রিকোর্স চাকমা
রাঙামাটি বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর পর্যটন জেলা। বিশাল কাপ্তাই লেক, সেই লেকের মধ্যে ডুবে থাকা পাহাড়, পাহাড়ি নদী আর ঝর্ণার যেনো জীবন্ত এক ক্যানভাস। আকাঁবাকা রাস্তা, পাহাড় ও লেকের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা রাঙ্গামাটি দেশের দক্ষিণ – পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত।সব ঋতুতে পর্যটকদের মুখরিত হয়ে থাকে। চারদিকে লেক, বন-বনানী, আঁকা বাঁকা পথ ও কাপ্তাই হ্রদের অকৃত্রিম বিশালতার সমন্বয়ে গঠিত এই পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি।
প্রতিবছর ভ্রমন পিপাসু মানুষ প্রকৃতির সানিধ্য লাভের আশায় ছুটে আসে এই জেলায়। বিশেষ করে শীতের মৌসুমে পর্যটকদের আসা-যাওয়া চোখে পড়ার মতো।বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ জেলা হিসেবে পরিচিত এই রাঙ্গামাটি জেলাতে রয়েছে পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভবনা। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য বার বার হাত-ছানি দেয় ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের।
রাঙামাটি জেলার নাম করণ নিয়ে রয়েছে নানা মত। কেউ মনে করেন হৃদের পানি প্রবাহের সময় লাল রং দেখায় বলে এই জেলার নাম রাঙামাটি। আবার কেউ কেউ মনে করেন মাটির রং লাল বলে এই জেলার নামকরণ হয়েছে রাঙামাটি।
পার্বত্য রাঙ্গামাটি এই জেলায় পর্যটকদের অন্যতম আর্কষণীয় দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে সিম্বল অব রাঙ্গামাটি খ্যাত ঝুলন্ত সেতু, দেশের প্রথম পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সুবলং ঝর্ণা, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফের সমাধিস্থল,
রাজবনবিহার (বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান ), কাপ্তাই- রাঙামাটি সড়ক,আরণ্যক রিসোর্ট, পলওয়েল পার্ক, আসামবস্তি ব্রিজ সহ রয়েছে বেশ কিছু পর্যটন কেন্দ্র।
ঝুলন্ত সেতুঃ রাঙামাটি শহরের শেষ প্রান্তে কর্ণফুলী হৃদের উপরে রয়েছে ৩৩৫ ফুট দীর্ঘ ঝুলন্ত সেতু। হ্রদের দুই পাশের দুটি পাহাড়কে সংযুক্ত করে ঝুলন্ত সেতু দাঁড়িয়ে আছে। এটি সিম্বল অব রাঙামাটি হিসেবেও পরিচিত পেয়েছে।
সুবলং ঝর্ণাঃ সুবলং ঝর্ণা রাঙ্গামাটি থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে বরকল উপজেলায় অবস্থিত। দেশের সবচেয়ে উঁচু ঝর্ণা হিসেবে পরিচিত সুবলং ঝর্ণা। বর্ষায় তার প্রাণ ফিরে পায়। প্রায় ৩০০ ফুট উঁচু থেকে নেমে আসা পানির পর্যটকদের ভীষণ ভাবে আকর্ষণ করে। নৌ পথে যেতে প্রায় সময় লাগে এক ঘন্টা।
বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুল রউফের সমাধিঃ মূল শহর থেকে নৌ পথে ১৫ কিলোমিটার দূরে স্বচ্ছজলরাশি দ্বারা বেশিষ্ট ছোট দ্বীপ বুড়িঘাট এলাকার চিংড়িখালে রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর শ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফের সমাধি। এর চারদিকের প্রকৃতিক পরিবেশ পর্যটকদের বিমোহিত করে।
কাপ্তাই হ্রদঃ কাপ্তাই হ্রদ বা লেক বাংলাদেশের এমনকি দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বৃহৎতম মনুষ্যসৃষ্ট স্বাদু পানির হ্রদ। এটি প্রধানত জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সৃষ্টি হলেও এই জলাধারে প্রচুর পরিমানে মিঠা পানির মাছ চাষ হয়। চাষকৃত মাছ দেশের বিভিন্ন জেলায় রপ্তানি করা হয়।
আরণ্যক রিসোর্টঃ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্মিত হলেও এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। লেক আর পাহাড়ের অপরূপ সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই রিসোর্ট পর্যটকদের ভিন্ন বিনোদন মাধ্যম।
পলওয়েল পার্কঃ রাঙামাটি জেলা পুলিশের তত্ত্বাবধানে নির্মিত পলওয়েল পার্ক ইদানীং ব্যাপক জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত পেয়েছে। এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত।
রাঙামাটি জেলার প্রধান নদী কর্ণফুলী। এ নদী ভারতের লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে রাঙামাটির উত্তর-পূর্ব সীমান্ত দিয়ে ঠেগা নদীর মোহনা হয়ে এ অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। কর্ণফুলী নদীর উপনদীগুলো হল কাচালং, মাইনী, চেঙ্গি, ঠেগা, সলক, রাইংখ্যং। এছাড়া এ জেলায় রয়েছে বাংলাদেশের বৃহত্তম কাপ্তাই হ্রদ। এ উপনদীগুলো বর্ষাকালে যথেষ্ট খরস্রোতা থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে নাব্যতাসহ পানির পরিমাণ প্রায় থাকেনা।
