পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি-সম্প্রীতি ও উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এই বাহিনীর চৌকষ-মেধাবী আর দুরদৃষ্টিসম্পন্ন অফিসারদেরই সরকার এখানে পাঠান এবং তাঁরাও নিষ্টা ও আন্তরিকতার সাথেই স্ব স্ব দায়িত্ব পালন করেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ নিয়মের বেড়াজালে নিজেকে আবদ্ধ রেখেই কাজ করেন। কিন্তু কিছু কিছু সেনা অফিসার পাহাড়কে আর পাহাড়ের মানুষের প্রতি এতটাই মমত্ববোধ আর ভালবাসায় নিজেকে নিবেদিত করেন, তাঁরা সেনাবাহিনীর কঠোর নিয়মের মধ্যে থেকেও নিজের মেধায় সৃজনশীল কিছু কাজ করেন। আর তাঁদের কর্মদক্ষতা ও আন্তরিকতার জন্য তাঁরা যুগ যুগ ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের মনের মনিকোঠায় ভালবাসার স্থান করে নেন। এমনই একজন উদার দৃষ্টিভঙ্গি আর সৃজনশীল সেনা অফিসার রাঙামাটি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ গোলাম ফারুক। ৩০৫ পদাতিক ব্রিগেডের দায়িত্ব নেয়ার আগেও তিনবার রাঙামাটিতে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। কিন্তু রিজিয়ন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই তাঁর অধিনস্থ জোনসমূহের দেখভাল করার পাশাপাশি রাঙামাটির সবচেয়ে আলোচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লেকার্স পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্বও তাঁর উপর বর্তায়। গতানুগতিক চিন্তা-চেতনার বাইরে এসে তিনি স্বপ্ন দেখতে থাকেন এই প্রতিষ্ঠানকে আরো সমৃদ্ধ করার। আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ও সুবিধা সম্বলিত অবকাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়নে জোর দিতে থাকেন। যখনই সমস্যা তখনই সমাধান করার চেষ্টা করেন। রিজিয়ন কমান্ডারের মত গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে এবং সার্বক্ষনিক রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মত কঠিন কাজে নিয়োজিত থেকেও তাঁর মননশীল চিন্তা ছিল লেকার্সকে ঘিরেই। আর তাইতো চাকুরির মাত্র দেড় বছরের সময়ে তিনি পরিবর্তন এনেছেন শিক্ষায় আর দৃশ্যমান পরিবর্ধন করেছেন অবকাঠামোগত উন্নয়নে।
তাঁর হাত ধরেই প্রতিষ্ঠানের নতুন একাডেমিক ভবন ও সায়েন্স ল্যাবরেটরী ভবন নির্মানের কার্যক্রম শুরু হয়। এছাড়াও ফুটওভার ব্রীজ নির্মানের কার্যক্রমেরও উদ্বোধন করা হয়। প্রতিষ্ঠানের অডিটোরিয়াম ভবনের সংস্কার, শিক্ষক মিলনায়তন-অফিসকক্ষ সংস্কার ও আধুনিকায়ন এবং প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরী সংস্কার করা হয়।
এসব করেই ক্ষান্ত থাকেননি তিনি। যখনই সমস্যা তখনই তার সমাধানের তড়িৎ ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। গত বছর ভয়াবহ পাহাড়ধস রাঙামাটিবাসীকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল। সেই ধসের ধ্বাক্কা আবারো আঘাত হানতে পারে যেকোনো সময়-এমন আশংকা থেকেই যায়। আর তাইতো লেকার্সকে ভুমিধ্বসের মত ভয়াবহ ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতেও উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন আগেবাগেই। প্রতিষ্ঠান প্রধান অধ্যক্ষ এম এ মতিনের চাকুরির মেয়াদ শেষ হলে সাড়স্বরে তাঁর বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন এবং নতুন অধ্যক্ষ নিয়োগ প্রদান করেন। এছাড়াও প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক শুন্য পদে দ্রুত দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষে লিখার জন্য হোয়াইট বোর্ড স্থাপনের কাজও করেন। প্রতিষ্ঠান পরিচালনা নীতিমালা তাঁর হাত ধরেই হয়েছে।
সনাতনী পদ্ধতির পরিবতর্তে প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল পদ্ধতির নানান বিষয় সংযোজন করেন তিনি। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি জমা দেয়ার জন্য মোবাইল ব্যাংকিং চালু, অনলাইনের মাধ্যমে ফলাফল তৈরি, একাদশ শ্রেণির জন্য সাউন্ড সিস্টেম ক্রয় এবং ডিজিটাল এটেনডেন্স সিস্টেম চালু করেন। প্রথমবারের মত প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানমেলারও আয়োজন করা হয়েছিল তাঁর সময়ে। এছাড়াও উন্নত বিশে^র দেশ সমূহের মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খেলার সরঞ্জামেরও উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্লে থেকে কেজি শ্রেণির জন্য খেলনা ক্রয় করেন। যাতে খেলতে খেলতে শিখতে পারে শিক্ষার্থীরা।
