সৈকত বাবু
৩৩ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণার ৩ বছর পর ১৭৩ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়েছে রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের। দীর্ঘ সময় পর গঠিত এই কমিটিতে ঠাঁই পেয়েছেন প্রবাসী, অছাত্র ও বিবাহিতরা। এ নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে নেতাকর্মীদের মাঝে। তারা পুরো বিষয়টির জন্য সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের বিরোধকেই দায়ী করছেন। তবে এই কমিটি নিয়ে আন্দোলনে-সংগ্রামে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে বিএনপি।
তৃণমূলের ছাত্রদল নেতারা বলছেন, কমিটিতে স্থান পাওয়া অধিকাংশ নেতার ছাত্রত্ব নেই। আবার কেউ চাকরি করছেন, অনেকে আছেন বিবাহিত। এতো দেরিতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন নিয়ে সংগঠনের অভ্যন্তরে সমালোচনার ঝড় বইছে। এমন কমিটি ঘোষণায় নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব অনেকটাই প্রকাশ্যে চলে আসছে। নিজেদের অনুসারীদের কমিটিতে স্থান দিতে এমন কা- করেছেন শীর্র্ষ দুই নেতা।
প্রস্তাবিত ১৬১, ঘোষণা ১৭৩
রাঙামাটি জেলা কমিটি গঠন করার লক্ষে ১৬১ সদস্যের তালিকা করে কেন্দ্রে পাঠায় জেলার পাঁচ নেতা। সভাপতি ফারুক আহমেদ সাব্বির, সহ-সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক মো. আলী আকবর সুমন, যুগ্ম সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম রনি, সাংগঠনিক সম্পাদক বেলাল হোসেন সাকু দফায় দফায় বৈঠক করে এ তালিকা তৈরি করে কেন্দ্রে পাঠান। চলতি বছরের জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে এ প্রস্তাবিত কমিটি পাঠান। তবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হলো ১৭৩ জনের। ১৬১ জনের তালিকা কেন্দ্রে পাঠানোর পর সেটি কি করে ১৭৩ জন হলো এ প্রসঙ্গে জানা গেছে, রাঙামাটির স্থানীয় নেতারা কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে সরাসরি বা ফোনে তদবির করেছে নিজেদের অনুসারীদের কমিটিতে রাখতে। এ কারণেই জেলা থেকে ১৬১ সদস্যের তালিকা পাঠানো হলেও সেখানে আরও ১২ জন বেড়ে ১৭৩ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্র।
এক তৃতীয়াংশ অছাত্র
ঘোষিত ১৭৩ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ প্রথম সারির ৫৮ জনই নিয়মিত ছাত্র নয়। পুরো কমিটিতে নিয়মিত ছাত্র আছে মাত্র ৪৯ জন! নিয়মিত ছাত্ররাই এই সংগঠনে সংখ্যালঘু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিবাহিতদের ভারে ন্যুজ ছাত্রদল
অনেক সদস্য আছে যারা জেলা কমিটিতে থাকলেও মূলত পরিবার-পরিজন নিয়ে পার করছেন ব্যস্ত সময়। পুরো কমিটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কমিটিতে প্রায় ৩৪ জন সদস্য আছে বিবাহিত। এতে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করে বিবাহিতদের কমিটি বলেও অবহিত করছে কেউ কেউ।
সেক্রেটারির স্বজনপ্রীতি
জেলা ছাত্রদলের কমিটিতে রয়েছে সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর সুমনের ছোট দুইভাই ও গৃহিনী বড় বোন। অভিযোগ রয়েছে, তারা যেমন ছাত্র নয় তেমনই ছাত্রদলের সঙ্গেও যুক্ত না। শুধু নেতার ভাইবোন পরিচয়ে কমিটিতে স্থান পেয়েছেন।
জেলায় থাকেন না নেতারা
