সুহৃদ সুপান্থ
দ্বিতীয় সেমিফাইনাল খেলা শুরুর নির্ধারিত সময় ছিলো বিকাল তিনটা। কিন্তু ‘বহিরাগত খেলোয়াড়’ নিয়ে দুই দলের বিবাদে খেলা শুরু হতেই গড়িয়ে যায় একঘন্টা দশ মিনিট। নির্ধারিত সময়ের বহুপরে বিকাল সোয়া চারটায় শুরু হওয়া খেলায় কাপ্তাই উপজেলা ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকলেও খেলাটি শেষাবধি শেষ হয়নি স্বাভাবিক নিয়মে। শুরুর ‘বহিরাগত খেলোয়াড়’ বিতর্ক পেরিয়ে শুরু হওয়া খেলা পন্ড হয়ে যায় ‘পেনাল্টি বিতর্কে’। কাপ্তাই উপজেলা দল মাঠে ছেড়ে যাওয়ার পর এগিয়ে থাকা রাঙামাটি সদরকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। আগামী ১৯ মার্চ ফাইনালে বিলাইছড়ির মুখোমুখি হবে রাঙামাটি সদর।
কাপ্তাই উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারন সম্পাদক বিদর্শন বড়ুয়া অভিযোগ করছেন, যে খেলোয়াড় ১১ বছর ধরেই রাঙামাটি জেলা দলে খেলছে, রাঙামাটির বিভিন্ন টূর্নামেন্টে জেলার বিভিন্ন দলের হয়ে খেলেছে,রাঙামাটি জেলা দলের অধিনায়কও ছিলো এবং এই টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচও যে খেলেছে,তাকেই আজ ‘বহিরাগত’ বলে মাঠে নামতে না দেয়া হলো নাহ্ ! কী আশ্চর্য ! মাঠে নামার পর মনে হয়েছে রেফারী-লাইন্সম্যানসহ ১৪ জন খেলছে রাঙামাটি সদরের পক্ষে মাঠে। পুরো কমিটিই যেনো রাঙামাটি সদরের প্রতিনিধিত্ব করছে ! এভাবে তো ফুটবল হয় না। এভাবে জেলার ফুটবল ধ্বংস হয়ে যাবে। তারা যদি নাই চাইতো আমরা খেলি, তাহলে আগেই বলত,আমরা টিম দিতাম না। আমরা অভিযোগ করার পরও সে অভিযোগের প্রতি কর্ণপাত করেনি কমিটি। বরং সদর টীমের অন্যায় আব্দার ঠিকই মেনে নিয়েছে। আমাদের হেলাল এক ম্যাচ খেলার পরও তাকে আজ খেলতে দিলোনা,অথচ সদর উপজেলা আগেই নাম জমা ১৮ জনের বাইরে নতুন করে কিভাবে আরো ৩ জন খেলোয়াড়কে দলে ঢুকালো ?’
বৃহস্পতিবার বিকালে খেলা শুরুর আগে রাঙামাটি সদর উপজেলা দলের ম্যানেজার আব্দুল মঈন সাক্ষরিত এক চিঠিতে কাপ্তাই উপজেলা দলের খেলোয়াড় মোঃ হেলাল,রানা,শুভ ও লিটনকে ‘বহিরাগত’ উল্লেখ করে আবেদন করলে এনিয়ে বিতর্ক ও বিবাদ শুরু হয়।
রাঙামাটি সদর উপজেলা দলের ম্যানেজার আব্দুল মঈন জানাচ্ছেন-‘ চারজন বহিরাগত খেলোয়াড় নিয়ে তালিকা জমা দেয় কাপ্তাই, আমরা অভিযোগ করেছি। কমিটি ১ জনকে বাদ দিয়ে খেলা শুরু করে। খেলাতে আমরা ২-০ গোলে এগিয়ে ছিলাম, দ্বিতীয়ার্ধে একটি হ্যান্ডবল নিয়ে বিতর্কে কাপ্তাই মাঠ ছেড়ে বের হয়ে যায়,তখন ১০/১৫ মিনিট বাকি ছিলো,তাই রেফারি আমাদের বিজয়ী ঘোষণা করে।’
জেলা টীমে খেলা হেলালকে খেলতে না দেয়া প্রসঙ্গে মঈন বলেন, সে কাপ্তাই উপজেলার ছাড়পত্র নিলেও,জেলা টীমের বিষয়টি যেহেতু সদর উপজেলার বিষয়,তাই তার ছাড়পত্র বৈধ হবেনা।’ আর প্রথম ম্যাচে যাদের সাথে খেলা ছিলো,তারা হয়ত আপত্তি করে নাই,তাই সে খেলতে পেরেছে।’ নিজেদের দলে তালিকার বাইরে ৩ জন খেলোয়াড় সংযুক্ত করার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন,‘ এটা ঠিক নয়।’
