শুক্রবারের তান্ডবের পর শনিবার সকাল হতেই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির লংগদু উপজেলার জীবনযাপন। বেলা দুইটার দিকে উপজেলা থেকে ১৪৪ ধারা তুলে নেয়ার পর দৃশ্যত: পুরনো চেহারাতেই কিছুটা হলেও ফিরে এসেছে ছোট্ট এই উপজেলা সদরটি।
সকালে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মানজারুল মান্নান, পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এরপরই ১৪৪ ধারা প্রত্যাহারের ঘোষনা দেন জেলা প্রশাসক। এছাড়া ক্ষতিক্ষস্তদের প্রকৃত ক্ষতি নিরূপনে তিন সদস্যের একটি ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন কমিটি করা হয়েছে। এতে সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আবু তৈয়ব এবং স্থানীয় পাড়া প্রধান সুচিত্র কার্বারিকে সদস্য করা হয়েছে।
এক মামলায় ৩০০ আসামী
অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ৩০০ জনকে আসামী করে লংগদু থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসআই দুলাল হোসেন বাদী হয়ে এই মামলাটি করেছেন। ইতোমধ্যেই ৭ জনকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতরা হলেন- সাইফুল,শাহ আলম,মো: শহীদ,আবুল কালাম,শরিফুল,শরিফ এবং মো: মোস্তফা। অন্যান্য আসামীদের গ্রেফতারেও অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন লংগদু থানার অফিসার অফিসার ইনচার্জ মোমিনুল ইসলাম। এদিকে গ্রেফতার আতংকে পুরুষশূণ্য হয়ে পড়েছে লংগদু উপজেলা সদর।
‘ক্ষতিপূরণ নয়,বিচার চাই’
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে বিশেষ আইনশৃংখলাসভায় মিলিত হন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার। সেখানে লংগদুর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি,রাজনৈতিক দলের ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এসময় ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কুলিনমিত্র চাকমা আদু,আটারকছড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মঙ্গল কান্তি চাকমা,উপজেলা জনসংহতি সমিতির সম্পাদক মনিশংকর চাকমা।
জনসংহতি সমিতির সম্পাদক মনিশংকর চাকমা বলেন, ‘আমরা ক্ষতিপূরণ চাই,অপরাধীদের বিচার চাই। এই ঘটনার সাথে যারাই জড়িত তাদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। আমি চেষ্টা করছি সবাইকে আবার ফিরিয়ে আনতে,কিন্তু তারাতো আমার কথায় আশ্বস্ত হতে পারছেন না। তিনি কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, আমার বাসায় যারা আগুন দিয়েছে তারা তো অপরিচিত কেউ না, আমার সকাল বিকাল দেখা হয়, আমার বাসায় আসে, এমন পরিচিত মুখ। আমার ঘরে তারা কি করে আগুন দিলো ? এই কষ্ট আমি কোথায় রাখি ? সকালে আমাকে প্রশাসন থেকে আশ্বাস দেয়া হলো, কিচ্ছু হবেনা,যার আগের দিন পালিয়ে গেছে,তাদের ফিরিয়ে নিয়ে আসেন,কিন্তু কি হলো ? কেনো এই ঘটনা হলো ? আমাদের সাহায্য দরকার নাই, আমরা প্রয়োজনে না খেয়ে মারা যাবো, তবুও যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের আইনের আওতায় আনা হোক। ’
ঘটনার সাথে জড়িতদের ও ইন্ধনদাতাদের খুঁজে বের করার দাবি জানিয়ে আটারকছড়া ইউপি চেয়ারম্যান মঙ্গল কান্তি চাকমা বলেন, একটা সভ্য শেষে এমন বর্বর ঘটনা কি করে হতে পারে ? কোথায় বাস করছি আমরা ?
