২৭ মার্চ বিশ্ব নাট্য দিবস। ১৯৬২ সাল থেকে এ দিনটি সারা বিশ্বে একযোগে পালিত হয়ে আসছে। নাট্যজনদের এই দিবসকে ঘিরে দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পাহাড় টোয়েন্টিফোর ডট কম’র নিজস্ব প্রতিবেদক সাইফুল হাসান কথা বলেছেন রাঙামাটির নাট্যঙ্গনের তরুণ উজ্জ্বলতর নক্ষত্র সোহেল রানার সাথে। রাঙামাটি জেলা শিল্পকলা একাডেমীর প্রশিক্ষক, বাংলাদেশ বেতার রাঙামাটি আঞ্চলিক কেন্দ্রের নাট্য প্রযোজক এবং রাঙাবী থিয়েটারের সভাপতি সোহেল রানা খোলামেলা আলোচনায় নিজের নাটকজীবনে আসা,প্রেক্ষিত ও বাস্তবতার পাশাপাশি বলেছেন এই জেলার নাটকের সমস্যা সম্ভাবনার নানান দিক নিয়েও। জানিয়েছেন নিজের ভবিষ্যত পরিকল্পনাও।
পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে নাট্য জগৎ কে আগলে ধরে রেখে বহু শিল্পি গড়ার কারিগর সোহেল রানা। নাট্য জগতকে যিনি জেলা জুড়ে সর্বাধিক পরিচিত ও অনন্য এক শিখড়ে নিয়ে গেছেন। ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর জাতীয় পর্যায়ের একটি নাটক ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’ এ নাটকটি দিয়েই মঞ্চের অভিষেক হয়েছে তারা। সে থেকে আগড়ে ধরেছেন নাট্য জগতকে।
সোহেল রানা জানান, তার বাবা একজন ক্রীড়া প্রেমিক মানুষ ছিলেন, তাই পিতার ইচ্ছা ছিলো সোহেল রানা খেলাধুলা করবেন এবং ডিস্ট্রিক টিমে খেলবেন। তবে সোহেল রানার মনে পূর্বেই জায়গা করে নিয়েছিলো অভিনয়। তাই মাঠে খেলাধুলার অনুশীলন শেষে তিনি ছুটে যেতেন রাঙামাটি জেলা শিল্পকলা একাডেমির প্রাঙ্গণে। সোহেল রানার চিন্তা, চেতনায় ও ভাবনায় ছিলো নাটক এবং একজন অভিনয় জগতের শিল্পি হওয়া।
রানা বলেন, আমার গুরু স্বর্গীয় শ্রী রণজিত কুমার মিত্রের কাছ থেকেই আমি অভিনয় শিখেছি। তিনি আমাকে সব সময় তার আরেকটি ছেলে মনে করতেন। আমি সৌভাগ্যবান তার মতো পিতৃতুল্য একজন গুরু পেয়েছি। আমি অপেক্ষায় থাকতাম কবে শুক্রবার আসবে। স্যার প্রথমে এসে সবাইকে চিত্রাংকন শিখাতো, তারপর চিত্রাংকনের শিক্ষার্থীরা চলে গেলে নাট্য বিভাগের শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে বসতেন এবং ব্ল্যাক বোর্ডে একটি শব্দ লিখতেন তা আমাদেরকে উচ্চারণ করতে বলতেন। এছাড়া বিভিন্ন নাট্য কৌশল ও ব্যায়াম করাতেন। সে ভাবে আস্তে আস্তে আমি একজন অভিনেতা হয়ে উঠি এবং নাট্য জগতে প্রবেশ করি। পরে স্যার স্বর্গবাসী হবার পর, দীর্ঘদিন সে জায়গায় তার অন্য কোন অনুসারি আসতে পারেনি। আমি স্যারের সেই দিয়ে যাওয়া শিক্ষা লালন এবং ধারণ করে তার জায়গায় দাঁড়িয়ে সেই শিল্পকলায় শত শিক্ষার্থীকে আজ নাট্য বিষয়ক প্রশিক্ষণ দিচ্ছি দীর্ঘদিন ধরে।
তিনি আরও বলেন, নাটকের শিল্পীর বড়ই অভাব ছিলো তখন, নারী শিল্পীর অভাব ছিলো বেশি, বেশি। সেই থেকে আমার টার্গেট ছিলো কিভাবে এ শিল্পকে রাঙামাটি জেলা জুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। সেই থেকে আমার একটি স্বপ্ন ছিলো রাঙামাটিতে একটি থিয়েটার করার। সে ভাবনা থেকে ২০০৭ সালে অসাম্প্রদায়িক চিন্তা, চেতনা, দেশ প্রেম ও সমাজের জন্য কিছু করার দায়বদ্ধতাকে থেকে ‘রাঙাবী থিয়েটার’ নামক একটি থিয়েটার সৃষ্টি করি। যে থিয়েটার অদ্যবধি বিভিন্ন বিষয়ে পথ নাটক, পাপেট শো, মঞ্চ নাটক করে আসছে। আমরা জেলার প্রতিটি ইউনিয়নে ইউনিয়নে এমনকি দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় গিয়ে সচেতনতা মূলক পথ নাটক করেছি। পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ছাড়াও খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে আমরা পথ নাটক করেছি। এই নাটক দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছে উপজেলার ও জেলার তরুণেরা। সে সময়ে আমাদের প্রায় ৬০/৭০ জন শিল্পি হয়ে গিয়েছিলো। আজও আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমার এ থিয়েটারে আজ বহু শিক্ষার্থী রয়েছে যারা সমাজের কাছে এক একজন নাট্য শিল্পি হিসেবে পরিচিত।
