যারা অস্ত্র হাতে সকাল বিকাল রাত দৌঁড়াতো আসামী ধরতে,মারামারি থামাতে কিংবা সামাজিক বিশৃংখলা দমাতে, আজ তারাই জীবন বাঁচাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে।রাতদিন ব্যস্ত থানায় নেই মানুষের ভীড়ও। জীবন বাঁচাতে ঘরে ঢুকে পড়েছে বেশিরভাগ মানুষই। কিন্তু জীবন,পরিবার কিংবা পিছুটান,কোনকিছুই যাদের ন্যুনতম দমাতে পারেনি,বরং দায়িত্ব পালনে আরো বেশি প্রতিজ্ঞাবদ্ধই করেছে,তারা পুলিশ। যাদের সাথে মানুষের চিরদিনেরই সম্পর্ক ‘টানাপোড়েন’র। অথচ নিয়তির কি নির্মম পরিহাস, আজ যখন সেইসব মানুষের জীবন সবচে ঝুঁকিতে,তখন নিজেদের জীবন বাজি রেখেই মাঠে পুলিশ সদস্যরাই,বেয়ারা জনতাকে ঘরে ঢোকাতে,করোনার ভয়াবহতা থেকে বাঁচাতে !
সারাক্ষণ অস্ত্র বা লাঠি হাতে তটন্ত পুলিশ এখন মাইক হাতে মানুষকে বারবার সতর্ক করছে,প্রচার চালাচ্ছে করোনা সচেতনতার। এ দৃশ্য খুব বেশি চেনা নয় এদেশে। পৃথিবীতে করোনা মহামারীতে চিরচেনা এ দৃশ্য পাল্টে সেই পুলিশ যুদ্ধে নেমেছে সেই জীবাণুর বিরুদ্ধে,যে প্রতিপক্ষ সম্পর্কে কোন ধারণাই নেই তাদের ! শুধুই দায়িত্ব আর কর্তব্যের প্রয়োজনে,নিজেকে ঝুঁকিতে রেখে,নেমে পড়েছে মানুষ বাাঁচতে।
বাসা থেকে বের হলেই পথে বা রাস্তার বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে আর কাউকে দেখা না গেলেও দেখা মিলবে পুলিশের। দিন কিংবা রাত সব সময় পুলিশ মাঠে। পুলিশের সদস্যরা শুধু রাস্তায় নয় গাড়ি নিয়ে ছুটে চলছেন বিভিন্ন পাড়ায় পাড়ায়ন যাতে কেউ আইন অমান্য করে বাসা থেকে বের না হয়, সেটি নিশ্চিত করার জন্য। আবার অনেকের বাসায় পৌছে দিচ্ছেন খাবার। অথচ নিজেদের খাবার খেতে হচ্ছে ব্যারাকে বা বাসায় নয়, পথেই!
সারাদেশের মতো পার্বত্য শহর ও ও প্রতিটি উপজেলায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছে রাঙামাটি পুলিশ। পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে সদ্য কনস্টেবল হিসেবে যোগ দেয়া ছেলে বা মেয়েটিও দিনরাত কাজ করছে মাঠে।
বুধ এবং বৃহস্পতিবার সারাদিনই রাঙামাটি শহরের কয়েকটি স্পটে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যদের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। চাকুরিবিধির কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিজেদের দায়িত্ব কর্তব্য আর চলমান সংকট নিয়ে কথা বলেন তারা।
এক নারী কনস্টেবল বলেন, ‘ বিশ্রাম করার যে সময়টুকু পাই সেটি নিয়ে আমাদের কোন আক্ষেপ নাই, আমরা দেশের এক কঠিন সময়ে নিজেদের উজাড় করে দিতে পারছি, সেটাই সৌভাগ্য। এমন কঠিন সময়ে বিশ্রামের কোন নির্দিষ্ট সময় নাই।মাঝে মাঝে খুব ক্লান্ত লাগে। কিন্তু নিজেকে সান্তনা দেই এই বলে যে, আমার বাড়তি পরিশ্রমে যদি একটি জীবন বাঁচে,সেইবা কম কি !’