নিরাপত্তা পোস্ট করার প্রস্তাব
সভায় পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মো: জানে আলম বলেন, পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামে যে শান্তির বাতাস বইতে শুরু করেছে,তাকে নষ্ট করে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলা করতে চাইছে কুচক্রি মহল। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত সবাইকে যথাযথভাবে পুনবার্সন করার দাবি জানান। শিক্ষক আব্দুল রহিম যে এলাকায় ঘটনা সংঘটিত হয়েছে,সেখানে নিরাপত্তা পোস্ট স্থাপনের প্রস্তাব করেন।
‘মিলবে ক্ষতিপূরণ,অপরাধীদের ছাড় নয়’
সভায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার তাদের বক্তব্যে এই ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনী পদক্ষেপ নেয়ার ঘোষনা দেন। এবং এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ফিরে আসার আহ্বান জানান। প্রত্যেকের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি অনুসারে ক্ষতিপূরণ প্রদান,আর বাড়ী নির্মাণের আগ পর্যন্ত লংগদু সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও তিনটিলা বনবিহারে থাকার ব্যবস্থা এবং তাদের খাবার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন। আর ক্ষতিক্ষ¯্রÍরা যাতে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন, সেই জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।
চাঁদাবাজিকে দুষলেন জেলা প্রশাসক
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান সভায় বলেন, নয়ন কেনো মারা গেলো,কারা মারলো, এই ঘটনার জেরে যা ঘটলো এটা মেনে নেয়া কঠিন। তিনি বলেন,জেএসএস,ইউপিডিএফ এবং জেএসএস-সংস্কার এই তিনটি সংগঠনের চাঁদাবাজির কারণে পাহাড়ের সব মানুষ অসহায়। একজন সাধারন পাহাড়ী যে জুম চাষ করে জীবন নির্বাহ করে তাকেও একটি কলার ছড়ার জন্য পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়।যদি এইসব অন্যায় বন্ধ না করেন,তবে তো এই ধরণের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। এই চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে,অস্ত্রবাজি বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, আপনার ঘর পুড়েছে,আমরা ঘর করে দিতে পারব,কিন্তু আস্থার জায়গায় বিশ্বাসের জায়গাটা আপনারা পাহাড়ী-বাঙালী মিলে মিশেই তৈরি করতে হবে।
ধীরে ধীরে বাড়ী ফিরছে মানুষ
গত বৃহস্পতিবার নয়নের লাশ পাওয়ার খবর পাওয়ার পরই নিজ নিজ বাসা থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন কিছু পাহাড়ী। এরপর শুক্রবার সকালে অগ্নিসংযোগ শুরু হলে বাকীরাও পালিয়ে যান। শনিবার সকাল থেকে ধীরে ধীরে বাড়ীতে ফিরে আসতে শুরু করেছেন তারা। অনেকে পোড়া ভিটার সামনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। কোথায় থাকবেন,কি খাবেন এক অনিশ্চিত গন্তব্যেই যেনো যাত্রা শুরু তাদের।
নিজের পোড়া বাড়ী সামনে স্বাস্থ্য বিভাগের স্বাস্থ্য সহকারি প্রমথ চাকমা বলেন, নয়ন খুব ভালো ছেলে, সবসময় পথে দেখা হলে নমষ্কার দিতো,কূশল বিনিময় করতো,কখনো কারো সাথে বিবাদ বা ঝগড়া করতে দেখিনি। এই ভালো ছেলেটিকে যেই হত্যা করুক, আমি তার বিচার চাই। কিন্তু এই জের ধরে আমার বাড়ী কেনো পুড়িয়ে দেয়া হলো আমি জানিনা। আমি এখন কোথায় যাবো ? কি খাবো ? কিচ্ছু জানিনা।
নয়ন হত্যার বিচার চাইলো পরিবার
