সুহৃদ সুপান্থ
মাত্র তিনদিন পরই নির্ধারিত হতে চলেছে রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব। ধারণা করা হচ্ছে,অন্তত দুই দশক পর প্রধান দুই পদেই ভোটেই নির্ধারিত হতে চলেছে নেতৃত্ব। সভাপতি ও সম্পাদক পদে আলোচনায় থাকা চার প্রার্থী এনিয়ে আছেন নিজ নিজ কৌশলী প্রচারনায়। থেমে নেই তাদের ঘোরতর অনুসারিরাও। ইতোমধ্যেই প্রকাশ্য হয়েছেন অনেকেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব দেখা যাচ্ছে অনেককেই। বিশেষত সভাপতি পদে দীপংকর তালুকদার ও নিখিল কুমার চাকমার পক্ষে প্রকাশ্যেই স্ট্যাটাস দিতে দেখা যাচ্ছে। তবে সংখ্যায় দীপংকরের পক্ষেই প্রচারনা বেশি চোখে পড়ছে। বিপরীতে নিখিলের অনুসারিরা কিছুটা কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন। অনেকেই প্রকাশ্যে দীপংকরের জন্য স্ট্যাটাস দিয়ে,ভোট চাইছেন নিখিলের জন্যই।
তবে সবচে বড় সংকট তৈরি হয়েছে কর্মীদের নিয়ে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বুঝতেই পারছেন না,তারা কি করবেন,কার পক্ষে অবস্থান নিবেন কিংবা নেয়া উচিত। নেতাদের উল্টাপাল্টা অবস্থান,কখনো এর পক্ষে স্ট্যাটাস,কখনো ওর পক্ষে স্ট্যাটাস,আবার কখনো স্ট্যাটাস দিয়ে মুছে ফেলা কিংবা স্ট্যাটাসের ঠিক বিপরীত কাজ করা,সব মিলিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছেন কর্মীরা। বিশেষত যেসব কর্মীদের সাথে বড় নেতাদের সরাসরি সাক্ষাত বা যোগাযোগ কম,তারাই পড়েছেন সবচে বিপাকে।
সারাবছর নানা ইস্যুতে প্রকাশ্যেই দীপংকরের বিরোধীতা করেন এমন একাধিক নেতাকে এখন প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে দীপংকরের জন্য ভোট খুঁজতে। আবার সেই নেতারই উগ্র সমর্থক কর্মীদের দেখা যাচ্ছে নিখিলের পক্ষে প্রচারনায়! বিপরীতভাবে অনেককেই দেখা যাচ্ছে দিনে চম্পকনগর ঘুরে এসে দীপংকরের পক্ষে স্ট্যাটাস দিয়ে রাতেই খাদ্যগুদাম কিংবা ভেদভেদী এলাকার বিশেষ ভবনে গোপনে প্রবেশ করতে। সব মিলিয়ে বেশ জমে উঠেছে রাঙামাটির রাজনীতি। নেতাদের উপর আস্থাই হারিয়ে ফেলেছেন কর্মীরা।
তৃণমূলের রাজনৈতিক কর্মীদের মতো বিভক্ত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় সংবাদকর্মীরাও। নিখিল ও দীপংকর ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকরা নিজেদের ব্যক্তিগত সুবিধা,প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি বিবেচনায় অবস্থান নিয়েছেন দুই নেতার পক্ষে ! ফলে এদের অনেকের ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ প্রতিবেদন পড়েও সাধারন রাজনৈতিক কর্মী বা পাঠক, মিলাতেও পারছেন না রাজনীতির জটিল সব সমীকরণ।
রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সম্মেলনের এই জমে উঠাতে সবচে সংকটে দলটির তৃণমূলের কর্মীরাই। তারা ঠিক বুঝতে পারছেন না,কি করবেন ! বেশিরভাগই একে ওকে জিজ্ঞেস করে জানতে চাইছেন হাল হকিকত। কিন্তু নেতারা নিরুত্তর। কোথাও মিলছে না প্রশ্নের জবাব।
সবচে বেশি বিভ্রান্ত জেলার নেতারাই। জেলা শহরের নেতাদের কথায় কিংবা আলোচনায় তৈরি হচ্ছে আরো বেশি ভ্রান্তি। এইসব ভ্রান্তির জবাব দেবারও যেনো কেউ নেই। এসব ভ্রান্তির কারণে নিজ দলের নেতাদেরকেই অন্য দলের এজেন্ট বলতেও ছাড়ছেন না অনেকেই ফেসবুক প্রচারনায়। চলছে সত্য-মিথ্যা-অর্ধসত্যের নানা প্রচার অপপ্রচার।
দ্বিধাগ্রস্ত কর্মীরা সম্মেলন নিয়ে কারো সাথেই কথা বলতে পারছেন না। সম্মেলনও অনেকটাই তাই জৌলুসহীন। মাত্র তিনদিন পর সম্মেলন। অথচ ২০ মে অবধি শহরের কোথাও চোখে পড়েনি সম্মেলনের পোস্টার,ব্যানার কিংবা গেট। প্রচারনায়ও যোজন যোজন পিছিয়ে পুরো সম্মেলনের আয়োজন। এসব নিয়ে কথা বলার মত মুখপাত্রও কেউ নেই। প্রার্থীরা ব্যস্ত যে যার প্রচারনায়।
জেলা যুবলীগের এক নেতা বলছেন-‘ কাকে বিশ্বাস করব বুঝতেছিনা। যে নেতাকে মনে করতাম নিখিলদার ঘনিষ্ঠ,তাকে দেখি দীপংকর দাদার পক্ষে প্রচারনায়। আবার যাকে দেখলাম দীপংকরের জন্য জানপ্রাণ দিয়ে দেয়,সেই দেখি নিখিল’র জন্য স্ট্যাটাস দেয় ! কি আজব রাজনীতি ! কে যে কার পক্ষে কিছুই বুঝতেছিনা।’
আরেক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বলছেন, ‘দীপংকর দাদা ও নিখিল দাদা,দুজনইতো আমাদের নেতা।তারা ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন,ভোট করুক। কাউন্সিলররা যাকে যোগ্য মনে করবেন,তিনিই নির্বাচিত হবেন। কিন্তু প্রকাশ্যে যেসব নোংরামি শুরু হয়েছে,এটা তো আমাদের কারো কাম্য নয়। দুই নেতারই উচিত তাদের কর্মীদের থামানো।’
জেলা আওয়ামীলীগের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলছেন-‘ ভোটের কথা শুনছি কিন্তু আদৌ ভোট হবে কিনা বুঝতেছিনা। শেষ পর্যন্ত ভোট হবে নাকি কেন্দ্র থেকে কমিটি চাপিয়ে দেয়া হবে,সেটি স্পষ্ট নয়। কাউন্সিলর ২৪৬ জন। কিন্তু পুরো সম্মেলন নিয়ে উব্দিগ্ন আমরা পুরো জেলার আওয়ামীলীগ পরিবার। ভোটের পরও এর রেশ থাকবে। কাউন্সিলে যে কি হবে সেটাই বুঝতে পারছিনা।’
পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, জেলা আওয়ামীলীগের অন্তত ৫ জন নেতার সাথে কথা বলেও মুখ খোলানো গেলোনা সম্মেলন ইস্যুতে ! সবাই যেনো মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। কেউ কেউ তো রীতিমত ক্ষমাই চাইলেন ! নেতারাই যেখানে এতটা দ্বিচারিতা আর ভ্রান্তিতে,সেখানে কর্মীদের দ্বিধায় না থেকে,কিইবা করার থাকে !
