রাঙামাটির রাজনীতির সাথে নানাভাবেই মিশে আছেন তিনি,বাগ্নিতা কিংবা জানার পরিধি,বিতর্ক কিংবা আলোচনায় মুখর করে রাখা অথবা তুমুল তর্কেও যুক্তিতে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেয়ায় জুরি নেই তার। সফল ব্যবসায়ি থেকে হয়েছেন সফল রাজনীতিবিদও। রাজনীতির মাঠে কূশলী খেলোয়াড় হিসেবে খ্যাতিও আছে তার। দুই মেয়াদে রাঙামাটি পৌরসভার মেয়র হিসেবেও ছিলেন ‘ড্যাশিং’। তৃতীয় মেয়াদেও ছিলেন শক্ত প্রার্থী। কিন্তু সেইবার মনোনয়ন না পেয়ে ‘অভিমান কিংবা মূল্যায়নহীনতায়’ কিছুটা দূরেই ছিলেন সেইসময়কার জনপ্রিয় মেয়র। তার ফলও তার দল হাড়েহাড়ে পেয়েছে গোহারা হেরে ! প্রমাণ করে দিয়েছিলেন তখনো তার অপরিহার্যতা। সেইবার তার নির্লিপ্ততায় পরাজিত আওয়ামীলীগ এর পরের নির্বাচনেও তার ভীতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি ! ফলে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন ক্ষমতাসীন দলটিকে। বাধ্য হয়ে নানান ‘কৌশল’ ও ‘চাপ’ প্রয়োগ করে তাকে নির্বাচনী মাঠ থেকে সরাতে হয়,ক্ষমতার নানান বলয় ব্যবহার করেই,সেই সাথে ‘ভবিষ্যতে মূল্যায়নের আশ্বাস’ তো ছিলোই !
কাংখিত ‘সেই ভবিষ্যত’ পাঁচ বছর পর সমাগত প্রায়। ইতোমধ্যেই পৌর নির্বাচনের প্রথম দফার তফশিল ঘোষণা করা হয়েছে,ধারণা করা হচ্ছে দ্বিতীয় বা তৃতীয় দফায় থাকবে রাঙামাটি পৌরসভার নাম। ফলে মাঠে নেমে পড়েছেন প্রার্থীরা। ক্ষমতাসীন দলের বর্তমান মেয়রের দাপুটে প্রভাবের কাছে ‘মিইয়ে’ থাকা অন্যান্য প্রার্থীদের ভীড়ে ঠিকই জ¦লজ¦ল করছেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে সেই পুরনো মেয়র,পুরোনো প্রার্থী আবার নতুন প্রার্থী হয়ে,সেই একই মানুষ,হাবিবুর রহমান। যাকে ভয়,সমীহ কিংবা শ্রদ্ধা করতে বাধ্য হচ্ছেন প্রবল প্রতাপশালী ক্ষমতাসীন দলের জেলার শীর্ষ নেতারাও। কারণ তারা জানেন, পুরোনো প্রতিশ্রুতি পালনের ‘দায়বদ্ধতা’ এবার হয়তো ‘বাধ্যবাধকতা’ হতে পারে,যদি চালে ভুল হয় ! মনোনয়ন দৌড়ে তাই বর্তমান মেয়রকে বেশ চাপেই ফেলে দিয়েছেন দুই বারের পুরোনো মেয়র এবং দুইবার চ্যালেজ্ঞ ছুড়ে দিয়েও রেস থেকে সড়ে গিয়ে সেক্রিফাইস করা মেয়র প্রার্থী ‘হাবিবুর রহমান’।
কে এই হাবিবুর রহমান ?
১৯৭৬ সালে ব্যবসায়ি হিসেবেই পার্বত্য রাঙামাটিতে আসেন হাবিবুর রহমান নামের এক তরুণ। নিজের প্রচেষ্টা আর মেধায় পরিণত হন জেলার অন্যতম শীর্ষ ঠিকাদারে। পারিবারিক বলয়েই প্রগতিশীল ঘরানার হাবিব আশিরদশকে যুক্ত হন আওয়ামী রাজনীতির সাথে। জেলা আওয়ামীলীগের একজন সহসভাপতির মৃত্যুতে শূণ্য পদে কোঅপ্ট করার মধ্য দিয়েই তার আওয়ামী রাজনীতিতে সরাসরি পদচারণা শুরু হয়। তবে ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী দীপংকর তালুকদারের চীফ এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন ও বিজয়ী করার মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসেন সেই সময়কার ধর্নাঢ্য ঠিকাদার হাবিব। এর পরের নির্বাচনেও একই দায়িত্ব পালন করেন। তবে এরই মধ্যে ১৯৯২ সালে গঠিত রাঙামাটি পৌর আওয়ামীলীগের প্রথম কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পান তিনি। সেই সাথে জেলা আওয়ামীলীগের সদস্যও মনোনীত হন। সুবক্তা এবং জোরালো কন্ঠস্বরের কারণে দলের মধ্যে বাড়তে থাকে তার প্রভাব বলয়ও। এরই পুরষ্কার হিসেবে ১৯৯৯ সালে আওয়ামীলীগের হয়ে মেয়র পদে প্রার্থী হন তিনি এবং সেই প্রথমবারের মতো রাঙামাটি পৌরসভায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে চমকে দেন সবাইকে। তার বিপক্ষে পরাজিত সেইসময়কার চেয়ারম্যান মনিস্বপন দেওয়ান পরে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পার্বত্য উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০৪ সালে ফের পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে দ্বিতীয় দফা মনোনয়ন পান হাবিব। সেইবার বিএনপির প্রার্থী মোঃ শাহ আলম ( বর্তমানে জেলা বিএনপির সভাপতি)’ কে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন দ্বিতীয় দফায়। ২০১১ সালে তৃতীয় দফায় মেয়র নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাননি তিনি। প্রার্থিতা না পেয়ে দৃশ্যত নিশ্চুপ ছিলেন তিনি।
