নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়েই রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে রাঙামাটি বিএনপি পৌর,উপজেলা সম্মেলন। ইতোমধ্যেই বাঘাইছড়ির উপজেলা ও পৌরশাখা,বিলাইছড়ি উপজেলা,রাঙামাটি পৌর ও সদর থানা বিএনপি’র সম্মেলন শেষ হয়েছে। কেন্দ্রীয় নির্দেশে প্রায় ৫ থেকে ৭ বছর পর উপজেলা কমিটির সম্মেলনগুলো অনুষ্ঠিত হলেও খুব একটা পরিবর্তন আসছেনা নতুন কমিটিগুলোতে। মূলত: কেন্দ্রীয় নির্দেশনা মেনে নিয়মরক্ষার সম্মেলনই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এনিয়ে হতাশা,ক্ষোভ যেমন দানা বাঁধছে দলটিতে,তেমনি নতুন নেতৃত্ব না আসায় বাড়ছে সংকটও।
বেশ কিছুদিন ধরেই রাঙামাটি বিএনপি দুটি পৃথক ধারায় রাজনীতি করে আসছে। হাজী শাহ আলমের নেতৃত্বাধীন জেলা বিএনপির রাজনীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে তৃতীয় সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম ভূট্টোর নেতৃত্বে আরেকটি অংশ পৃথকভাবে পালন করে আসছে দলীয় কর্মসূচী। এনিয়ে আছে ব্যাপক ভিন্নমতও। আবার মূল জেলা বিএনপির দৃশ্যত ঐক্যবদ্ধ মনে হলেও সেখানেও বেশ কিছু নেতা গোপনে ভূট্টোদের সাথে আঁতাত রক্ষা করে চলেছেন বলেও অভিযোগ আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো,জেলা বিএনপির ঐক্যবদ্ধ রাজনীতির বিপরীতে ভূট্টোরা বেশ কিছুটা হলেও কোনঠাসা। জেলা সম্মেলনের আগে উপজেলা সম্মেলন শুরু হতেই আরো চাপে পড়ে যায় এই অংশটি। কিন্তু তাদের অনুসারিরা উপজেলা সম্মেলনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে কাউখালি উপজেলা,কাপ্তাই উপজেলা এবং সদর উপজেলা সম্মেলনের বিরুদ্ধে আদালতে যায়। ফলও পায় কিছুটা। ইতোমধ্যেই স্থগিত হয়ে গেছে কাউখালি উপজেলা সম্মেলন। কাপ্তাই উপজেলা সম্মেলন কাপ্তাইয়ে না হয়ে,জেলা বিএনপির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কমিটি গঠন নিয়েও আছে ভিন্নমত ও বিরোধীতা। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও সাবেক সভাপতি দিলদার ও তার অনুসারিরা এই সম্মেলন মানতে নারাজ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে এই বিষয়ে কঠোর সমালোচনাও করেছেন তিনি। তবে পুরো বিষয়টি সম্পর্কে খুব বেশি স্পষ্ট ধারণা মিলছেনা নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলেও।
জেলা কমিটির বিরোধীতারিদের প্রধান নেতা সাবেক পৌর মেয়র সাইফুল ইসলাম ভূট্টো দাবি করছেন, বর্তমান জেলা ও উপজেলা কমিটিগুলো বহাল রেখে সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সম্মেলন করা সম্ভব নয়। কারণ বর্তমান কমিটিগুলোর ২০ শতাংশ আওয়ামীলীগে গেছে,২০ ভাগ মারা গেছে বা রাজনীতি ছেড়েছে,বাকীদের বেশিরভাগই নিষ্ক্রিয়। ফলে আহ্বায়ক কমিটি করে নতুন কাউন্সিলর তালিকার ভিত্তিতেই সম্মেলন হলেই সঠিক ও যোগ্য নেতৃত্ব্ আসবে।’ নিজেদের দাবি দাওয়া ইতোমধ্যেই কেন্দ্রে জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। ভূট্টো জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় বিএনপির সহধর্মবিষক সম্পাদক অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান, শ্রমিকদলের জেলা সভাপতি মমতাজ মিয়া,জেলা বিএনপির সহসভাপতি রফিকউদ্দিন আহমেদ,জিয়া পরিষদের মানস মুকুর চাকমা,মাঈনউদ্দিন,কাপ্তাই উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন,ভাইস চেয়ারম্যান নুরুন নাহার,বাঘাইছড়ির সাবেক পৌর মেয়র আলমগীর কবিরসহ বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী আছে তাদের সাথে ।
রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি হাজী মোঃ শাহ আলম জানিয়েছেন, ,ব্যাপক পরিবর্তন না হলেও কিছু পরিবর্তন হচ্ছে । কারণ দলের দু:সময়ের নিবেদিনপ্রাণ নেতারাই নেতৃত্বে আসছে। গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কমিটি হচ্ছে।’ বিরোধীদের অপপ্রপচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা কি চাইতেছে সেটা তো আমরা জানিনা। কারণ তারা আমাদের কিছু বলেনি। কেন্দ্রকে কিছু বলেছে কিনা তাও জানিনা। কারণ কেন্দ্রও আমাদের এই বিষয়ে কিছু বলেনি। বরং কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুসারেই আমরা সম্মেলন শুরু করেছি। আগামী ১৯ মার্চের মধ্যে জেলার আওতাধীন সব উপজেলা ও পৌর কমিটির সম্মেলন শেষ হচ্ছে এবং এরপর এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে কেন্দ্রের নির্দেশনাতেই আমরা জেলা সম্মেলন করতে চাচ্ছি। এখন কেন্দ্র যেভাবে বলবে আমরা সেভাবেই এগোতে চাই।’ হাজী শাহ আলম আরো বলেছেন, জেলা বিএনপি,যুবদল,ছাত্রদল,স্বেচ্ছাসেবকদল,জাসাসসহ বিএনপি’র নেতৃত্বে সকল অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠন অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় সবচে বেশি ঐক্যবদ্ধ আছে।
এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম জানিয়েছেন, আমরা সম্মেলন করতে বলেছি,জেলা কমিটি সুন্দরভাবেই সম্মেলন করছে বলে জেনেছি। এখন কারো যদি কোন ভিন্নমত বা বিরোধীতা থাকে,তারা সেটা জেলা কমিটিকে জানাবে এবং স্থানীয়ভাবেই সমাধান করতে হবে। তারা যদি সেটা না পারে তখন আমরা বিষয়গুলো দেখব।’
জানা গেছে,পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে বিএনপির ১২ টি উপজেলা ও পৌর ইউনিটের সম্মেলনের কাজ চলছে। এর মধ্যে ৭ মার্চ পর্যন্ত ৪ টি সম্মেলন শেষ হয়েছে। বাকি ইউনিটগুলোর সম্মেলন ১৯ মার্চের মধ্যেই শেষ হবে।
প্রসঙ্গত,নানা কারণেই এবারের বিএনপির উপজেলা ও জেলা সম্মেলনকে বেশ গুরুত্ব সহকারেই দেখছে দুটি পক্ষই। সম্মেলন বর্তমানে চলমান চেনা ছন্দে শেষাবধি শেষ হলে বেশ বেকায়দায় পড়ে যেতে হবে দীপেন-ভূট্টোর নেতৃত্বাধীন অংশটিকে। তাই মরণপন চেষ্টায় নিজেদের সমর্থকদের দিয়ে নানাভাবে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে তারা নিজেদের পুনর্জাগরনের এবং নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে। অন্যদিকে শাহআলম-দীপু-পনিরের নেতৃত্বাধীন জেলা কমিটিও বেশ শক্তহাতেই নিজেদের নিয়ন্ত্রন অব্যাহত রাখতে চাইছে নিজেদের অনুসারিদের দায়িত্বে পুনরায় এনে। আপাতত এখন পর্যন্ত তারা সফলও। কিন্তু ইতোমধ্যেই তিনটি উপজেলার কমিটি নিয়ে মামলা ও বিরোধীদের নানা তৎপরতায় তারাও যে বেশ স্বস্তিতে আছে এটা বলা যাবে না। ফলে উভয়পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যেই স্বস্তি আর অস্বস্তি দুই’ই আছে,যার প্রভাব পড়ছে সম্মেলনগুলোতেও। সম্মেলন হচ্ছে সর্বত্র, নেতাকর্মীদের উপস্থিতিও আছে, কিন্তু কোথায় যেনো ছন্দ নেই,কেটে আছে সুর আর তাল। তবুও আশাবাদী দুপক্ষই শেষাবধি নিজেদের নিয়ন্ত্রন নিজেদের হাতেই রাখতে। কোন পক্ষ হাসতে শেষ হাসি,সেটা দেখার জন্য আপাতত অপেক্ষা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