আধুনিক শিক্ষা বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে তাঁর উদ্যোগ ছিল ব্যতিক্রম ও সময়োপযোগী। এজন্য প্রশংসিত হয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকসহ সর্বমহলে। শিক্ষক-কর্মচারিদের জন্যও তাঁর গৃহিত উদ্যোগ ছিল ব্যতিক্রম ও প্রশংসার দাবিদার। শিক্ষকদের ইউনিফর্ম প্রদান, টিচিং কোয়ালিটি ডেভেলপমেন্টের লক্ষ্যে বিআইএসসি হতে বিষয়ভিত্তিক মাধ্যমে প্রশিক্ষনের আয়োজন, সৃজনশীল পদ্ধতিতে সুষ্ঠুভাবে পাঠদানের লক্ষ্যে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ ও দুইজন শিক্ষককে স্কাউট লিডার এডভান্ডসড কোর্সে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন তিনি। শিক্ষক-কর্মচারিদের কর্ম দক্ষতা ও আন্তরিকতা বাড়াতে এবং তাদের উৎসাহিত করতে মাসিক ভিত্তিক শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচন ও পুরস্কার প্রদান এবং শিক্ষক-কর্মচারিদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপহার সামগ্রি প্রদানের রীতি চালু করেন। এতে করে শিক্ষক-কর্মচারিদের মধ্যে কর্মস্পৃহা বেড়েছে বহুগুন। আর শিক্ষক-কর্মচারিদের কাজকর্ম মনিটরিং এবং প্রতিষ্ঠানের কাজ সহজীকরণ করার জন্য প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সামগ্রিক কর্মকান্ড দেখাশুনার জন্য কো-অর্ডিনেটর নিয়োগ ছিল তাঁর সুদুরপ্রসারি চিন্তা-ভাবনার ফসল। এসব উদ্যোগের ফলে প্রতিষ্ঠানের কর্মকান্ডের গতি আরো বেড়ে যায় এবং স্বচ্ছতাও নিশ্চিত হয়। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার খোঁজ-খবর অভিভাবকদের জানাতে নিয়মিত ছিল অভিভাবক সমাবেশের আয়োজন।
অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারিদের গ্র্যাচুয়েটি প্রদানের উদ্যোগ ছিল তাঁর মানবতার অনন্য উদাহরণ এবং স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা মেজর জেনারেল নজমুল স্মৃতিবৃত্তি চালুকরণ ছিল তাঁর কৃতজ্ঞতাবোধ ও উদারতার অনন্য দৃষ্টান্ত।
ব্যতিক্রমী ও কল্যানমুলক এসব কাজ করতে গিয়ে সরকারি ও বার্ষিক নিয়মিত প্রোগ্রামেও এতটুকু ছিড় ধরেনি। আর তাইতো বছর জুড়েই নিয়মিত প্রোগ্রামের আয়োজনও ছিল প্রতিষ্ঠানে। আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস উদযাপনের পাশাপাশি জাতীয় শিশু দিবস, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান, কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা, বার্ষিক বনভোজন ও ক্রীড়া অনুষ্ঠান এবং একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নবীন বরণ অনুষ্ঠান। এছাড়াও সরকারে সাফল্য নিয়ে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান আয়োজনও ছিল এই প্রতিষ্ঠানে। উন্নয়নশীল দেশ হতে স্বল্পোন্নত দেশে পদার্পন উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালীর আয়োজনও করা হয়। একই সাথে মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লক্ষ শহীদের স্বরণে সারাদেশের মত এই প্রতিষ্ঠানেও জাতীয় বৃক্ষরোপন কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। আমাদের গৌরব ও অহংকারের অপর নাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত করতে মুক্তিযুদ্ধের সূর্যসন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় প্রথমবারের মত।
শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে তাঁর চিন্তা ছিল সময়োপযোগী। বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠোন্নয়নে বিশেষ ক্লাস ও বিশেষ পরীক্ষা নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
এছাড়াও শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশেও নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি। তদ্মধ্যে আন্তঃ ক্যান্টনমেন্ট স্কুল ক্রিকেট ও ফুটবল এবং আন্তঃ ক্যান্টনমেন্ট স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ, বিসিবি কর্তৃক পরিচালিত স্কুল ইয়াং ক্রিকেটে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা, রেড ক্রিসেন্ট কর্তৃক পরিচালিত ছাত্র-ছাত্রীদের ফাস্ট এইড প্রশিক্ষন, রাঙামাটি সিএমএইচ-এর ডেন্টাল সাইন কর্র্তৃক ছাত্র-ছাত্রীদের দাঁতের যতœ সম্পর্কে সচেতনতামূলক প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করেন তিনি।