আওয়ামীলীগ আব্দুল মতিনকে প্রার্থী করলে বিএনপির সাইফুল ইসলাম ভূট্টোর কাছে পরাজিত হন তিনি। ফলে একযুগ পর পৌরসভা হাতছাড়া হয় আওয়ামীলীগের।
২০১৫ সালের পরবর্তী নির্বাচনে আবারো দলীয় মনোনয়ন চান হাবিব। কিন্তু দল হাবিবকে মনোনয়ন না দিয়ে মনোনয়ন দেয় তরুন যুবলীগ নেতা আকবরকে। ফলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়ান হাবিব। ক্ষমতাসীন দলের বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও তার ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত্র আওয়ামীলীগ তার সাথে দফায় দফায় বৈঠক করে মনোনয়ন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে বাধ্য করে। কান্নাজড়িতকন্ঠে আওয়ামীলীগ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মনোনয়ন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন হাবিব। যদিও সেই নির্বাচনেই দলের পক্ষ হয়ে হাবিব কাজ করেছিলেন মাঠে।
পাঁচবছর পর আবার পৌর নির্বাচন সমাগত। আবারো প্রার্থী হতে মাঠে হাজির। আবারো তাকে নিয়েই সংশয়ে সবাই। তবে বিগত দুই নির্বাচনের চেয়ে এবার অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন হাবিব। সর্বশেষ নির্বাচনে যে ঐক্যবদ্ধ আওয়ামীলীগ তাকে চাপ দিয়ে নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়াতে বাধ্য করেছিলো সেই বাস্তবতাও এখন আর নাই। নানান ধারা-উপধারায় বিভক্ত আওয়ামীলীগ এবার নিজেই দোটানায়। দলটিতে এখন এমন একজন প্রার্থীও আলোচনায় নেই,যাকে মনোনয়ন দিলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে পুরো দল। বর্তমান মেয়রের বিকল্প হিসেবে অনেকেই হাবিবকে নিয়েই এগোচ্ছেন। নানা কারণে সমালোচিত বর্তমান মেয়রকে ‘সাইজ’ করতে পুরোনো হাবিবেই আস্থা খুঁজছেন তারা। কেউ কেউ ‘অনভিজ্ঞ ও ব্যর্থ’তার বিপরীতে ‘অভিজ্ঞ ও যোগ্য’কে মনোনয়ন দেয়ার দাবি তুলছেন,দলের ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থেই। মূল্যায়ন করছেন অতীত ও বর্তমানের,যাতে স্পষ্টতই এগিয়ে হাবিব।
কি বলছেন হাবিব ?
মেয়র পদে মনোনয়ন পেতে পুরো আশাবাদী হাবিব বলছেন, ‘আমার বিশ^াস আমার দল আমাকে মূল্যায়ন করবে। গত দুইবার আমি দলীয় প্রার্থীকে ছাড় দিয়েছি,এবার আমাকে নিশ্চয়ই ছাড় দেয়া হবে।’
হাবিব বলেন-‘শুধুমাত্র দল মনোনয়ন দিলেই নির্বাচন করব,অন্যথায় নয়।’
‘তিনি আওয়ামীলীগের কেউ না’- এমন মন্তব্য হাসিতে উড়িয়ে দিয়ে হাবিব বলছেন-‘ ৪০ বছর আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে জড়িত থাকার পর নতুন আওয়ামীলীগারদের কাছে আমার পরিচয় যদি নতুন করে দিতে হয়,তবে কিছু বলার নাই। আমি আওয়ামীলীগ নাকি কি,সেটা দলের সিনিয়র-প্রবীন ও দায়িত্বশীল নেতারা জানে।’
হাবিবুর রহমান বলেন- যদি আওয়ামীলীগের কেউ না হই তবে আমি স্থগিত কাউন্সিলে কাউন্সিলর কিভাবে হলাম ? জাতীয় সংসদ নির্বাচন,বাঘাইছড়ি পৌরসভা নির্বাচনে কিভাবে দলের পক্ষে প্রচারণায় আমাকে ব্যবহার করা হলো ? সর্বশেষ পৌরসভা নির্বাচনেও আমি প্রার্থীতা প্রত্যাহারের পর কিভাবে বর্তমান মেয়রের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলাম ?’
হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমি হয়তো বর্তমান জেলা কমিটিতে নাই,কিন্তু আমি আওয়ামীলীগের প্রাথমিক সদস্য। এটা ভুলে গেলে চলবে না। যারা এসব বলে তারা রাজনীতির ‘অবুঝ কিশোর’।
মনোনয়ন পেলে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী হাবিব বলেন-আমার আমলে করা উন্নয়নের গল্প এখনো করে মানুষ। আমার পরে যারা দায়িত্ব পালন করেছে,তারা সেই ধারাবাহিকতা রাখতে পারে নাই। দলের ভাবমূর্তি উদ্ধার এবং রাঙামাটিকে আধুনিক পৌরসভা হিসেবে নির্মাণ করার জন্য আমি কাজ করব। আমার বিশ্বাস,আমার দল আওয়ামীলীগ আমাকেই দলীয় মনোনয়ন দেবে।’
