শ্যামল রুদ্র, রামগড় ॥
তাঁদের এখন দুর্বিষহ জীবন। ধুকে ধুকে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। অন্যের ভুলের খেসারত দিচ্ছেন মাত্র ৫শ টাকা মজুরির গরিব খেটে-খাওয়া শ্রমিকেরা। নতুন সংযোগ দিতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে হাসপাতালে এখন শয্যাশায়ী। মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করা শ্রমিকেরা অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারছেন না। ঝলসে গেছে পুরো শরীর। একজনের এক হাত কেটে ফেলতে হয়েছে। অন্যরাও গুরুতর অসুস্থ। এটি গত ২৫ জুলাইয়ে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনার শিকার হওয়া কয়েকজন শ্রমিক ও তাঁদের আত্মীয়-স্বজনদের ভাষ্যে এ দুরাবস্থার চিত্র।
ঘটনাটি ঘটেছে খাগড়াছড়ির রামগড় পাতাছড়ার মাহবুব নগরে অবস্থিত কর্নেল বাগান নামে পরিচিত (পাহাড়ের টিলা ভূমির সৃজিত বাগান) বনায়ন প্রকল্পে নতুনভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার সময়। গত ২৫ জুলাই লাইনে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে গিয়ে অফিস ও ঠিকাদারের ভুলে বিদ্যুতায়িত হয়ে মারাত্মক আহত হন চার শ্রমিক। ইতিমধ্যে আনোয়ার হোসেন’র (১৮) একটি হাত কেটে ফেলা হয়। ঝলসে গেছে তাঁর পুরো শরীর। একটি পায়ের অবস্থাও খারাপ।
তাঁর বাড়ি রামগড় পাতাছড়া ইউনিয়নের মাহবুব নগর। সে ওই গ্রামের বাসিন্দা আবদুর রউফ’র ছেলে। বর্তমানে ঢাকা শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। নতুন নির্মিত ১১ কেবির বিদ্যুৎ লাইন বাগানে সংযোগ দিতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ সময় শাহ আলম, তারেক ও ইব্রাহিমসহ চার শ্রমিক আহত হয়। মো. ইব্রাহিম খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সবার বাড়ি রামগড়ের পাতাছড়া ইউনিয়নের মাহবুব নগর। অন্যরাও নিজ বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
৯ সেপ্টেম্বর শুক্রবার লিখিত অভিযোগ পত্রে জানা যায়, রামগড় বিদ্যুত বিতরণ কেন্দ্রের আবাসিক প্রকৌশলীর মৌখিক নির্দেশে পাতাছড়ার ব্যক্তি মালিকানাধীন উল্লেখিত বাগান ও পাশের একটি বাগানে এই কাজের ঠিকাদার বিদ্যুৎ বিভাগের শ্রমিক না নিয়ে নিজেরা সংযোগ দিতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটায়। চট্টগ্রামের আনিছ কোম্পানি নামে এক ঠিকাদার এর কাজ করেন।
শ্রমিক শাহ আলম জানান, লাইনম্যানদের সাথে যোগাযোগ করে কাজ শুরু করলেও পিডিবির ইউসুফ ভুল করে লাইন চালু করে দিলে এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে। তখন বলা হয় আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা ব্যয় ঠিকাদার ও বিদ্যুৎ অফিস বহন করবে কিন্তু কোন ধরনের সাহায্য না পাওয়ার অভিযোগ করেন আহতদের পরিবার।

জানতে চাইলে লাইনম্যান ইউসুফ জানান, ওই সময় কর্মস্থলে লাইনম্যান সালাউদ্দিন ছিলেন তিনি আমাকে জানাননি যে লাইনে কাজ চলছে।
আনোয়ারের পিতা আবদুর রউফ বলেন, বিদ্যুৎ অফিস ও ঠিকাদারের অবহেলায় আমার ছেলের জীবন সঙ্কটাপন্ন। গত ৯ আগস্ট ডাক্তারেরা ছেলের এক হাত কেটে ফেলেছে, পায়ের অবস্থাও খারাপ। পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে বাঁচতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমি কৃষক ইতিমধ্যে ঋণ নিয়ে ২ লাখ টাকা খরচ করেছি বাকী চিকিৎসা কীভাবে হবে জানি না। মা পেয়ারা বেগম বলেন, তাদের ভুলে আমার ছেলে মারা যাচ্ছে। চিকিৎসা খরচতো দিচ্ছেই না একটি বার দেখেও যায়নি, ছেলের কষ্ট আর সহ্য হয় না।
সাব-ঠিকাদার মো. ওসমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিদ্যুৎ অফিসের সাথে যোগাযোগ করেই সংযোগ দেয়া হয়েছিল, অসাবধানতাই দুর্ঘটনার কারণ। আহতদের চিকিৎসা খরচ তিনি দিয়েছেন বলে দাবি করেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য (মেম্বার) ওসমান মিয়া জানান, আনোয়ারসহ আহত অন্যরা নিদারুণ কষ্টে আছেন। চিকিৎসা করাতে লাগবে ১০ লাখ। সেখানে বিদ্যুৎ অফিস ও ঠিকাদারের দেওয়া সামান্য টাকা কিছুই না। তিনি এলাকা থেকে টাকা তুলে সহযোগিতা করছেন বলে জানান।
রামগড় বিদ্যুৎ বিতরণ কেন্দ্রের আবাসিক প্রকৌশলী আজগর আলী জানান, লাইনম্যানের ভুল বুঝাবুঝিতে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমাদের পক্ষ থেকে আহতদের খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে।