লেকার্স প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পার হয়ে গেলেও রজত জয়ন্তী কিংবা পূনর্মিলনী করার উদ্যোগ গ্রহণ করেননি কেউই। আর এই নিয়ে নবীন-প্রবীন শিক্ষার্থীদের মাঝেও ছিল এক ধরনের আকাংখা। তাদের সেই আকুতিও যেনো আঁচ করতে পেরেছিলেন চৌকষ এই কমান্ডার। আর তাইতো বছরের শুরুতেই ঘটা করে সাড়ম্বরে আয়োজন করে রজত জয়ন্তী ও প্রথম পূনর্মিলনীর। গতানুগতিক আয়োজন নয়, সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী বর্ণাঢ্য সেই আয়োজনে আরো একবার নতুন করে নবীন-প্রবীনের মিলনমেলায় প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে প্রতিষ্ঠানে। স্কুল ম্যাগাজিন প্রকাশের উদ্যোগও গ্রহণ করেন তিনি।
রাঙামাটিতে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল অনেক আগে থেকেই। কিন্তু পাহাড়ের বাস্তবতা আর নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে রাঙামাটিবাসীর সেই স্বপ্ন স্বপ্নই ছিল। আর তাইতো রাঙামাটিবাসীর মনের সেই আকুতি বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। ফলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন রাঙামাটিতে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজে। নিজের স্বল্প সময়ে তিনি প্রায় পুরোটা ঘুছিয়ে এনেছেন সেই কাজটির। রাঙামাটিবাসী চাইলে শীঘ্রই সেই অধরা স্বপ্নটাও আলোর মুখ দেখবে। রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজের মত একদিন ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজটিও প্রতিষ্ঠা লাভ করবে রাঙামাটির বুকে। আর এটির প্রতিটি ইটের গাঁথুনিতে রাঙামাটিবাসী দেখতে পাবেন একজন গোলাম ফারুকের নাম। যাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম আর ত্যাগের কারণে এ্িটর সফল বাস্তবায়ন হবে সেদিন। কারণ এটি প্রতিষ্ঠার নেপথ্যের সব কিছুই যে তাঁর হাতেই গড়া। ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে তিনিও অমর হয়ে থাকবেন যুগ যুগান্তর ধরে।
শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানেই তাঁর এত অবদান তাই নয়। তিনি তাঁর বাহিনীর মাধ্যমে রাঙামাটিতে সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতির বন্ধনকে মজবুত করেছেন। একই সাথে পাহাড় আর দক্ষিন এশিয়াখ্যাত কাপ্তাই হ্রদ ঘেরা রূপের রানী রাঙামাটির সৌন্দর্য্যকে দেশ-বিদেশের লোকজনের কাছে তুলে ধরতেও তাঁর চিন্তা ছিল অকল্পনীয়। রাঙামাটিবাসীর জন্য আরণ্যক সবচেয়ে প্রিয় বিনোদনের স্থান। এটিকে প্রকৃতির সাথে সময়োপযোগি পর্যটন বান্ধব করে গড়ে তুলতে আধুনিক সব রাইডারের ব্যবস্থা করেন তিনি। একটা সময় আরণ্যকে সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার ছিলনা। কিন্তু এটিকে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন তিনি। শুধু তাই নয়। কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক বিভিন্ন স্থাপত্যশৈলির মাধ্যমে হ্রদের মাঝখানে আরো একটি দৃষ্টিনন্দন স্পট তৈরি করেছেন রিজিয়ন কমান্ডার। যেটি রাঙামাটিবাসী কখনো কল্পনায় করেনি এমন কিছু রাঙামাটিতে হবে। রূপকথার মতই সুন্দর আরণ্যক এবং হ্যাপি আইল্যান্ডও সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে বিনোদনের দ্বার উন্মোচন করেছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ গোলাম ফারুক। এছাড়াও মানব কল্যানেও তিনি করেছেন বেশ কিছু প্রশংসনীয় কাজ।
বিদায়ের প্রাক্কালে পৃথকভাবে লেকার্স স্কুলের অভিভাবক-শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সাথে আবেগঘন অনুষ্ঠানের আয়োজনে উঠে আসে রিজিয়ন কমান্ডার মোঃ গোলাম ফারুকের স্বল্প সময়ে বিশাল কর্মযজ্ঞের নানা দিক। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ গোলাম ফারুককে আবেগ-ভালবাসা আর শ্রদ্ধায় মনে রাখবে অত্র প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মচারি-অভিভাবক আর তাঁর কীর্তি দেখা সকলে।
