আলাউদ্দিন শাহরিয়ার, বান্দরবান ॥
উন্নয়নের ছোয়ায় বান্দরবানে বদলে গেছে একসময়ের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন উপজেলা থানচি। সাঙ্গু নদীতে সেতু এবং বিদ্যুৎ সংযোগে পিছিয়েপড়া অন্ধকারছন্ন পাহাড়ি জনপথ থানচি উপজেলার দৃশ্যপথ পাল্টে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ইতিমধ্যে অবকাঠামোগত উন্নয়নে উপজেলাটি ছাড়িয়ে গেছে জেলা সদর ব্যতিত অন্যসব উপজেলাকেও। তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের যতœবান হওয়ার দাবি জানিয়েছেন বেড়াতে আসা পর্যটকেরা।
জানা গেছে, দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে থানচিবাসীর সাথে সেতুবন্ধন তৈরি করতে ২০১২ সালের সতের নভেম্বার থানচিতে নয় কোটি টাকা ব্যয়ে সাঙ্গু নদীর উপরে নির্মিত সাঙ্গু সেতুর উদ্ধোধনের মাধ্যমে নতুন দিগন্তের সূচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। পাঁচ বছরের ব্যবধানে ২০১৭ সালের পহেলা মার্চ প্রায় ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুত বিদ্যুতায়ন প্রকল্পেরও উদ্ধোধন করেন। স্বাধীনতার ছয়চল্লিশ বছর পর বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠে থানচি উপজেলা। সংযোগ সেতু তৈরির একযুগেরও কম সময়ে পিছিয়ে পড়া উপজেলা থানচি জেলা সদর ব্যতিত অন্যসব উপজেলাকে ছাড়িয়ে গেছে সরকারি-বেসরকারি অর্থায়নে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধারাবাহিকতায়। ইতিমধ্যে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, অর্থায়নে মিয়ানমার সীমান্ত সড়ক, অভ্যন্তরীণ সংযোগ সড়ক, সাঙ্গু নদীতে আরসিসি পাকা সেতু, ঝুলন্ত সেতু নির্মাণসহ পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে আরও কয়েকশ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকৌশল বিভাগের উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে থানচিতে। থানচি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, থানচি কলেজ, থানচি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল, থানচি উপজেলা পরিষদ ভবন, থানচি আধুনিক থানা ভবন নির্মাণের মধ্য দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, নিরাপত্তা সবক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে প্রত্যন্ত এ জনপদের মানুষ। পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবি’র উদ্যোগে সীমান্ত অবকাশ রিসোর্ট, থানচিতে বেসরকারি অর্থায়নে উন্নতমানের হোটেল ডিজকভারী থানচি, থানচি কুটির’সহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।
থানচি বাসিন্দার হোটেল ডিজকভারী কর্মচারী রুবেল ত্রিপুরা বলেন, থানচি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। উন্নয়নের ছোয়ায় নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। থানচি এতটা বদলে যাবে কখনো ভাবিনি। বিদ্যুৎ থানচিবাসীর জীবনযাত্রাও বদলে দিয়েছে।
রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী মো: সালাম বলেন, আমার জন্ম থানচিতে। তবে কর্মসংস্থানের জন্য মাঝখানে পাচটি বছর বিদেশে চলে গিয়েছিলাম। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দুর্গম থানচিতে বিদ্যুৎ আসবে, সেতু হবে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে এতটা বদলে যাবে স্বপ্নেও ভাবিনি। তাই ফিরে বদলে যাওয়া থানচিতে পর্যটকদের সুবিধার্থে মানসম্মত রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করেছি।
রেমাক্রি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মালিরাম ত্রিপুরা বলেন, থানচির বদলে যাওয়া কল্পনাকেও হার মানাবে। প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা এবং পার্বত্য মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এর আন্তরিক প্রচেষ্টায় চেহারায় বদলে গেছে থানচির। এখানকার মানুষ গরমে এসি ব্যবহার করবে, শীতে গরম পানির গিজার ব্যবহার করবে, মোবাইলে কথা বলবে? ডিসটিভি দেখবে? এটি স্বপ্নেও ভাবেনি। অথচ বেড়াতে এসে এখন শতশত পর্যটকও প্রতিদিন থানচিতে বসে আধুনিক সব সেবা ভোগ করছেন।
বেড়াতে আসা পর্যটক সাজেদ রহমান, রাকিবুল মুনির বলেন, একযুগ আগেও থানচিতে বেড়াতে এসেছি। যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা ছিলো না তখন। বিদ্যুৎ না থাকায় ভূতরে অন্ধকার গ্রাম মনে হত। কিন্তু যুগের তালে বদলে গেছে পরিবেশ। এখন মোটামুটি আবাসিক হোটেল, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, রেষ্টুরেন্ট ব্যবস্থাও ভালো হয়েছে। তবে উন্নয়নে ধারাবাহিকতায় বদলে যাচ্ছে এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশও। এখানে বোধয় কিছুটা নিয়ন্ত্রন দরকার সরকার বা সংশ্লিষ্টদের। দূর দূরান্ত দেশ-বিদেশ থেকে থানচিতে পর্যটকেরা যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঝর্ণা, পাথর, নদী দেখার জন্য ভিড় করছে। সেটি রক্ষায় যতœবান হওয়ার দাবি জানাচ্ছি সংশ্লিষ্টদের।
এ বিষয়ে থানচি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আতাউল গনী ওসমানী বলেন, থানচিতে মানুষ এসে এখন স্বাচ্ছন্দোবোধ করে। মোটামুটি সবধরণের সুবিধায় ভোগ করতে পারছে। থানচিতে পর্যটকদের সুবিধার্থে আরও অনেক কিছুই করার আছে। ইতিমধ্যে সরকারীভাবে উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডও চলমান রয়েছে। পর্যটকরা যতবেশি বেড়াতে আসবে, এই অঞ্চলের মানুষেরা অর্থনৈতিক ভাবে ততটায় স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কৃষির উন্নয়নে ইতিমধ্যে অনেকটায় বদলে গেছে থানচি।
