হয় তাদের। কিন্তু ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন বিএনপিহীন নির্বাচনে ঠিকই সারাদেশে আওয়ামীলীগের ভূমিধস বিজয়ের মধ্যেও নৌকার হেভিওয়েট প্রার্থী,নির্বাচনকালিন সরকারের মন্ত্রী দীপংকর তালুকদারকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয় তারা। সেই নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীকে পরাজিত করে দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় সংসদে যায় দলটির সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই প্রার্থী নিয়ে মাঠে নেমেছে দলটি। তবে এবার সমীকরণ কিছুটা ভিন্ন। অতীতের দুই নির্বাচনে যে আঞ্চলিক দলটি তাদের প্রবল বিরোধীতা করেছিলো সেই ইউপিডিএফ এবার তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র। রাঙামাটির নানিয়ারচর,কাউখালি এবং বাঘাইছড়ির বেশ কিছু এলাকায় ইউপিডিএফ এর রয়েছে বেশ শক্ত অবস্থান। ফলে এককালের শত্রুদের সহযোগিতা এবার সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির প্রার্থীকে বিজয়ী হওয়ার রেসে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিয়েছে। জনসংহতি সমিতির ঘনিষ্ঠসূত্রগুলোর জানিয়েছে,নিজেদের রিজার্ভভোট আর সেই ভোটের সাথে এবার ইউপিডিএফ এর প্রায় পঁচিশ হাজার ভোট যোগ হওয়ায় নির্বাচিত হওয়ার দৌড়ে বেশ এগিয়ে তারা। তবে কপালে ঠিকই চিন্তার ভাঁজ আছে অন্য দুই আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফ(গনতান্ত্রিক) এবং জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)কে নিয়ে।
ইউপিডিএফ : পার্বত্য চট্টগ্রামের খেয়ালি আঞ্চলিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি সাক্ষরের সময় এর প্রবল বিরোধীতা করে সেই সময়কার পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের শীর্ষ নেতাদের নেতৃত্বে পূর্ণস্বায়ত্ত্বশাসনের অদ্ভূদ দাবিতে গড়া উঠা এই সংগঠনটি নানান ভাঙ্গাগড়া আর অসংখ্য নেতাকর্মীর দলত্যাগ-দেশত্যাগের মধ্য দিয়েও বেশ সংগঠিত শক্তি হিসেবে টিকে আছেন পাহাড়ে। সন্তু লারমার জনসংহতির সাথে ক্রমাগত সশস্ত্র লড়াইয়ে নিজেদের শ পাঁচেক কর্মীর লাশের স্মৃতি ভুল এককালের প্রবল শত্রুদের সাথে ২০১৭ সালের শুরুতেই মিত্রতা গড়ে তুলেছে। মূলত: প্রধানমন্ত্রীর খাগড়াছড়ির জনসভা বানচাল চেষ্টার পর আইনশৃংখলা বাহিনীর কঠোর অভিযান,মামলা আর চাপের মুখে পড়েই ক্রমাগত জনসংহতির দিকেই ভিড়তে শুরু করা দলটি এখন চেষ্টা করছে টিকে থাকার লড়াইয়ে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণে। ২০১৭ সালে দলটির একটি অংশ বেরিয়ে গিয়ে তপনজ্যোতি চাকমা বর্মার নেতৃত্বে ইউপিডিএফ(গনতান্ত্রিক) দল গঠন করার পর তাদের উপর্যুপরি হামলা আর এককালের বন্ধু জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)’র শত্রুকে পরিণত হওয়ায় দৃশ্যতঃ চাপে পড়ে যাওয়া দলটির নিবার্চনের ইতিহাস কিন্তু বেশ সমৃদ্ধই। ২০০১ সালে সন্তু লারমারা নির্বাচন বর্জন করলেও ঠিকই খাগড়াছড়ি এবং রাঙামাটি আসনে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন প্রসীত বিকাশ খীসা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ইউপিডিএফ প্রার্থী না দিয়ে ‘না’ ভোটে অংশ নিয়ে দলটির প্রার্থী প্রায় ৩৪ হাজার ভোট পায়। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে দলটির প্রার্থী সচিব চাকমা মাত্র ১২১৪ ভোট পান এবং সেই নির্বাচনে দলটি মূলত: সেইসময়কার বন্ধু জনসংহতি (এমএনলারমা)’র সুধাসিন্ধু খীসাকে সমর্থন দেয়ায় তিনি ২৪ হাজার ভোট পান। এবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজস্ব প্রার্থী না দিয়ে জনসংহতি সমিতির সহসভাপতি ঊষাতন তালুকদারকেই সমর্থন দিচ্ছে দলটি। যদিও নিজেদের ভোটব্যাংক ও নিয়ন্ত্রিত এলাকা হিসেবে পরিচিত নানিয়ারচরে এখন আগের চেয়ে বেশ দুর্বল দলটি। শুধু তাই নয়,বাঘাইছড়ি ও কাউখালীতেও শক্তিক্ষয় হয়েছে বেশ। এমতাবস্থায় ঊষাতনের জন্য ঠিক কত ভোট ম্যানেজ করে দিতে পারবে দলটি,তা বোঝা মুশকিল। যদিও তাদের দাবি, এখনো নানিয়াচরের ও রাঙামাটি সদরের চারটা ইউনিয়ন,লংগদুর কাট্টলি,বাঘাইছড়ির তিনটি ইউনিয়ন,কাউখালি সদর এলাকা মিলে তাদের প্রায় ৩০ হাজার ভোট