মিশু মল্লিক ॥
গত ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৯ নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচে যে আনাই মগিনির পায়ের নৈপুণ্যে ভারতের জালে বল জড়িয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল, সে আনাইয়ের ফুটবলার হয়ে উঠার শুরুটা রাঙামাটি পার্বত্য জেলার কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে। শুধু আনাই মগিনিই নয়, তাঁর দলের আরো চারজন খেলোয়াড়ই এসেছেন এই একই স্কুল থেকে। যাদের এখন পুরো দেশ চেনে, আনুচিং মগিনি, মনিকা চাকামা, ঋতুপর্ণা চাকমা ও রুপনা চাকমা নামে।
যে মেয়েগুলো সারাদেশের সাথে পাহাড়ের মানুষদেরও আনন্দের জোয়ারে ভাসিয়েছে তাদের উঠে আসার পেছনে যে মানুষটি নিরলস শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন তার নাম শান্তিমনি চাকমা ও মঘাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একসময়কার প্রধান শিক্ষক বীরসেন চাকমা। তাঁরা পাহাড়ের দুর্গম প্রত্যন্ত গ্রামগুলো থেকে মেয়েদের নিয়ে এসে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মনিকাদের মত খেলোয়াড় তৈরিতে অবদান রেখে চলেছেন।
ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে গেলে দেখা মিলবে, যে মাঠে প্রশিক্ষণ নিয়ে আজ দেশসেরা হয়েছেন পাঁচজন খেলোয়াড় সেই মাঠেই ঘাম ঝড়াচ্ছেন মনিকাদের উত্তরসূরিরা। তাদের চোখেমুখেও হাতছানি দিচ্ছে আকাশছোয়ার স্বপ্ন। পূর্বসূরীদের দেখানো পথেই হেঁটে যেতে চান অনেক নতুন খেলোয়াড়ই। কারো কারো কন্ঠে ছিল মনিকাদের ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ও।
ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, আনাই মগিনি, মনিকা চাকমা ও আনুচিং মগিনিদের ফুটবলের শুরুটা ২০১১ সালে বঙ্গমাতা গোল্ডকাপের মধ্য দিয়ে। এরপর ২০১২ সালে তাঁরা চলে আসেন ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের নারী ফুটবল দলের যাত্রাটাও শুরু হয় তাদের হাত ধরেই। তখনকার জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে এই খেলোয়াড়দের থাকার জন্য আলাদা ঘর নির্মাণ করে দেন এবং খাওয়া দাওয়াসহ যাবতীয় ক্রীড়া সরঞ্জাম ক্রয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তাঁদের অনুশীলন করানোর ভার ন্যাস্ত হয় শান্তি মনি চাকমার উপর। এরপর পড়ালেখার পাশাপাশি চলতে থাকে অনুশীলন। জাতীয় দলের এই পাঁচ নারী খেলোয়াড়ের মধ্যে মনিকা চাকমা, আনুচিং মগিনি ও আনাই মগিনি ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। অন্য দুজনের মধ্যে গোলরক্ষক রুপনা চাকমা ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়ছেন এবং ঋতুপর্ণা চাকমা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে বিকেএসপিতে চলে গিয়েছিলেন।
এই নারী ফুটবলারদের আদি নিবাস সম্পর্কে জানতে গিয়ে জানা যায়, আনাই মগিনি ও আনুচিং মগিনির জন্ম খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার সাত ভাই নামক গ্রামে। মনিকা চাকমার বাড়ি খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি গ্রামে। ঋতুপর্ণা চাকমার বাড়ি রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের মঘাছড়ি গ্রামে আর রুপনা চাকমার আদি নিবাস রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের ভুঁইয়োছড়ি গ্রামে।
যার হাত ধরে এই পাঁচজনের ফুটবলার হয়ে উঠার গল্পটার শুরু সেই শান্তিমনি চাকমা বলেন, গুরুকে স্বার্থক করে তুলেন তাঁর শিষ্যরাই। সেই হিসেবে নিজেকে একজন স্বার্থক প্রশিক্ষক মনে হচ্ছে আমার। যারা আজ দেশের জন্য সুনাম অর্জন করে এনেছেন তাঁরা ভবিষ্যতে আরো সুনাম বয়ে আনবে এমনটাই আশা করি আমি।
ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চন্দ্রা দেওয়ান বলেন, শুধু আমরা কিংবা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী নয় আপামর ঘাগড়া এলাকার জনসাধারণ আজ খুবই আনন্দিত এবং গর্বিত কারণ আমাদের স্কুলের এই মাঠ থেকেই তারা তৈরি হয়েছে এবং সুনাম বয়ে এনেছে। এই স্কুলে তাদের মত আরো অনেক খেলোয়াড় আছে যারা এখন নিয়মিত অনুশীলন করছে। ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত আমরা অনুশীলন করাচ্ছি। তিনি আরো বলেন, আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা যদি সরকারি বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাই, তাহলে দেশ ও জাতির জন্য আরো ভালো কিছু করতে পাররো বলে আমাদের বিশ^াস।
মাঠে অনুশীলনরত দৃষ্টি চাকমা বললেন, খেলা দেখে আমাদের খুব ভালো লেগেছে। আনাই, ঋতু, রুপনা আপুদের মতো আমরাও ভালো প্লেয়ার হতে চাই।
স্থানীয় ব্যাক্তিদের কন্ঠেও ছিল এদের জন্য শুভকামনার বারতা। স্থানীয় বাসিন্দা জোসেফ চাকমা বলেন, ভারতের মত শক্তিশালী একটি দলকে হারিয়ে আমাদের মেয়েরা যে শিরোপা নিয়ে আসলো, সেটা আমাদের দেশের ও গ্রামের গর্ব। আমাদের মেয়েরা আরো চেষ্টা করবে ভালো কিছু করার। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ওরা ওদের মত উঠে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন অনেকেই।
শান্তি মনি চাকমার সাথে যে মানুষটি এদের পথচলার শুরু দিকের সারথী ছিলেন, যার চেষ্টার ফল আজকের এই পাঁচ খেলোয়াড় সেই বীরসেন চাকমা বর্তমানে বগাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হলে আনন্দের স্বরে তিনি বলেন, মেয়েদের অর্জনে আমি গর্বিত। আমার এখনো মনে আছে, আমি যখন খাগড়াছড়ি থেকে আনাই ও আনুচিংকে নিয়ে আসি তাদের সঙ্গে তাদের বাবা-মাকেও আনতে হয়েছিল, কারণ তাঁরা তাদের বাবা-মাকে ছাড়া থাকবে না। এদের পাশাপাশি আরো চারজন মেয়ে ছিল যারা ভালো খেলত, কিন্তু তারা তাদের পরিবারকে ছাড়া থাকতে না পারার কারণে বাড়িতে ফেরত চলে যায়।
তিনি আরো বলেন, পার্বত্য এই জনপদের আনাচে কানাচে অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় আছে। যারা সুযোগের অভাবে পিছিয়ে আছে। একটু সহযোগিতা আর সঠিক প্রশিক্ষণ পেলে আরো অনেক আনাই, আনুচিং, ঋতুপর্ণা, রুপনা এখানে থেকেই বেরিয়ে আসবে বলে আমি মনে করি।
