বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই মুষলধারে বৃষ্টিপাতের কারণে রাঙামাটি শহরের পাঁচটি আশ্রয়কেন্দ্রে লোকজনের উপস্থিতি আরও বেড়েছে। এছাড়া দেশের সবচে বড় ও দুর্গম উপজেলা বাঘাইছড়িতে পানিবন্দী হয়ে আছেন ৫ শতাধিক পরিবার। অন্যদিকে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের ঘাগড়ার কলাবাগান এলাকায় রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের ধসের ঝুঁকি ঠেকাতে কাজ করছে সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার বিকেলে ঘাগড়ার কলাবাগান এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, প্রবল স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে ছড়াতে। ছড়ার পানির স্রোতের বেগ পরিবর্তন করতে কাজ করছে সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে খুঁটি বসিয়ে খুঁটির ওপর বস্তা দিয়ে বেগ পরিবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই পানির গতিপথ রোধ করতে কাজ করছে সওজ, আনসার ভিডিপি ও স্থানীয়রা। বিকালে যোগ দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও রেড ক্রিসেন্ট সদস্যরা।
বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ। এসময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এসএম শফি কামাল, কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শতরূপা তালুকদারসহ অন্যান্য বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ জানিয়েছেন, আমি ঘাগড়ার ঝুঁকিপূর্ণ স্থান পরিদর্শন করেছি। সড়ক বাঁচাতে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের লোকজন আপ্রাণ চেষ্টা করছে। স্রোতের পানির প্রবাহ পরিবর্তন করা না গেলে সড়ক ধসের ঝুঁকি বেশি রয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে রাঙামাটি-চট্টগ্রামের সড়কে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছি। জনগণের সুবিধার্তে বাস চলাচল করবে। তবে বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির সাথে রাঙামাটির সকল ভারী চলাচল বন্ধ থাকবে।
রাঙামাটি জেলা সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শংকর চন্দ্র পাল জানিয়েছেন, আমরা ছড়ার পানির স্রোত প্রবাহ পরিবর্তন করার জন্য চেষ্টা করছি। ছড়ার পানির প্রবাহ পরিবর্তন করা না গেলে ধসের ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া খাগড়াছড়ি-বান্দরবান সড়কেরও বিভিন্ন স্থানে সড়কের ওপর মাটি ধসে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে ধসের আশঙ্কায় রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ১৩ জুন পাহাড়ধসে রাঙামাটির ঘাগড়া-সাপছড়ি এলাকায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এ সড়কের প্রায় ১৫০ মিটার। এতে সারা দেশের সঙ্গে রাঙ্গামাটির যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রায় তিন মাস পর একটি সেতু নির্মাণ করে ফের ভারী যানবাহনের জন্য সড়কটি উন্মুক্ত করা হয়। ওই সময়ও সওজ বিভাগ থেকে খুঁটি বসিয়ে সড়কের মাটি ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু গত দুই বছরেও স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় সম্প্রতি আবার ধসের মুখে পড়েছে রাঙামাটির সড়কগুলো।
এদিকে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই টানা বর্ষণের কারণে রাঙামাটি শহরের ৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে পাহাড়ধসের আতঙ্কে লোকজনের উপস্থিতি বেড়েছে। জেলা প্রশাসনের নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) উত্তম কুমার দাশ জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে লোকজনের উপস্থিতি বেড়েছে। আশ্রয়রতদের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুপুর ও রাতের খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।

অন্যদিকে গত শনিবার থেকে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে দেশের সবচে বড় ও রাঙামাটির দুর্গম উপজেলা বাঘাইছড়ির নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে করে পানিবন্দী হয়ে আছে এ উপজেলার পাঁচ শতাধিক মানুষ।
উপজেলার বাঘাইছড়ির মধ্যম পাড়া, মুসলিমব্লক, পুরান মারিশ্যা, বটতলীসহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষ পানিবন্দি হয়ে জীবনযাবন করেছে। এ কারণে ওই এলাকাগুলোতে পানীয় জলের সংকট দেখা দিয়েছে। এমতাবস্থায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুরো উপজেলায় ২৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে খোলা হয়েছে। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও বেশির মানুষ তাদের আত্মীয় স্বজনেরর বাড়িতে ওঠেছে। ফলে আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষের উপস্থিতি কম বলে জানা গেছে।
বাঘাইছড়ি পৌরসভার মেয়র জাফর আলী খান জানান, পৌরসভার বিভিন্ন এলাকার মানুষ পানিবন্দী হয়ে আছে। অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে না গিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে চলে গেছে। অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধির কারণে পানীয় জলের টিউবওয়েলগুলো ডুবে যাওয়ার ফলে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেশকয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। যারা আশ্রয় কেন্দ্রে আসবে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হবে।’
বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আহসান হাবিব জিতু জানান, ‘দ্রুতগতিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। বৃষ্টি না কমলে আরও অনেক এলাকা প্লাবিত হতে পারে। বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা স্ব স্ব আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খাবারের ব্যবস্থা করছেন। পৌর এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বাজার থেকে কিনে খাবার দিচ্ছি। পরিস্থিতি খারাপ হলে আশ্রয়কেন্দ্রে সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে।
বৃহস্পতিবার রাতে রাঙামাটি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সিনিয়র পর্যাবেক্ষক ক্য চিনু মারমা জানিয়েছেন, ‘বৃহস্পতিবার সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত টানা ১২ ঘন্টায় রাঙামাটিতে ১৭৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এ জেলায় শনিবার থেকেই বৃষ্টিপাত হচ্ছে। তবে বৃহস্পতিবার সবচে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে।’
এছাড়া এ জেলার আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে সাজেকে আজ শুক্রবার ও শনিবার পর্যটকদের আগমণ না করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে রিসোর্ট মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে পাহাড় ধসে রাঙামাটিতে ১২০ জনের প্রাণহানি হয়। আহত হয় আরও দুই শতাধিক মানুষ। এর পরের বছর ২০১৮ সালের ১২ জুন জেলার নানিয়ারচরে পাহাড়ধসে মারা যান ১১ জন। সর্বশেষ গত সোমবার পাহাড়ধসে কাপ্তাইয়ে সূর্য মল্লিক (৫) নামে এক শিশু ও তাহমিনা বেগম (২৫) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়।

