শংকর হোড় ॥
গত বৃহস্পতিবার রাঙামাটি জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আলহাজ¦ শাহ আলমের স্মরণসভা আয়োজন করে জেলা বিএনপি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আর এই অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে উপস্থিত ছিলেন জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আবদুল ওয়াদুদ, পৌর আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান। জেলা বিএনপির ব্যানারে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আওয়ামীলীগের দুই নেতা যোগ দেয়াকে নিয়ে ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। দলের একটি অংশ বিষয়টিকে দলের সাথে ‘বেইমানি’ বলে দাবি করছে আবার কেউ কেউ মৃত মানুষের স্মরণ সভা নিয়ে ‘রাজনীতি’ না করারও পক্ষে কথা বলছেন। তবে এই বিষয়টি নিয়ে ‘বিব্রত’ আওয়ামীলীগের এই দুই নেতা। তাদের দাবি, রাজনৈতিক কোনও কথা বলবে না, এমন নিশ্চয়তা পেয়েই সভায় যোগদান করেছেন।
জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক সুলতান মাহমুদ বাপ্পা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি স্ট্যাস্টাস দেন। পরবর্তীতে দেখা যায় অনেকেই এই স্ট্যাটাসটি শেয়ার করেন এবং কমেন্টসে নানা মন্তব্য করেন। সুলতান মাহমুদ বাপ্পা লিখেন, ‘বিএনপির ডাকা শোক সভায় অংশগ্রহন এইটা কি আওয়ামী রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বের পরিচয় হতে পারে??? আওয়ামীলীগ সরকার কে যেখানে দখলদার, হত্যা, খুন, গুম ও অবৈধ সরকার হিসেবে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে বিএনপি দলের নেতারা সেখানে কিভাবে রাঙ্গামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক কমিটির একজন সদস্য জনাব আব্দুল ওয়াদুদ সাহেব অংশ প্রহণ করে প্রশ্ন আওয়ামী নেতৃবৃন্দের কাছে???? যে সভায় আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ডাক আহব্বান করে বিএনপির নেতারা সেখানে কাপুরুষের মত একজন আওয়ামী লীগের নেতা কিভাবে সৌজন্য দেখিয়ে গেরে বসে থাকে????? বঙ্গবন্ধু কন্যার সরকার পতনের নীল নকশা বুনার আশরে সে কিভাবে উপস্থিত থাকে????? সে আওয়ামী লীগের বদৌলতে চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি হইয়েছেন ভুলে গেলে কি চলবে??? বিএনপি নেতার শোক সভা স্মৃতিচারণে আওয়ামীলীগ সরকারের নামে মিথ্যাচার প্রচারে যেখানে বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতারা উচ্চ বাকশক্তি নিয়ে কথা বলছে সেখানে একজন প্রকৃত আওয়ামী লীগ নেতা কিভাবে বসে বসে সে বক্তব্য শুনতে থাকে প্রশ্ন আমার??? আমরা এই ধরনের ছদ্মবেশি আওয়ামী লীগ নেতা চাই না…………….(একজন ভালো মানুষ বিএনপির নেতার স্মৃতিচারন শোক সভায় যাওয়া যাবে না তা নয় যদি সেটা সামাজিক, অরাজনৈতিক, ক্রিড়া, নাগরিক এমন টা জায়গায় করা হয়)’
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আরো অনেক কর্মীই এই বিষয়ে সমালোচনা করে স্ট্যাটাস দিতে দেখা যায়। এই বিষয়ে মন্তব্য জানতে পৌর আওয়ামীলীগের একাধিক নেতা ও যুবলীগের বক্তব্য জানতে চাইলে কেউ এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা বলেন, অন্য কারো দলীয় ব্যানারে এবং যেখানে সরকার পতনের ঘোষণা দেয়া হয় সেই অনুষ্ঠানে না যাওয়ায় দলীয় কর্মীর জন্য ভালো। তবে নাগরিক কিংবা সামাজিক কোনও অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া হলে সেটা ভুল হত না। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অনেক হিসাব-নিকাশ করেই পা ফেলতে হয়।

এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে চেম্বার অব কমার্সের রাঙামাটি জেলার সভাপতি আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যা হচ্ছে সেসব অসুস্থ মনমানসিকতার পরিচয়। আমাদের নেতা দীপংকর তালুকদার আমাদেরকে সব দলের নেতাকর্মীদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করতে শিখিয়েছেন। যেহেতু শাহ আলমের ভাইয়ের সাথে ২৬ বছর একসাথে চেম্বারে কাজ করেছি, সে দৃষ্টিকোণ থেকে আমাকে যখন আমন্ত্রণ করা হল, আমি গিয়েছি, তবে আমাদেরকে জানানো হয়েছিল কোনওপ্রকার রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া হবে না। সভার শুরুতে বিএনপি সেক্রেটারিও সব বক্তাকে সেটা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল, সব ঠিক ছিল। খসরু সাহেবও প্রথম দিকে ভালো বক্তব্য দিলো। কিন্তু শেষের দিকে এসে উনি সরকার বিরোধী যখন বক্তব্য দিল, তখন আমি বিব্রতবোধ করি। আমিও সেটা আশা করিনি। আর এই বিষয়টি নিয়ে যারা বিভিন্ন কথা বলছে সেটা শিখিয়ে দেয়া বাণী। আওয়ামীলীগে আমার রাজনৈতিক বয়স ৩৬ বছর আর যারা এখন এসব প্রচার করছে তাদের বয়স ২৫ বছরও হয়নি।
জানতে চাইলে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান বলেন, রেড ক্রিসেন্টের সেক্রেটারি হিসেবে আমাকে আমন্ত্রণ দেয়া হয়েছে শোকসভায় এবং সভায় কোনও রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া হবে না বলা হয়েছিল। এই বিষয়ে বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বারবার ঘোষণা দিয়েছিল সভায়। কিন্তু আমির খসরু শেষের দিকে সরকারবিরোধী বক্তব্য দিয়ে আমাদেরকে বিব্রত করেছে। আমরাও এটা আশা করিনি। আমাদের দলের নেতা দীপংকর তালুকদারও শাহ আলমকে দেখতে গিয়েছিল, এটাই রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আমি সেদিন আমার বক্তব্যেও বলেছিলাম, এভাবে দলীয় ব্যানারে না করে নাগরিক উদ্যোগে হলে অনুষ্ঠানটা ভালো হতো। সব দলের মানুষ আসতো। যেহেতু একটা বিতর্ক উঠেছে, তাই দল যদি আমার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে চায় কিংবা জানতে চায় আমি সেটার উত্তর দিতে প্রস্তুত আছি। কেউ গঠনতন্ত্রের উর্ধ্বে নয়।

জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক হাজি মুছা মাতব্বরকে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা কোন ভালো কাজ হয়নি। ওয়াদুদ ভাইকে বক্তব্য দিতে দেখেছি, ওয়াদুদ ভাই যেহেতু সরকার পতনের আন্দোলনের সভায় যোগ দিয়েছেন তাই স্বাভাবিকভাবে আগামী জেলা আওয়ামীলীগের কমিটিতে তিনি থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। আর মাহফুজ ভাই ছিলেন কিনা আমি জানি না, যদি তিনি থেকেও থাকেন তাহলে স্বাভাবিকভাবে তিনিও যোগ্যতা হারিয়েছেন। যেখানে আমাদের নেত্রীকে গালমন্দ করে কথা বলা হচ্ছে, নেত্রীকে উৎখাতের ঘোষণা দেয়া হচ্ছে, সরকারকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হচ্ছে সেখানে আওয়ামীলীগের নেতা হিসেবে তারা কিভাবে সভায় বসে থাকতে পারেন?