লংগদু সফররত জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সাথে সাক্ষাত করে তার খুনিদের বিচারের দাবি জানিয়েছে নুরুল ইসলাম নয়নের পরিবার। পেশায় মোটর সাইকেল চালক এই যুবলীগ নেতা উপজেলা সদরে সবার পরিচিত ও প্রিয় মুখ। ভালো ফুটবল খেলোয়াড় হওয়ায় সবার বাড়তি ভালোবাসাও পেতেন তিনি। তার সন্তানদের সান্তনা দিয়ে জেলা প্রশাসক জানান, অবশ্যই নয়নের খুনিদেরও গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় আনা হবে। তিনি নয়নের পরিবারকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এসময় মোটর সাইকেল চালক সমিতির সভাপতি মো: সবুজ নয়ন হত্যার জন্য পাহাড়ের আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে দায়ি করে বলেন, জেএসএস অথবা ইউপিডিএফ এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার লংগদু উপজেলার সদর ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ভাড়ার মোটর সাইকেল চালক নুরুল ইসলাম নয়ন দুইজন যাত্রী নিয়ে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় যায়। সেদিনই দুপুরে দীঘিনালার চারমাইল এলাকায় তার লাশ পাওয়া যায়। বাঙালীরা এই ঘটনার জন্য পাহাড়ের আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে দায়ি করেছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার সকালে নয়নের লাশ একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল উপজেলা সদরে আসার পথে পাহাড়ীদের বাড়ীঘরে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ করে। এসময় শতাধিক বাড়ীঘর আগুনে পুড়ে যায়।
‘অপপ্রচার ও উস্কানি’র নিন্দা বাঙালী ছাত্র পরিষদের
লংগদু উপজেলার মোটর সাইকেল চালক নুরুল ইসলাম নয়ন (৪০) কে পরিকল্পিত ভাবে পাহাড়ি সন্ত্রাসী সংগঠন কর্তৃক হত্যার পর নয়ন হত্যাকান্ড ধামাচাপা দিতে উপজাতিয় সন্ত্রাসী সংগঠন ও একটি কুচক্রি মহল বিভিন্ন ভাবে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে’ বলে অভিযোগ করেছে পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদ,রাঙামাটি জেলা শাখা।
শনিবার দেয়া এক বিবৃতিতে পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের রাঙামাটি জেলা সভাপতি আলমগীর হোসেন ও সাধারন সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেন, ‘তারা (পাহাড়ী সংগঠন) সাধারন মানুষের বসত বাড়িতে অগ্নিসংযোগের মত ভয়াবহ কাজে লিপ্ত হয়ে তার দোষ সাধারন বাঙালিদের উপর চাপাচ্ছে,তারই প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং কিছু কিছু প্রচার মাধ্যম (মিডিয়া)অতি উৎসাহিত হয়ে কিছু ব্যাক্তি অন্য কোন ঘটনার ছবি দিয়ে অপপ্রচারের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিচ্ছে।’
বিবৃতিতে দাবি করা হয়,অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে গণমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত বেশিরভাগ ছবিই অন্য ঘটনার ছবি। এসবের কোনটি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল পল্লীতে আগুন দেয়ার ছবি, টঙ্গীতে বয়লার বিষ্ফোরণের ছবি, আবার কোনোটি বরিশালে বিস্কুটের গোডাউনে আগুনের ছবি।’
পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ এহেন মিথ্যা অপপ্রচার বন্ধে প্রশাসনের দ্রুতত ব্যাবস্থা নিতে এবং অপপ্রচারকারিদের তথ্য প্রযুক্তি আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।
একই বিবৃতিতে,নয়ন হত্যাকান্ডের আজ তিন দিন অতিবাহিত হলেও প্রশাসন হত্যার সাথে জড়িত কোন ব্যাক্তিকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার না করে উল্টো মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে অসংখ্য সাধারন বাঙালিদের গণগ্রেপ্তার চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করে উক্ত গনগ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, আগামি ১২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত নিরীহ সাধারন বাঙালিদের নিঃশর্ত মুক্তি না দিলে তিন পার্বত্য জেলায় পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ কঠিন থেকে কঠিনতর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে।
