নিজস্ব প্রতিবেদক
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, পার্বত্য শহর রাঙামাটিতে জন্মনিবন্ধনের প্রয়োজনীয় ছোট বা বড় যেকোন সংশোধনীর জন্য দিনের পর দিন পৌরসভার দ্বারে দ্বারে কিংবা উপ-পরিচালক,স্থানীয় সরকার বিভাগের কার্যালয়ে ঘুরছেন,কিন্তু মিলছেনা সমাধান ! সামান্য ত্রুটির জন্য সংশোধন করতেই নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণের। এনিয়ে জমেছে ক্ষোভ। বিপাকে পড়েছেন পৌরসভার নির্বাচিত কাউন্সিলররা। এমন অবস্থায় বুধবার এই ইস্যু নিয়ে জরুরী সভায় বসছেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক ও পৌর কাউন্সিলররা।
পৌরসভার দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আগে জন্মনিবন্ধনের যেকোন সংশোধনের কাজটি পৌরসভাতেই হতো। কিন্তু সম্প্রতি নিয়ম পরিবর্তন করে যেকোন সংশোধনীর অনুমোদন দেয়ার ক্ষমতা অর্পন করা হয় জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ পরিচালককে। উপপরিচালক প্রতিটি তথ্যই যাচাইবাচাই করছেন এবং যাচাইয়ের পর অনুমোদন দিচ্ছেন। ফলে পুরো বিষয়টিই পড়ে গেছে দীর্ঘসূত্রিতার যাঁতাকলে। বেড়েছে ভূক্তভোগীদের আহাজারি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অন্তত: এক হাজার আবেদন জমা পড়ে আছে পৌরসভায়,সংশোধনের জন্য। কিন্তু জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের ‘যাচাইবাছাই প্রক্রিয়া’র ‘কঠোরতা’র কারণে পৌরসভা সেইসব আবেদনগুলো আর পাঠাচ্ছে না সংশোধনের জন্য। ফলে থমকে আছে পুরো সংশোধন প্রক্রিয়া। কেউ কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু সংশোধন কোন না কোন কম্পিউটার দোকান থেকে আবেদন করার পর নিজহাতে পৌরসভায় রিসিভ করিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগে জমা দিচ্ছেন,কিন্তু যাচাইবাছাইয়ের কঠোর ও কঠিন বিড়ম্ভনায় সেইসবেরও সমাধান মিলছে না খুব একটা।
পৌরসভার সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ‘স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে এমন সব তথ্যের জন্য ডকুমেন্ট চাওয়া হচ্ছে,যা আমাদের কাছেই নাই। ওনারা যে বালাম খাতা চাইছেন,সেটার অস্তিত্বই নেই। কারণ আমরা ১৬ নাম্বার খাতার পর আর বালাম খাতা ব্যবহার করিনি। ১৬ নম্বরের পর আর কোন বালাম নেই,সব ডিজিটালি হয়েছে। ফলে ওনারা এরপরের বালাম খাতা চাইলে আমরা তা দিব কি করে ! আবার ওনারা হালনাগাদ জন্মনিবন্ধন এর সাথে তথ্য না মিলিয়ে,পুরনো জন্মনিবন্ধনের সাথে তথ্য যাচাই করছেন, তাহলে সমাধান হবে কি করে।’
তবে পৌরসভার দায় দেখছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই। তারা বলছেন-প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট কাজের সাথে যারা ছিলেন তাদের অবহেলা কিংবা দায়িত্বহীনতার কারণেই বেশিরভাগ ভুল হয়েছে। নারীকে পুরুষ,পুরুষকে নারী,চাকমাকে মারমা,মারমাকে ত্রিপুরা করার মতো অজ¯্র ঘটনা ঘটিয়েছেন তারা। কারো নামের সাথে টাইটেলের মিল নেই,কারো নামের বানান ভুল। এমন হরেক সংকটের দায় নিতে হচ্ছে পৌরসভাকে। তবে যারা জন্মনিবন্ধন করিয়েছেন,তাদের নিজেদের দায়িত্বহীনতাকেও দুষছেন পৌরসভার সংশিষ্টরা। দায়িত্বহীন অভিভাবকরা চূড়ান্তকরণের আগে জন্মনিবন্ধন পরীক্ষা যেমন নিজ দায়িত্ব করেননি তেমনি অতি চালাক কিছু অভিভাবক একসময় নিজের ইচ্ছেতেই কমিয়েছেন বা বাড়িয়েছেন সন্তানের বয়স ! ফলে এখন দুর্ভোগ বেড়েছে নিজেদেরই ।
ভুক্তভোগিদের একজন, শাহীন আল মামুন বলছেন-‘জন্মনিবন্ধন একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও জরুরী সেবা। সরকার এখন সব কিছুতেই জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করেছে। পৌরসভার তথ্য সংযোজনকারিরা ভুল করেছে কিংবা আবেদনকারিরাই ভুল করেছে,সেটা সমাধানের সহজ পথতো থাকতে হবে। কিন্তু সংশোধনের ‘অপ্রয়োজনীয় ও বিরক্তিকর’ দীর্ঘ পদ্ধতির কারণে মানুষকে যেভাবে হয়রানি হতে হচ্ছে, এর দায় কে নিবে ?’
