রাঙামাটির বরকল উপজেলার বেগেনাছড়ি গ্রামে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। রাঙামাটি ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন ডায়াগনোসিস সেন্টারে পরীক্ষা করার পর আক্রান্ত রোগীরা হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস রোগটি নিশ্চিত করেছেন। বর্তমানে একই গ্রামের ১২জন হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্ত রোগীরা ডাক্তার ও কবিরাজের কাছে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ হেপাটাইটি ‘বি’ ভাইরাসজনিত রোগটি নিয়ে গ্রামে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে বলে আক্রান্ত রোগীদের আত্মীয়স্বজনরা জানিয়েছেন।
সরেজমিনে বেগেনাছড়ি গ্রামে গিয়ে আলাপচারিতায় হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস রোগে আক্রান্ত রোগী ছায়া রানী চাকমার (৪৩) সাথে আলাপকালে তিনি বলেন- আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে রাতে খাওয়া-দাওয়ার পরে বিছানায় শোবার পর শরীরে তীব্র শীত অনুভব হলে শরীরে কাঁপুনি শুরু হয়। বমি বমি ভাব হয় কিন্তু বমি হয় না। শরীরে প্রচন্ড জ্বর ও তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়। তীব্র জ্বালা যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে গ্রামের এক কবিরাজের শরণাপন্ন হয়ে ঝাড় ফুক করে সারা রাত কোনমতে কাটিয়ে দেয়ার পর জেলা সদরে গিয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে রোগ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা করাতে দিলে পরীক্ষায় হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস পজিটিভ ধরা পড়ে। রোগের নামটি জানার পরে আতঙ্কিত হই। মনে হয়েছিল আর বোধই বেশি দিন বাঁচবো না। কারণ ধারণা ছিল হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস রোগে আক্রান্ত হলে মানুষ বেশি দিন বাঁচে না। এমনি শঙ্কা হয়েছিল মনে।
ওই গ্রামে আক্রান্ত শুধু ছায়া রানী চাকমা নয় আরো ১২জন হেপাটাইটিস বি ভাইরাস রোগে আক্রান্ত রয়েছেন। আক্রান্তরা হচ্ছেন- বিজু মনি চাকমা (৩৮) সুভাষ মিত্র চাকমা (৩৫) মিকো চাকমা (৩৫) কালোবরণ চাকমা (২৫) উজ্জল কান্তি চাকমা (৪২) বুদ্ধ কুমার চাকমা (৩৫) বণিতা চাকমা (১৯) জুয়েল চাকমা (১৭) রুপাধন চাকমা (৩৬) কীর্তিমান চাকমা (১৯) ও সুনীল চাকমা (৩২)।
এ ছাড়াও সমাজের লোকলজ্জার ভয়ে আরো অনেকেই রোগের কথা বলতে পারছে না। তাদের ধারণা রোগটি জটিল মারাত্মক ও সংক্রামক। সমাজের মানুষ যদি তাদের সহজে মেনে না নেয়। এ ভয়ে অনেকেই আক্রান্ত হলেও গোপন রেখে চিকিৎসা করাচ্ছেন। এ রোগ নিয়ে গ্রামের মানুষের মাঝে আতংক দেখা দিয়েছে বলে গ্রামের মেম্বার প্রিয় কান্তি চাকমা জানান।
হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস রোগটি কে কখন কিভাবে আক্রান্ত হয়েছিল জানতে চাইলে বেগেনাছড়ি গ্রামের মুরব্বী রতন চাকমা বলেন- গত বছর তার ছোট ভাই রিপন চাকমার প্রথম হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসজনিত রোগটি পরীক্ষায় ধরা পড়ে। এ রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরনাপন্ন হয়ে চিকিৎসা করার পরেও তার ভাইকে বাঁচাতে পারেনি। এরপর আমার পরিবারের বাকী সদস্যদের ডায়াগনোসিস সেন্টারে নিয়ে পরীক্ষা করার পর আমার আরেক ছোট ভাই সুভাষ মিত্র চাকমা মেয়ে বণিতা চাকমা ও ছেলে জুয়েল চাকমার হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসের পজিটিভি পাওয়া যায়। এতে আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা রীতিমত আতংকিত হয়ে পড়ি। বর্তমানে তাদের চিকিৎসা করাতে আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। সামান্য জুম চাষ ও বাগান চাষ করে যা পায় রোগীদের চিকিৎসার খরচে চলে যায়। টাকার অভাবে দীর্ঘ চিকিৎসা কি ভাবে করাবে? কি খাবে? তা নিয়ে উদ্বিগ্ন রতন চাকমা। এরপর রতন চাকমা গ্রামের মানুষদের ডায়াগনোসিস সেন্টারে গিয়ে পরীক্ষা করার জন্য উৎসাহিত করে। এতে গ্রামের মানুষ পরীক্ষা করে হেপাটাইটিসবি ভাইরাসের ১২জন মানুষের পজিটিভ ধরা পরে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা স¦াস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ মংক্যছিং সাগর হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস রোগে আক্রান্ত হওয়া রোগীদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন- হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস জনিত রোগটি হওয়ার আগে টিকা দিতে হবে। রোগটি হওয়ার পরে টিকা দিলে কোন লাভ হবে না। যারা আক্রান্ত হয়েছে তাদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা নিতে হবে। এ রোগটি পজিটিভ হলেও আতংকের কিছু নেই। দীর্ঘ চিকিৎসায় এ রোগ নির্মূল করা যায়। তবে তার জন্য সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে ও পরার্মশ মেনে চলতে হবে।
এ ব্যাপারে জেলা সিভিল সার্জন শহীদ তালুকদার বলেন, হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্ত হলে আতংকিত হওয়ার কিছু নেই। গর্ভবতী মায়েদের নিয়মিত টিকা দেয়া সচেতনতা ও পরামর্শ মেনে চললে সমস্যা হয় না। ওই গ্রামে একটি মেডিকেল টিম সার্ভে করার জন্য পাঠানো হবে। পরবর্তীতে যা করার প্রয়োজন তা করা হবে বলে সিভিল সার্জন অভিমত ব্যক্ত করেন।