আছে। এই ভোট রাঙামাটিতে ঊষাতনের বাক্সে দেয়ার বিনিময়ে খাগড়াছড়ি আসনে নিজেদের প্রার্থী নতুনধন চাকমাকে বিজয়ী করতে সহযোগিতা চাইছে দলটি। কিন্তু যতই হিসেবনিকেশই করুক না কেনো দলটি,শেষাবধি কত ভোট দিতে পারবে তারা, এনিয়ে সংশয় আছে খোদ দলটির অভ্যন্তরেই। কারণ নানিয়ারচরের চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা ও ইউপিডিএফ(গনতান্ত্রিক) প্রধান তপনজ্যোতি চাকমা (বর্মা)হত্যায় অভিযুক্ত দলটির জনসমর্থন এখন অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় বেশ দুর্বল এবং নড়বড়ে। ফলে ভোটের মাঠের দলটি এবার বিপাকেই আছে ভোটের সমীকরণে।
জনসংহতি সমিতি( এমএনলারমা) : সংস্কারপন্থী হিসেবেই পরিচিত এই দলটি মূলত: সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি থেকে বেরিয়ে গিয়ে গঠিত হওয়া। এককালের মানবেন্দ্র নারায়ন লারমার সহযোদ্ধা সুধাসিন্ধু খীসা,তাতিন্দ্রলাল চাকমা পেলে,রূপায়ন দেওয়ান,চন্দ্রশেখর চাকমারা, সন্তু লারমার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে এবং দলটিতে গনতান্ত্রিকতার অভাবের অভিযোগ এনে ২০০৮ সাল বেরিয়ে যান এবং ২০১০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা) নামে নতুন দল গঠন করেন। নতুন দল গঠনের শুরুতেই সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতির ক্রমাগত হামলায় বিপর্যন্ত দলটি বন্ধু হিসেবে পাশে পায় জনসংহতির শত্রু ইউপিডিএফকে। তাদের সহায়তায় এবং তাদের সাথে জোট বেঁধে পাল্টা হামলা শুরু করে তারাও। পাশাপাশি রাঙামাটির বাঘাইছড়ি,নানিয়ারচর,খাগড়াছড়ির দীঘিনালা এবং মহালছড়িতে নিজেদের শক্ত সাংগঠনিক অবস্থান তৈরি করে তারা। শুধু তাই নয়, এই চার উপজেলার চার চেয়ারম্যান এবং বেশিরভাগ ভাইস চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হয় দলটি থেকে। কিন্তু দলটি যতই প্রভাবশালী হতে শুরু করে ততই বিরোধী লাগতে থাকে ইউপিডিএফ এর সাথে। নিয়তির কি নির্মম পরিহাস, পার্বত্য রাজনীতির কয়েক বছরের জটিল সব মেরুকরণে বন্ধু ইউপিডিএফ তাদের শত্রুতে পরিণত হয়ে তাদেরই চিরশত্রু মূল জনসংহতি সমিতি’র মিত্রতে পরিণত হয় আর ইউপিডিএফ ভেঙ্গে গঠিত হওয়া ইউপিডিএফ(গনতান্ত্রিক) তাদের নতুন বন্ধু ও মিত্রতে পরিণত হয়। শুরু হয় পাল্টাপাল্টি হামলা। এই হামলায় মূলত: ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এরাই। কারণ ২০১৮ সালেই তারা হারিয়েছে তাদের নানিয়ারচর এলাকার প্রধানতম শক্তি ও স্তম্ভ উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান ও ইউপিডিএফ(গনতান্ত্রিক) এর প্রধান তপনজ্যোতিকে। এই দুই জনের মৃত্যুর পর উপ নির্বাচনে জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)’র প্রার্থী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেও এখনো মৃত্যুভয় তাড়া করে ফেরে এই দলের নেতাকর্মীদের। ফলে জীবন বাঁচাতে নীরবে নৌকার সাথে আঁতাত কিংবা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে তারা। সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতি আর প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ এর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে সমান গর্জন দিয়ে তারা চাইছে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার ভোট নৌকায় তুলে দিতে। বিনিময়ে দল দুটিকে শায়েস্তা করা ও নিজেদের শীর্ষ নেতা শক্তিমান হত্যার বদলাও নিতে চায় তারা। কিন্তু কতটুকু সফল হবে তারা তা জানা যাবে ৩০ ডিসেম্বর রাতেই ফলাফল ঘোষণার পর। কিন্তু আশাবাদী এই এই দলের নেতারা জানিয়েছেন, নিজেদের প্রায় ২০ হাজার ভোট নৌকায় তুলে দিতে পারবেন তারা। জনসংহতি সমিতির এককালের সিনিয়র,পরীক্ষিত এবং ভোটের রাজনীতিতে অভিজ্ঞ এই দলটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার উপস্থিতির কারণে তাদের দাবি উড়িয়েও দেয়া যায়না। এই আশ^াস পেয়ে তাই ফুরফুরে মেজাজে আছে আওয়ামীলীগও। কারণ কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার পাশাপাশি, জনসংহতি-ইউপিডিএফ এর সশস্ত্র শাখার সশস্ত্র মাস্তানির জবাবটা আওয়ামীলীগ চাইছে এই জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)’র মাধ্যমেই দিতে !