রাঙামাটি নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব জিসান বখতেয়ার বলছেন-‘ জন্মনিবন্ধন দেয় পৌরসভা,সংশোধনের দায়িত্বও পৌরসভার থাকা উচিত। জেলা প্রশাসনের উপপরিচালক এর অনুমোদনের কাজটিও পৌরসভার সাথে সমন্বয় করে আরো সহজতর করা উচিত। সংশোধনের জন্য মানুষকে কষ্ট দেয়ার কোন মানে নেই। মানুষ যেনো দ্রুত সেবাটি পায়,সেটা ভাবতে হবে। কারিগরী জটিলতা নিরসন করতে হবে। পৌরসভা এবং স্থানীয় সরকার প্রশাসন, একে অপরের দোষ দিয়ে সমস্যার সুরাহা হবেনা।’
রাঙামাটি পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর কালায়ন চাকমা বলছেন, ‘ মানুষ পৌরসভায় গিয়ে সংশোধনের জন্য জমা দিচ্ছে,কিন্তু সিস্টেমের জটিলতার কারণে সংশোধনীর কেন্দ্রীয় অনুমোদন দিচ্ছেন উপ-পরিচালক,স্থানীয় সরকার’। তিনি আবার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া অনুমোদন করছেন না। ফলে বিপাকে পড়েছি আমরা কাউন্সিলরা। সিস্টেমের জটিলতার কারণে মানুষ আমাদেরকেই দোষী ভাবছেন, অথচ এখানে আমাদের কোন ভূমিকাই নেই।’
পৌরসভার সাত নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর জামাল উদ্দিন বলছেন-‘ জন্মনিবন্ধন করতে ব্যাপক জটিলতা হচ্ছে। সাধারন মানুষ ব্যাপক কষ্ট পাচ্ছেন। সন্তানদের স্কুল কলেজে ভর্তি করাতে জটিলতা পোহাচ্ছেন। মানুষ আমাদের ভুল বুঝছেন। আমরা কি করব বুঝতে পারছিনা।’
একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, জন্ম নিবন্ধন নিয়ে জটিলতা নিরসনে বুধবার জেলা প্রশাসক পৌরসভার কাউন্সিলর ও দায়িত্বশীলদের সাথে একটি জরুরী সভা আহ্বান করেছেন। সকালে ওই সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেই সভায় পৌর কাউন্সিলরদের কাছ থেকে বিস্তারিত জানবেন জেলা প্রশাসক। সভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের দায়িত্বে থাকা উপপরিচালকও অংশ নিবেন,থাকবেন পৌরসভার সকল কাউন্সিলরা। কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ায় সভায় উপস্থিত থাকতে পারবেন না পৌরমেয়র।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কাউন্সিলর বলছেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে খাগড়াছড়ি ও বাঘাইছড়ি পৌরসভায় কথা বলেছি, সেখানে এমন সমস্যা বা বিড়ম্ভনা হচ্ছেনা। তাহলে রাঙামাটিতেই কেনো এসব হচ্ছে। যদি বুধবারের এই বৈঠকেও সমস্যার সুরাহা না হয় তবে রাঙামাটিবাসির কপালে আরো দুর্ভোগ আছে,অথচ জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমাদের কিছুই করার নেই।’ ‘জন্মনিবন্ধন প্রদানকারি কর্তৃপক্ষ যেহেতু পৌরসভা,সংশোধনের দায়িত্বও পৌরসভার হাতেই থাকা উচিত’ বলে মন্তব্য করছেন এই জনপ্রতিনিধি।
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। আমি সবার সাথে আলোচনা করে সমাধান করার চেষ্টা করছি। আশা করছি সমস্যার সমাধান হবে অচিরেই।’
তবে জেলা প্রশাসন ও পৌর কাউন্সিলরদের আজকের সভার খবর জেনে আশান্বিত পৌরবাসি তাকিয়ে আছেন এই সভার দিকে। তারা আশা করছেন, সব জটিলতার অবসান ঘটিয়ে সুরাহা মিলবে সংকটের,কমবে ভোগান্তি মানুষের।