তবে সেমিফাইনালের মত ম্যাচে ‘খেলোয়াড় বিতর্ক’র দায় যাচাই বাছাই কমিটির,মেনে নিয়ে তিনি বলেন, তারা যদি ঠিকঠাক যাচাই বাছাই করত,তাহলে হয়ত এমন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এরকম বিতর্ক হত না।’
এদিনের খেলার ম্যাচ কমিশনার সাবেক ফুটবলার আব্দুস সবুর বলেন,‘ হেলাল দীর্ঘ ১২ বছর ধরে রাঙামাটি জেলা দলের খেলোয়াড় হিসেবে খেলছে। কিন্তু এদিন রাঙামাটি সদর কেনো তার ব্যাপারে অভিযোগ দিয়েছে তা আমার বোধগম্য নয়। আমরা সাবেক ফুটবলাররা বিষয়টিতে খুবই কষ্ট পেয়েছি। আমরা তাকে খেলতেই দিতে চেয়েছিলাম,কিন্তু পারিনি ! এটা খুবই হতাশার। বিষয়টি ভালো হলোনা।’
এই বিষয়ে সাবেক ফুটবলার প্রদীপ বড়ুয়া বলেন, আমার খুব খারাপ লাগছে হেলালের জন্য। একটা ছেলে চট্টগ্রামে না খেলে গত এক যুগ ধরে রাঙামাটির ফুটবলের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছে,তার বাফুফে নিবন্ধনও রাঙামাটির নামে,সে নিয়মিত রাঙামাটিতেই খেলে,অথচ আজ এ কী পুরষ্কার পেলো ! সে আমাকে বলেছে, সে আর ফুটবল খেলবে না! আমরা সাবেক ফুটবলাররা সবাই আজকের ঘটনায় লজ্জিত, বিব্রত। এটা ঠিক হলোনা।’
তবে সব দায় এড়িয়ে নিজেদের অবস্থানের পক্ষেই যুক্তি দিলেন রাঙামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারন সম্পাদক শফিউল আযম। তিনি বলছেন, এটা ঠিক যে হেলাল বহুবছর ধরেই রাঙামাটির পক্ষে খেলছে। কিন্তু এদিন রাঙামাটি সদর অভিযোগ করায় আমরা আপীল কমিটির সভাপতি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এর সাথে পরামর্শ করে বিতর্ক এড়াতে হেলালকে খেলতে দিইনি।’ কাগজপত্র আগেই জমা দেয়া, যাচাইবাছাই করার পরও প্রথম ম্যাচ খেলা একজন খেলোয়াড়কে পরের ম্যাচ খেলতে না দেয়ার বিষয়টি ‘যাচাইবাছাই কমিটিরই দায়’ মানছেন তিনিও। তবে রাঙামাটির ফুটবলের স্বার্থে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন,‘ একটা বড় আয়োজনে এমন ছোটখাট কিছু ঘটনা হয়’ই’। কাপ্তাই উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারন সম্পাদকের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, তিনি কেনো এসব বলছেন,সেটা তিনিই ভালো জানেন।’ ‘হেলালের কাগজপত্র রাঙামাটির নয়’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, রাঙামাটির পক্ষে খেলার জন্য আমরাই তার বাফুফে অনুমোদন নিয়েছিলাম,তবে সে রাঙ্গুনিয়ার বাসিন্দা এটা সত্য।’
রাঙামাটি জেলা ফুটবল এসোসিয়েশন এর সভাপতি সাইফুল ইসলাম ভূট্টো বলছেন,‘ খেলা নির্ধারিত সময়ে শুরু না হওয়া কিংবা মাঝপথে পরিত্যক্ত হওয়া দেখতে ভালো দেখায় না। এসব খেলার আগেই সমাধান হওয়া দরকার ছিলো। কাগজপত্রে ক্রুটি থাকলে সেটা কেনো যাচাইবাছাই কমিটি,টেকনিক্যাল কমিটি দেখল না ? এসব নিয়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সেক্রেটারিকে সিরিয়াস হতে হবে। নইলে জেলার ফুটবল ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
১২ মার্চ শুরু হওয়া ১০ উপজেলার এই ফুটবল লড়াই ১৯ মার্চ শেষ হবে রাঙামাটি সদর উপজেলা আর বিলাইছড়ির মধ্যেকার খেলায়,যাতে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার।