ইউপিডিএফ (গনতান্ত্রিক) : সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতির সাথে ১৯৯৭ সাল থেকে ২০১৭ সাল, এই ২০ বছরের লড়াইয়ে যতটা ক্ষতি হয়েছে প্রসীত বিকাশ খীসার,তারচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)’র সাথে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া এবং নিজেদের দল ছেড়ে বেরিয়ে গঠিত হওয়া ইউপিডিএফ(গনতান্ত্রিক) এর আত্মপ্রকাশে। এই দুই দলের যুগল হামলায় মিঠুন চাকমার মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে হারানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ঘাঁটি নানিয়ারচর,দীঘিনালা,মহালছড়ি এবং বাঘাইছড়িতে নিয়ন্ত্রন আলগা হওয়ায় বিপাকেই পড়েছে ইউপিডিএফ। ফলে মরিয়া ইউপিডিএফ এর হামলায় দুইদিনের মাথায় নিহত হয় নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা ও ইউপিডিএফ (গনতান্ত্রিক) প্রধান তপন। ধারণা করা হয়েছিলো,তপনকে হত্যার পর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না দলটি। কিন্তু একমাসের মধ্যেই জলোয়া চাকমাকে তপনের জায়গায় বসিয়ে ঠিক ঘুরে দাঁড়ায় দলটি। ঠিক সেইরকম কোন জনভিত্তি না থাকলেও সশস্ত্র এই সংগঠনটির শখানেক সশস্ত্র কর্মী ও তাদের আগ্রাসী-বেপরোয়া মনোভাবের কারণে ঠিকই দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে আছে সন্তু লারমা ও প্রসীত খীসার কর্মীদের। ভোট ম্যানেজ করতে না পারুক আর না পারুক, সশস্ত্র হামলার পাল্টা জবাব দেয়া কিংবা আকস্মিক আক্রমন করে ‘ভয় আর আতংক’ জিইয়ে রাখার সক্ষমতা যে তাদের আছে,তার প্রমাণ ইতোমধ্যেই মিলেছে। আপাতত: এই নির্বাচনে জনসংহতি সমিতি(এমএনলারমা)’র সাথে মিলে এদেরও প্রত্যাশা নৌকার বিজয়। নৌকার বিজয়ে ভূমিকা রাখতে চায় এরা,নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে এবং তপন জ্যোতি চাকমা বর্মার খুনীদের উপর শোধ নিতে।
তবে পাহাড়ের চারটি আঞ্চলিক দল এবং তাদের সশস্ত্র কর্মীরা এখন স্পষ্ট দুটি ধারায় বিভক্ত থাকলেও তাদের লড়াই যতটা না ভোটের,তারচে বেশি মানচিত্র নিয়ন্ত্রনের। দুটি পক্ষই জানে,বিজয়ী হলে বিস্তৃত হবে ভূগোল আর পরাজিত হলে হাতছাড়া হবে নিয়ন্ত্রন ! এমন জটিল সমীকরণে দাঁড়িয়ে তাই নিজেদের শক্তি,সামর্থ্য আর সমর্থন পুরোটাই ব্যবহার করতে মরিয়া তারা।
এই মরিয়া মনোভাবটাই উদ্বেগের-ভয়ের-বিস্ময়ের এবং চমক জাগানিয়া। দেখা যাক,৩০ ডিসেম্বর মধ্য রাতে শেষ হাসি হাসে কোন দল। হাসির সাথে সাথে কার হাঁটার ভূগোল প্রসারিত হয় পাহাড়ে !
