শংকর হোড় ॥
কাপ্তাই হ্রদে কচুরিপানায় নৌ যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিবছর বর্ষায় কমবেশি এই সমস্যা থাকলেও এবছর মাত্রাতিরিক্ত এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। কচুরিপানার কারণে স্বাভাবিক নৌ চলাচল যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি জেলেদের হ্রদে জাল ফেলতেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে। আবার কচুরিপানাগুলো ভেসে পাড়ে চলে আসার পর ছোট ছোট ইঞ্জিনচালিত বোটগুলো তীরে ভিড়তে বেগ পেতে হচ্ছে। এছাড়া গোসলসহ নিত্যকাজে হ্রদের পানি ব্যবহারকারীদের পড়তে হচ্ছে বিড়ম্বনা। বছরের পর বছর হ্রদের কচুরিপানার জঞ্জাল বড় হলেও এই জঞ্জাল পরিষ্কারের দায়িত্ব কার এই বিষয়ে জানা নেই হ্রদসংশ্লিষ্ট কোনও প্রতিষ্ঠানের। হ্রদ ব্যবহার করে সব প্রতিষ্ঠানই রাজস্ব আয় করলেও হ্রদের কচুরিপানা পরিষ্কার করতে এককভাবে দায়িত্ব নিতে রাজি হচ্ছেন না কেউ। তবে হ্রদের সাথে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে একমাত্র এর সমস্যার সমাধান সম্ভব।
১৯৬০ সালে কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির পর হ্রদের প্রথমদিকে তেমন একটা কচুরিপানার সমস্যা ছিল না। তবে গত তিন দশক ধরে এই হ্রদে কচুরিপানা দিনে দিনে বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কচুরিপানা দ্রুত বর্ধনশীল উদ্ভিদ। দিনে এটি প্রায় দ্বিগুণহারে বৃদ্ধি পায়। কাপ্তাই হ্রদে ক্রিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ বৃদ্ধি পাওয়ার পর ও ঘোনায় মাছ চাষের ফলে কচুরিপানা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি ভারতের মিজোরাম থেকে উজানে কচুরিপানা চলে আসায় হ্রদের সাথে মিশে গিয়ে বিশাল স্তুপাকারে কয়েক বর্গকিলোমিটার আকারে ছড়িয়ে থাকার ফলে নৌ-চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। পাশাপাশি বাতাস ও উজানের পানির কারণে বিভিন্ন এলাকায় কচুরিপানা ছড়িয়ে পড়ে তীরে এসে জমিয়ে থাকে। এতে ছোট ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকাগুলি তীরে ভিড়তে বেগ পেতে হয়। যাতে সময় ও অর্থ নষ্ট হচ্ছে।
এদিকে হ্রদের এতবড় জঞ্জাল পরিষ্কারের দায়িত্ব কার ওপর, এটা নিয়ে কারো থেকে সদুত্তর পাওয়া যায়নি। হ্রদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ হ্রদে কচুরিপানা পরিষ্কারে কারো একক দায়িত্ব নেই জানিয়ে কচুরিপানা পরিষ্কারে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছেন।
প্রবীণ সংবাদকর্মী সুনীল কান্তি দে বলেন, হ্রদ সৃষ্টির পর কচুরিপানার তেমন কোনও সমস্যা না থাকলেও গত কয়েক দশক ধরে এর মাত্রা তীব্র হয়েছে। মূলত ক্রিক পদ্ধতিতে মাছচাষ বৃদ্ধি পাওয়ায় কচুরিপানার সমস্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, যেহেতু বর্তমানে ক্রিক পদ্ধতিতে মাছ চাষের ওপর অনেকেই নির্ভরশীল, তাই মাছ চাষের পর কচুরিপানা হ্রদে ছেড়ে না দিয়ে তার সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে পারলে এটি বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়া যেত। এজন্য হ্রদের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
হ্রদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক এটিএম আবদুজ্জাহের বলেন, হ্রদে কচুরিপানা এসে প্রজেক্টের সামনে জমা হলে আমরা সেগুলি পরিষ্কার করে নৌ যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখি। ট্রাক বোট দিয়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশপাশের কচুরিপানা টেনে সরিয়ে ফেলা হয়। তবে আমার প্রজেক্টের এলাকার বাইরে অন্যান্য এলাকা সুবলং, কান্দাইরমুখ, বরকল, লংগদু এসব কচুরিপানা পরিষ্কার করার মত লোকবল আমার নেই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, হ্রদের কচুরিপানা পরিষ্কারের দায়িত্ব কার সেটা নিশ্চিতভাবে তিনিও জানেন না। এই বিষয়ে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপ-পরিচালক নয়ন শীল বলেন, আগে এই সমস্যা বেশি না হলেও এবার সমস্যা তীব্র হয়েছে। আমরা বিষয়টি ঢাকায় চেয়ারম্যান স্যারকে জানিয়েছি। ইতোমধ্যে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক রাখতে স্থানীয় লঞ্চ মালিক সমিতির মাধ্যমে কিছুটা পরিষ্কার করা সম্ভব হলেও পুরোপুরি এখনো পথ পরিষ্কার করা যায়নি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখা, আমরা সেটা চেষ্টা করছি, তবে হ্রদ কচুরিপানা মুক্ত রাখতে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন(বিএফডিসি) রাঙামাটি অঞ্চলের ব্যবস্থাপক লে. কমান্ডার তৌহিদুল ইসলাম বলেন, বর্ষার পানিতে হ্রদে পানি না বাড়লেও মিজোরাম থেকে পানি আসার হ্রদের পানি বাড়তে থাকায় হয়তো সেদিক থেকে কিছু কচুরিপানা এসেছে। তবে আমরা লঞ্চ মালিক সমিতির সহযোগিতায় সুবলং চ্যানেলে যে প্রতিবন্ধকতা ছিল সেটা সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নির্দিষ্টভাবে হ্রদের কচুরিপানা পরিষ্কারের দায়িত্ব এককভাবে কারো না থাকলেও যেখানে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে আমরা চেষ্টা করছি সমাধানের জন্য। অভিযোগ পাওয়া গেলে আমরা সকলের সহযোগিতায় পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিচ্ছি।
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, হ্রদের কচুরিপানা পরিষ্কারের দায়িত্ব কার, এই বিষয়টা আমার জানা নেই। তবে কচুরিপানা থেকে সৃষ্ট দুর্ভোগ থেকে জনসাধারণকে মুক্ত করতে যেখানে যে সমস্যা আমরা আপাতত সেই সমস্যা সমাধান করছি। তবে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ কচুরিপানা পরিষ্কারের দায়িত্ব থাকলেও এত বড় হ্রদের কচুরিপানা পরিষ্কারের মত অত সামর্থ্য তাদের নেই।
তিনি আরো বলেন, স্থায়ীভাবে হ্রদ থেকে কচুরিপানা মুক্ত করার জন্য গবেষণার প্রয়োজন। গবেষণা থেকে যে উপাত্ত পাওয়া যাবে সেটা সামনে রেখে হ্রদের সাথে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এর সমাধান সম্ভব।