সোহেল রানা প্রতিবেদককে বলেন, জেলা শিল্পকলায় আমরা প্রতিদিন ক্লাস করাচ্ছি, কোন না কোন দিবস ভিত্তিক বিভিন্ন নাটক করে এই নাট্য জগতকে আমরা টিকিয়ে রেখেছি। রাঙামাটি জেলার টিম নিয়ে আমরা জাতীয় পর্যয়েও নাটক করেছি বহুবার। ২০১৪ সালের শেষের দিকে আমি বাংলাদেশ বেতার রাঙামাটি আঞ্চলিক কেন্দ্রের নাট্য প্রযোজক হিসেবে যোগদান করি। এ যোগদানের পরে আমি একটি অডিশনের মাধ্যমে উদিয়মান ৮২ জন নাট্য শিল্পীকে অন্তর্ভূক্ত করি। যেখানে আগে বেতারে মাসে, তিনমাসে একটি নাটক বা ‘স্পর্ট’ করতে কষ্ট হয়ে যেতো। সেখানে এখন মাসে ২টি মাসিক নাটক যায় এবং ৪/৫টা ‘স্পর্ট’ যায়। যেখানে এখন অনেক নাট্যশিল্পি কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে আর তাদের দেখে নতুন অনেক তরুণরা নাটকের প্রতি উৎসাহিত হচ্ছে।
প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি এ পর্যন্ত বহু নাটক লিখেছি এবং প্রযোজনা ও নির্দেশনা দিয়েছি। আমি মূলত বাস্তবভিত্তিক নাটক বেশি লিখি। আমি যেখানে যাই না কেনো, শুধু মানুষকে দেখি, তার চরিত্র ও কর্মযজ্ঞকে দেখি। মানুষের মূল জীবন ভিত্তির রূপ তুলে ধরে নাটক লিখতে পছন্দ করি। এ নাটক লিখতে গিয়ে মনে হয়েছে আসলেই একজন নাট্য শিল্পির সে শক্তি রয়েছে, নাটকের সে শক্তি রয়েছে একটি সামাজকে পরিবর্তন করার, সমাজের ভুল চিন্তা চেতনাকে ধ্বংস করার।
প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, আমি আগে দেখতাম যে ২৬ মার্চ কিংবা ১৬ ডিসেম্বরে স্কুলের শিক্ষার্থীদেরকে দিয়ে একটি দেশাত্ববোধক গানের মাধ্যমে ডিসপ্লে করা হতো। আমি চিন্তা করেছি এখানে নাটকীয় কিছু করা যায় কি না। সেই থেকে আমি আমার বিদ্যাপীঠ রাণী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ে ২৬ শে মার্চ এবং ১৬ ডিসেম্বর ডিসপ্লেতে দেশাত্ববোধক গানের সাথে নাটকের একটি অংশ জুরে দিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে প্রতিবছর প্রথম পুরস্কার পেয়ে আসছি,বেশ কবছর ধরে।
আলাপের শেষাংশে সোহেল রানা বলেন, আমি নাটক শিখেছি নেশা হিসেবে, কখনো পেশা হিসেবে নিবো ভাবিনি। আজও নেশা হিসেবে এই নাট্য জগতে রয়ে গেছি। নাটকের শিল্পীদের আগের থেকে অনেক বেশি পেশাদার কাজ করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে বর্তমানে। বর্তমান সরকার সংস্কৃতির প্রতি এতটাই মনোযোগ দিয়েছে যে বিভিন্ন দিবস ও নানান অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নাটক উপস্থাপন করার সুযোগ করে দিচ্ছে। এটি আমাদের জন্য বড় প্রাপ্তি।
সোহেল রানা বলেন, শিল্প চর্চা থাকলে একজন তরুণ কখনো খারাপ পথে যেতে পারে না। ভবিষ্যতে আমরা বিপদগ্রস্ত এক সমাজ আশংখা করছি। বর্তমান সমাজের তরুণদের যে অবস্থা তা থেকে বের করার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে সাহিত্য বা শিল্প চর্চা। কিন্তু তরুণদের মাঝে সাহিত্য চর্চার আগ্রহ কম। মাদক, সন্ত্রাসী, কিশোর গ্যাং সহ নানান অপকর্ম থেকে তরুণদের রক্ষা করতে পারে একমাত্র শিল্প চর্চা। তাই অভিভাবকদের প্রয়োজন সন্তানদের সাহিত্য চর্চার জন্য উৎসাহিত করা এবং এ সাহিত্য চর্চা একজন তরুণকে সমাজের মাঝে পরিচিত করে তুলতে পারে।
গল্পের সময় ফুরিয়ে আসে,নোটবুক গুটিয়ে নিচ্ছি, তরুণ এক নাট্যকারের চোখে তখনো আলোর ঝিলিক, যেনো উজ্বল মায়াবী রোশনাই। নাটকের মাধ্যমেই যেনো পুরো পৃথিবীকে বদলে দেয়ার স্বপ্নে বিভোর এক নাট্যজন ! একজন সোহেল রানা কিংবা এমন অজস্র সোহেল রানারাই নীরবে বদলে দিতে থাকে অসংখ্য অন্ধ জনপদ……সংস্কৃতি আর সচেতনতার আলো ছড়িয়ে….