এই জেলায় জুম পদ্ধতিতে পাহাড়ে চাষাবাদ হয়ে থাকে। এ জেলায় উৎপাদিত প্রধান শস্যগুলো হল ধান, পাট, আলু, তুলা, ভুট্টা, সরিষা। এছাড়া এ জেলায় প্রচুর পরিমাণে ফলজ ও বনজ গাছের বাগান রয়েছে, যা বাইরে রপ্তানি করে এ জেলার লোকেরা জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। প্রধান রপ্তানি দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে কাঁঠাল, আনারস, বনজ পণ্য, কাঠ ইত্যাদি। এছাড়া এ জেলায় আম, কলা, লিচু, জাম ইত্যাদি ফলের প্রচুর ফলন হয়। এছাড়া কাজু বাদাম বর্তমানে রাঙ্গামাটির অর্থনীতিতে ব্যাপক উন্নতি সাধন করেছে।
জেলায় রয়েছে বাংলাদেশের বৃহত্তম কাগজের কল কর্ণফুলী কাগজ কল এবং দেশের বৃহত্তম পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এছাড়া রয়েছে রেয়ন কল, ঘাগড়া বস্ত্র কারখানা, উপজাতীয় বেইন শিল্প, বাঁশ ও বেতের হস্তশিল্প, হাতির দাঁত শিল্প ইত্যাদি।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ছাড়াও এখানে আবাসিক হোটেল ও মোটেল রয়েছে অর্ধশতাধিক। কাপ্তাই হ্রদের দ্বীপ ও পাড়ে আছে পর্যটন স্পট ও রিসোর্ট। রাঙামাটিতে প্রতিদিন হাজারখানিক পর্যটক ঘুরতে আসেন। ভরা মৌসুমে সেই সংখ্যা দ্বিগুন হয়।
স্বাধীনতার পর থেকে পর্যটন করপোরেশন রাঙামাটিতে কাজ করছে। এর আগে ১৯৬৪ সালে পর্যটনের জন্য বর্তমানের জায়গাটি চিহ্নিত করেছিল তৎকালীন পাকিস্তান ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট। ১৯৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময় বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন গঠিত হয়। ১৯৭৩-৭৪ সালে বোট ক্লাব নাম নিয়ে সীমিত আকারে কার্যক্রম আরম্ভ হয়। বর্তমানে পর্যটন করপোরেশন হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, বার, ড্রিংকস কর্নার, নৌযান ভাড়া, গাড়ি পার্কিং, ট্যুর গাইড সার্ভিস, পর্যটনবিষয়ক ট্রেনিং প্রোগ্রাম, স্যুভেনির শপ, ঝুলন্ত সেতু তত্ত্বাবধান করে। নানা রকমের ইজারা ও ভাড়া দিয়ে এই কমপ্লেক্সের আয়ের খাত আছে ১৩টি।
স্বাধীনতার পর থেকে পর্যটন করপোরেশন রাঙামাটিতে কাজ করছে। এর আগে ১৯৬৪ সালে পর্যটনের জন্য বর্তমানের জায়গাটি চিহ্নিত করেছিল তৎকালীন পাকিস্তান ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট। ১৯৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময় বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন গঠিত হয়। ১৯৭৩-৭৪ সালে বোট ক্লাব নাম নিয়ে সীমিত আকারে কার্যক্রম আরম্ভ হয়। বর্তমানে পর্যটন করপোরেশন হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, নৌযান ভাড়া, গাড়ি পার্কিং, ট্যুর গাইড সার্ভিস, পর্যটনবিষয়ক ট্রেনিং প্রোগ্রাম, ঝুলন্ত সেতু তত্ত্বাবধান করে। নানা রকমের ইজারা ও ভাড়া দিয়ে এই কমপ্লেক্সের আয়ের খাত আছে ১৩টি। কিন্তু এর পরও বলতে হয় স্বাধীনতার পর থেকে এই দীর্ঘ পথচলায় খুব একটা উল্লেখযোগ্য দৃশ্যমান কিছু করতে পারেনি পর্যটন করপোরেশন। তবে ইদানীং অন্যান্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নানা প্রকল্পের প্রতিযোগিতার মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানটির সেবার মান কিছুটা বেড়েছে।
পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স ব্যাপস্থাপক সৃজন বড়ুয়া বলেন, আমরা আরোও পর্যটন খাতে সেবা বাড়াতে চাই। তার জন্য বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। পর্যটকদের আকর্ষণ করতে আমাদের কিছু স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আছে। কিছু স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা, যেমন শিশুপার্ক স্থাপন, যেখানে ছোট-বড় রাইড, ওয়াটার রাইড থাকবে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের কাছে প্রস্তাবণা প্রেরণ করেছি। কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুলোর মধ্যে ঝুলন্ত সেতু ও মিলনায়তনকে যুগোপযোগী করা, সুইমিংপুল স্থাপন, ফোয়ারা স্থাপন, কেবল কার স্থাপন অন্যতম। এসব বাস্তবায়ন করা না গেলে পর্যটক যেমন বাড়বে না, তেমনি করপোরেশনের আয়ও বাড়বে না। বর্তমানে রাঙামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স বছরে তিন থেকে পৌনে চার কোটি টাকা আয় করে। এগুলোর উৎস হোটেল, রেস্তোরাঁ, ঝুলন্ত সেতুর দর্শনার্থীর ফি। সুবিধা বাড়লে এই আয়ও বাড়বে।
প্রকৃতির কোমল পরশে সজীব হয়ে ওঠা অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য হাজার হাজার পর্যটকের পদচারণায় প্রতিবছর মুখরিত হয়ে ওঠে রাঙ্গামাটি। নৈর্সগিক পার্বত্য এই অঞ্চল আছে বলেই সমতল ও পাহাড়ের বৈচিত্র বোঝা যায়। আর বৈচিত্রময় এই জেলার কারণে বাংলাদেশের সৌন্দর্য্য বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা যায়। তাই দেশকে জানতে হলে বেশি বেশি ভ্রমণ করুন ও দেশের পর্যটনখাতকে সমৃদ্ধ করুন।