আরেক পুলিশ কনস্টেবল বলেন, ‘পরিবারের সদস্যরা সব সময় চিন্তায় থাকেন আমাদের কি হচ্ছে? তারপরও দেশের জন্য সব ভুলে কাজ করছি। এমন কাজ করতে ঝুঁকি থাকলেও আনন্দও আছে, সাথে গর্ববোধ করি এমন কাজ নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারায়’
এক নারী পুলিশ সদস্য বলেন-‘ কাজ করছি মনের আনন্দেই,কিন্তু অজানা ভয়ও কাজ করে মনে। ইতোমধ্যেই মাদারীপুরে করোনা আক্রান্ত হয়ে আমাদের এক পুলিশ সদস্য মারা গেছেন,মুক্তাগাছায় আরেকজনের করোনা ধরা পড়েছে। বিষয়গুলো অবশ্যই টেনশনের। আমরা কোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই কাজ করছি,নানা ধরণের মানুষের সাথে মিশছি প্রতিদিন,জানিনা কপালে কি আছে।’
আরেক উপ পরিদর্শক বলেন-‘আমাদেরও সংসার আছে,সন্তান আছে। ডিউটি শেষে বাড়ী ফিরে যাচ্ছি,পরিবারের সবাই তো বাসায় হোমকোয়ান্টিনে, কিন্তু আমাদের কারণে তো তারাও সংক্রমনের ঝুঁকিতে !’
রাঙামাটি জেলায় পুলিশের ৫৭ টি ইউনিটে কর্মরতে আছেন প্রায় ২৭০০ পুলিশ সদস্য। এর মধ্যে রাঙামাটি শহরেই প্রায় ৩৫০ জন। শহরের ১৭ টি পয়েন্টে ডিউটির পাশাপাশি,শহরের প্রবেশপথের তিনটি পয়েন্ট,ভ্রাম্যমান টীম,অফিসারদের সাথে ডিউটিসহ প্রতিটি কাজেই অংশ নিচ্ছেন, আবার থানার নিয়মিত কার্যক্রমও চালু রাখতে হচ্ছে। পুরো বিষয়টিকেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করেন পুলিশের শীর্ষ কর্তারাও। তবে এই দিনরাতের পরিশ্রমকে ‘দেশের জন্য দায়িত্ব ও কর্তব্য’ বলেই মনে করছেন তারা।
রাঙামাটি জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ ছুফিউল্লাহ বলেন-‘ দেশ এক গভীর সংকটকাল অতিক্রম করছে সারা পৃথিবীর সাথে। এই সময় পুলিশসহ সকল আইনশৃংখলা বাহিনী,প্রশাসন এবং সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের চেয়েও মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানুষের জীবন বাঁচানোটাই প্রধান কাজ ও দায়িত্ব হিসেবে পালন করছে। সরকারও এই ব্যাপারে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরাও তার বাইরে নয়।’
পুলিশ সদস্যদের নিজেদের করোনাক্রান্ত হওয়া ও নিরাপত্তা প্রসঙ্গে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন-এটা নিয়ে আমরাও চিন্তিত। ইতোমধ্যেই দুয়েকটা ঘটনা আরো বেশি ভাবনা তৈরি করেছে। মাঠে কাজ করা আইনশৃংখলাবাহিনীর সদস্য,প্রশাসনের কর্মকর্তা কর্মচারীদেরও যদি প্রয়োজনীয় ‘পিপিই’ দেয়া নয়,তবে যেকোন খারাপ কিছুই হতে পারে। কারণ আমাদের পুলিশ একটি ইউনিফাইড ফোর্স,ব্যারাকে ফিরে গিয়ে তারা একা থাকেন না,একসাথে থাকেন। ফলে একজনের শরীরে যদি কোনভাবে সংক্রমন হয়,তবে পুরো ইউনিট’ই ঝুঁকিতে পড়বে। এটা নিয়ে আমাদের উর্ধতনরা ভাবছেন,দেখা যাক কি হয়।’
অচেনা অজানা এক ভাইরাস ‘করোনা’ বদলে দিচ্ছে পুরো পৃথিবীকে। এই পরিবর্তনের প্রভাব গোটা পৃথিবীতে কতটা পড়বে কে জানে। কিন্তু আপাতত: এর প্রভাবে বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনীর প্রাত্যহিকতায় যে পরিবর্তন এনেছে, স্বাভাবিক কাজের বাইরে গিয়ে যে মানুষের পাশে মানুষের জীবন বাঁচাতে, নিজের জীবন ঝুঁকিতে নিয়ে কাজ করছে দেশের সবচে গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীটি,তা নি:সন্দেহে ইতিহাস হবে। যদি অচিন এই ভাইরাসে একজন পুলিশ সদস্যও মারা যান,তার এতিম সন্তান বহুবছর পরও গর্বে মাথা উঁচু করে বলতে পারবে ‘ আমার পিতা,মানুষের পাশে থেকে মানুষের জন্যই প্রাণ দিয়েছে,আমি সেই বাবার গর্বিত পুলিশ পরিবারের সন্তান।’ আপাতত: এই সান্তনা ছাড়া মাঠে ঘাটে কাজ করা লক্ষ লক্ষ পুলিশ সদস্যের সামনে আর কিইবা আছে অনুপ্রেরণার !
