জিয়াউল জিয়া
রাঙামাটির কাপ্তাই এলাকায় বেড়েছে বুনো হাতির আক্রমণ। প্রায় সময় সড়ক ও সরকারি স্থাপনায় ঢুকে তা-ব চালাচ্ছে বুনো হাতির দল। এতে এসব এলাকায় বসবাসকারী মানুষের মাঝে হাতি আতঙ্ক বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য মতে, মার্চ মাসে হাতির আক্রমণে কাপ্তাইয়ে ২ জন এবং গত ২ বছরে ৮জন মানুষ মারা গেছে। এছাড়া বুনো হাতির আক্রমণে ফসল ও ঘরবাড়ির ক্ষতিসাধন হচ্ছে। এদিকে সমস্যা সমাধানে ৮ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সোলার ফেন্সিং সিস্টেমের মাধ্যমে হাতি চলাচল নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবছে বনবিভাগ। হাতির আক্রমণে প্রশাসনের লোকজনও রয়েছে আতঙ্কে। আর এই সিস্টেম চালুর পূর্বে গবেষণার ওপর জোর দিলেন বিশেষজ্ঞরা।
জানা গেছে, কাপ্তাইয়ের প্রশান্তি পার্ক এলাকা, শিলছড়ি গেইট প্রবেশমুখ, কাপ্তাই লগগেইট এলাকা, নৌবাহিনী সড়ক ও কামিলাছড়ি-আসামবস্তি সড়ক, রাইখালি, ব্যঙছড়িসহ কয়েকটি এলাকার পাহাড়ে রয়েছে বুনো হাতির পাল। পাহাড়ে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত খাবারের ওপর নির্ভরশীল এসব হাতি খাবারের সন্ধানে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়। বন বিভাগের তথ্য মতে, কাপ্তাই উপজেলায় রিজার্ভ ফরেস্টে ৪০টি বুনো হাতি বসবাস করে। এদিকে বুনো হাতির প্রাকৃতিক খাদ্য সঙ্কট, হাতির আবাসস্থলে মানুষের বসবাস বেড়ে যাওয়া, সড়ক নির্মাণ, প্রাকৃতিক ঝিরি-ঝর্ণা শুকিয়ে যাওয়ার কারণে হাতি খাবার ও পানির সন্ধানে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাচ্ছে। এতে প্রতিনিয়ত হাতি ও মানুষ মুখোমুখি হচ্ছে।
বন বিভাগের তথ্য মতে, মূলতঃ এশিয়া ও আফ্রিকান এই দুই প্রজাতির হাতি পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচরণ করছে। এদের গড় আয়ু ৬০ থেকে ৭০ বছর। এসব হাতি ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সে সন্তান জন্ম দেয়া শুরু করে হস্তিনী। গত আট বছরে জেলায় বুনো হাতির আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছে ২০ জন। বন বিভাগের সবশেষ তথ্য মতে. গত ৫ বছরে ৬টি হাতিরও মৃত্যু হয়েছে। খাবার সংগ্রহে গিয়ে হাতি লোকালয়ে চলে আসায় বেড়েছে হাতির আতঙ্ক। মার্চ মাসে রাঙামাটি আসামবস্তি সড়কের কামিলাছড়ি এলাকায় ৫ দিনের ব্যবধানে পর্যটকসহ দুই জন মারা যায়। শুধু কাপ্তাই নয়, জেলার লংগদু, রাজস্থলী ও বিলাইছড়ি উপজেলাতেও রয়েছে বুনো হাতি। এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে খাবারের সন্ধানে গিয়ে রাস্তার ওপর মানুষ দেখলেই ক্ষীপ্ত হয়ে ক্ষতিসাধন করছে মানুষের। এতে এই এলাকায় চলাচলকারী মানুষের মাঝে আতঙ্ক ও ভীতি কাজ করছে।
বেসরকারি চাকুরিজীবী মো. মনছুর আলী বলেন, আমি বাড়ি কাপ্তাই উপজেলার বড়ইছড়িতে আর আমার অফিস নতুন বাজারে। প্রায় কাজ শেষে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়। সন্ধ্যায় ন্যাশনাল পার্ক এলাকায় প্রায় পথে হাতির দেখা মেলে। ভয়ে অপেক্ষা করা ছড়া কোন উপায় থাকে না। বড় ট্রাকের হর্ন শুনে সরে গলে তখনই চলাচলা করা সম্ভব।