রাঙামাটি জেলায় অবস্থান করে না করেও জেলা কমিটিতে স্থান পেয়েছে তাদের সংখ্যাও কম নয়। এমনকি কেউ কেউ আছে ঈদের সময় শুধু রাঙামাটি আসেন তাদেরও রাখা হয়েছে জেলে কমিটিতে; তেমন সংখ্যাও প্রায় ডজনখানেক। বিদেশে বসবাস করে এমন কাউকেও রাখা হয়েছে কমিটিতে। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পরিচয়ের কারণে এরা কমিটিতে স্থান পেয়েছে বলে মন্তব্য করেন অনেকের।
মামলার আসামিরা কমিটি
নানা ধরনের মামলার আসামি হবার পরও স্থান পেয়েছে দলের কমিটিতে। অবশ্য দলের নেতারা মনে করেন, সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে অনেকের বিরুদ্ধে এসব মামলা হয়েছে। অন্যদিকে অভিযোগ পর্নোগ্রাফি মামলার অভিযুক্তকেও রাখা হয়েছে কমিটিতে।
ছাত্রদল না করেও কমিটিতে স্থান
কখনও ছাত্রদল করেনি, মিছিল মিটিং-মিছিল পরের কথা এমনকি কখনও পার্টি অফিসের দিকেও ফিরে তাকায়নি এমন একাধিকজন আছে কমিটিতে। এমন একাধিক সদস্য আছে যারা কখনই ছাত্রদল করতো না।
কি বলছেন শীর্ষ দুই নেতা
এসব প্রসঙ্গে জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর সুমন বলেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকে জুলুম নির্যাতন সহ্য করে রাজনীতি করতে হচ্ছে। তাই হয়তো কিছুটা ভুলত্রুটি থাকতে পারে। তবে কমিটিতে পরীক্ষিতদেরকেই জায়গা দেয়া হয়েছে। স্বজনপ্রীতির বিষয়ে জানতে চাইলে সুমন বলেন, আমার বোন এর আগেও ছাত্রদলের নগর কমিটিতে সম্পাদকম-লীর সদস্য ছিলেন। আমার দুইভাইও পড়ালেখা করে। তাই তাদের কমিটিতে রাখা হয়েছে।
এদিকে জেলা ছাত্রদল সভাপতি ফারুক আহমেদ সাব্বির বলেন, করোনাকালীন সময়ে দীর্ঘদিন সবকিছু বন্ধ ছিল, তাছাড়া বিভিন্ন লড়াই সংগ্রাম, আন্দোালন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করার কারণে পূর্ণাঙ্গ কমিটি হতে কিছুটা সময় সময় লেগেছে- তবে সেটি খুব বেশি সময় নয়। আমাদের আগের কমিটিও নয় বছর ছিল। অল্পকিছু সংখ্যক অল্পশিক্ষিত ও বিবাহিতদের কমিটিতে স্থান দেয়া হয়েছে- মূলত তাদের অবদানকে মূল্যায়ন করার জন্যই কমিটিতে রাখা হয়েছে। আমাদের মতো বুর্জোয়া দলে এমনটা একটু হতেই পারে। তবে কমিটি নিয়ে সন্তুষ্টির কথা জানান সাব্বির।
আহ্বায়ক কমিটির ইঙ্গিত বিএনপির
রাঙামাটি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দীপন তালুকদার দীপু বলেন, জেলা ছাত্রদল সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের মধ্যকার বিরোধ থাকলে পারে- তবে সেটি উল্লেখযোগ্য নয়। হয়ত যখন কমিটি প্রস্তাবনা করা হয়েছিল তখন তারা বিবাহিত ছিলো। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কমিটি হতে দেরি হওয়ায় অনেকেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। শিগগিরই ছাত্রদের নিয়েই ছাত্রদলের কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। পাশাপাশি বর্তমান জেলা কমিটির ওপর আস্থা রেখে আন্দোলন আরও বেগবান করবেন বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
জেলা বিএনপির সভাপতি হাজী শাহ আলম বলেন, করোনার কারণে দেরি হলেও কমিটি ঘোষণা করায় ধন্যবাদ জানাচ্ছি। যেহেতু দেরিতে পূর্ণাঙ্গ হয়েছে তাই হয়তো অনেক বিবাহিতরা যুক্ত হয়েছে। ছাত্রদল সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরোধকে প্রতিযোগিতার বিরোধ আখ্যা দিয়ে শাহ আলম বলেন, এতে দলের ওপর তেমন কোন প্রভাব পড়বে না। অল্প সময়ের মধ্যে আশা করি নতুন আহবায়ক কমিটি ঘোষণা হতে পারে।
