আরমান খান, লংগদু
লংগদু উপজেলা সদর হতে ১০ কিলোমিটার দূরের এক পাহাড়ি গ্রাম দাদীপাড়া। এই গ্রামের চারটি পাড়ায় বাস করে ১৩৫টি পরিবার। এখানকার অধিবাসীরা সবাই জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল। গ্রীষ্মের দাবদাহে কোলাহলমুক্ত নিরিবিলি শান্ত এ গ্রামের মানুষের সুপেয় পানির চরম সংকট চলছে। চারটি পাড়ার একটিতেও নেই নলকূপ। পানির জন্য একমাত্র ভরসা ছড়া ও কূয়া। খরার এ মৌসুমে ছড়া শুকিয়ে চৌঁচির। ছোট ছোট কূয়ার সামান্য পানি দিয়ে খাবারসহ গৃহস্থালির সব কাজ সারতে হয়। দশটা কূয়া খুঁড়লে একটা বা দুইটাতে সামান্য পানি পাওয়া যায়। এক কলসি পানি ভরতে এক দেড় ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়। দিনের বড় একটি সময় পানি সংগ্রহের পেছনেই ব্যায় হয় তাদের।
সম্প্রতি সরেজমিনে দাড়িপাড়া গিয়ে দেখা যায়, এখানকার নারী-পুরুষ সবাই পানি সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত। কেউ আবার সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে কূয়া থেকে ছোট পাইপ দিয়ে ড্রামে করে পানি সংগ্রহ করছেন। সব পাড়াতেই একই চিত্র। অনেকে আবার এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায় ছুঁটছেন একটু খাবার পানি সংগ্রহের কাজে। পাড়া ঘুরে দেখা মেলে অসংখ্য ছোট ছোট কুঁয়ার, যার বেশিরভাগ পানি শূন্য। গ্রামের বাসিন্দার জানালেন এখানকার মাটিতে প্রচুর পাথর। কূয়া বেশি খোঁড়া যায়না তাই পানিও পাওয়া যায় না। এখানে প্রয়োজন গভীর নলকূপ বা রিং অগভীর নলকূপ। তবেই এখানকার মানুষ নিরাপদ সুপেয় পানির স্বাদ পাবে।
দাদীপাড়া গ্রামের কারবারি (গ্রাম প্রধান) প্রিয় লাল চাকমা বলেন, আমাদের একমাত্র সমস্যা পানি। খাওয়ার জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নেই। স্নানসহ গৃহস্থালি সব কাজের জন্য কূয়া থেকে পানি সংগ্রহ করে সাবাই। শুষ্ক মৌসুে কূয়ার পানিও শুকিয়ে যায়। তখন আমাদের কষ্টের শেষ থাকে না। জরুরিভাবে আমাদের চারটা পাড়ায় কমপক্ষে ৬টা নলকূপ একান্ত প্রয়োজন।
গ্রামে শিশুদের জন্য একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ইউনিসেফ ‘র পাড়াকেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু শিশুদের এ দুটি প্রতিষ্ঠানেও নেই কোনো নলকূপ। কূয়ার পানি পান করার ফলে শিশুরা প্রায় সময় ডায়রিয়াসহ নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। দাদীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক প্রমদ শেখর চাকমা বলেন, আমার নিজের গ্রাম এটা। আমরা ছোটবেলা থেকেই গ্রামে কখনো নলকূপ দেখিনি। এখানকার মানুষের প্রধান সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে সুপেয় পানির অভাব। বর্তমান সময়ে কূয়া ও ছড়া শুকিয়ে যাওয়ায় পানির হাহাকার চলছে। বছরের চারমাস পানির সংকট চরম আকার ধারণ করে। এখানকার বিদ্যালয়সহ গ্রামে কয়েকটি রিং টিউবওয়েল খুবই প্রয়োজন।
গ্রামটিতে ভোটারের সংখ্যা চার শতাধিক। লংগদু সদর ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের ভোটার সবাই। ভোট আসলে জনপ্রতিনিধিরা নানা প্রতিশ্রুতি দেন গ্রামবাসীকে। কিন্তু দীর্ঘদিনের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে কেউ এগিয়ে আসেননি। ফলে এখানকার মানুষরা ক্ষোভে ফুঁসেছেন। এবার কেউ ভোট চাইতে আসলে আগের দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে, তবেই ভোট পাবেন প্রার্থী। এমনটাই জানালেন তারা।
এ বিষয়ে লংগদু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কুলিন মিত্র চাকমা (আদু) বলেন, ‘গ্রীষ্ম মৌসুমে পাহাড়ের সব জায়গাতেই সুপেয় পানির সংকট দেখা দেয়। বেশিরভাগ জায়গায় পাথর থাকায় ডিপ টিউবওয়েল করা সম্ভব হয়না। দাদীপাড়া গ্রামেও ডিপ টিউবওয়েল বরাদ্দ দিয়েছিলাম কিন্তু গ্রামবাসী তা নিতে চাননা। তাদের দাবি রিং টিউবওয়েল। আমি জেলা পরিষদে আবেদন করেছি। আশা করছি শীঘ্রই দাদীপাড়া গ্রামে রিং টিউবওয়েল বসানো হবে।’