রাঙামাটি কাপ্তাই সার্কেল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রওশন আরা রব বলেন, আমার অফিসের আশেপাশে লোকালয় খুবই কম। সন্ধ্যার পর ভয়ে কেউ বের হতে পারে না। পায়ে হেটে যাওয়ার কথা তো চিন্তাও করা যায় না। গাড়িতে চলাচল করলেও ভয়ে থাকতে হয় পথে হাতি পড়ে কিনা। অনেক সময় তারা দল বেঁধে চলাচল করে। হাতির দল সামনে পড়ে গেলে সেটি আসলেই খুবই ভীতিকর অবস্থা। কয়েক মাসের মধ্যে প্রায় আমার অফিসের করিডোরে হাতি চলে আসছে।
এদিকে হাতি যেন লোকালয়ে এসে ক্ষতি সাধন না করে সে জন্য হাতির চলাচলের রাস্তা ঠিক রাখতে কাপ্তাইয়ের ৮ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সোলার ফেন্সিং সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বনবিভাগ। এর আগে বাংলাদেশের শেরপুর এবং বান্দরবানে হাতি তাড়াতে সোলার ফেন্সিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
বনবিভাগের কাপ্তাই রেঞ্জ রেঞ্জার মহসীন তালুকদার বলেন, কাপ্তাই নেভিক্যাম্প এলাকা থেকে ন্যাশনাল পার্ক এলাকায় পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার জায়গা পর্যন্ত সোলার ফেন্সিং সিস্টেম বসানোর পরিকল্পনা নিয়েছি। এটি বাস্তবায়ন হলে লোকালয়ে এসে হাতি যে আক্রমন করে সেটি কিছুটা কমে আসবে বলে মনে হচ্ছে।
রাঙামাটি পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রফিকুজ্জামান শাহ বলেন, কাপ্তাইয়ের অনেক এলাকাজুড়ে হাতির বসবাস। হাতির আবাসস্থলগুলোতে বিভিন্ন স্থাপনা ও ঘরবাড়ি তৈরি হওয়ার কারণে হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের পথ বা করিডোরটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। করিডোর নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে হাতি লোকালয়ে চলে আসছে। সোলার ফেন্সিং করা হলে হাতি লোকালয়ে আসার চেষ্টা করলে সোলার ফেন্সিং এর যে তার থাকবে সেতারে সর্ট খেয়ে যে ফিরে যাবে। সে সহজে লোকালয়ে আসতে পারবে না।
কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনতাসির জাহান বলেন, আমার দায়িত্ব থাকাকালীন এই ৮ মাসে হাতির আক্রমণে ৩টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং অসংখ্য বাড়িঘর ও ফসলি জমি নষ্ট হয়েছে। হাতিকে তার নিজস্ব করিডোরে রাখার জন্য সোলার ফেন্সিং সিস্টেম চালুর ব্যাপারে প্রকল্প দিয়েছিলাম এবং তা পাশও হয়েছে। কোভিডের কারণে অর্থ ছাড় না হওয়াতে কাজটি শুরু হয়নি। আশা করছি, আাগামী সেপ্টেম্বর মাসে কাজটি শুরু করা যাবে।
রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) ফরেস্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স বিভাগের ডিন ড. সুপ্রিয় চাকমা বলেন, হাতির করিডোরগুলোতে মানুষের ঘরবাড়ি নির্মাণ ও বনে খাদ্য সঙ্কটের কারণে হাতি-মানুষ মুখোমুখি হচ্ছে। সোলার ফেন্সিং না করতে পারলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে করতে হয়। মানুষের জানমালের নিরাপত্তার সাথে সাথে হাতির যাতে আবাসস্থল সেটা যেন সংকুচিত হয়ে না যায়, সেসব বিষয় মাথা রেখেই ফেন্সিং কারা যায়। তবে সে ক্ষেত্রে সোলার ফেন্সিং সিস্টেম চালুর পূর্বে এই বিষয়ে গবেষণা অতীব জরুরি।
