আরমান খান, লংগদু
রাঙামাটির লংগদুতে এক ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে দুস্থ মহিলা উন্নয়ন (ভিজিডি) কর্মসূচির চাল আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগিরা গত ২৫ এপ্রিল (রবিবার) উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাইনুল আবেদীন বলেন, ভিজিডির চাল আত্মসাতের একটি অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অভিযোগে জানা যায়, উপজেলার ভাসান্যাদম ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের সদস্য রফিুকুল ইসলাম ২০১৭ সাল হতে ২০২১ সাল পর্যন্ত চারজন দুস্থ মহিলার নামে ইস্যুকৃত ভিজিডির চাল আত্মসাত করে আসছে। যা দরিদ্র ওই মহিলারা এতদিন যাবৎ জানতেন না। অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয়, ফাতেমা খাতুন নামের এক মহিলার নামে ২০২১-২২ সালের জন্য বরাদ্দকৃত ভিজিডির তালিকায় তার ক্রমিক নং ১৮০। গত চার মাস যাবৎ তার চাল তিনি তুলতে পারেননি।
এছাড়াও ২০১৭-১৮ সালে বরাদ্দ ভিজিডির তালিকায় নাম ছিল মোছাঃ রেজিয়া খাতুন নামের এক মহিলার। যিনি ২০১৭ সালের মার্চ মাসে মারা যায়। স্বাক্ষর জাল করে মৃত ওই মহিলার ভিজিডির চাল ভোগ করেছেন অভিযুক্ত ইউপি সদস্য। এবং ২০১৯-২০ সালের ভিজিডি তালিকায় কহিনুর বেগম ও ফিরোজা খাতুন নামের আরো দুই দরিদ্র মহিলার চাল আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ইউপি সদস্য রফিকের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী ফিরোজা খাতুন বলেন, আমার স্বামী দুই সন্তানসহ আমাকে রেখে চলে গেছে। এরপর থেকে আমি অসহায় হয়ে পড়েছি। মানুষের গরু ছাগল লালন পালন করে জীবিকা নির্বাহ করেছি। ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করে একটা ভিজিডি কার্ড করেছিলাম। কিন্তু ভুলবশত কার্ডটি ৮নং ওয়ার্ডে না হয়ে ৯ওয়ার্ডের তালিকায় চলে যায়। এরপর ৯নং ওয়ার্ডের মেম্বার রফিকুলের কাছে গেলে তিনি তা অস্বীকার করেন। পরে আর আমি চাল তুলতে পারিনি। কয়েকদিন আগে ৮নং ওয়ার্ডের মেম্বার ইসমাঈল হোসেনের কাছে জানতে পারি আমার ভিজিডি কার্ড হয়েছিল। কিন্তু কার্ডের বিষয়টি রফিক মেম্বার গোপন করে আমার চাল আত্মসাত করেছে।
আরো এক ভুক্তভোগী ফাতেমা খাতুন গত বছরের শেষের দিকে ভিজিডি কার্ডের জন্য স্থানীয় ইউপি সদস্য রফিকুলের কাছ কাগজপত্র জমা দেন। এ বছরের শুরুতে কার্ড ইস্যু হলে মেম্বারের কাছে যান কার্ড আনতে কিন্তু কার্ড মেলেনি। মেম্বার জানিয়ে দেন তোমাদের কার্ড হয়নি। কিছুদিন আগে জানতে পারেন ফাতেমা খাতুনের নামে ভিজিডি কার্ড হয়েছে। এরপর মেম্বারের কাছে গেলে তিনি জানান কার্ড হইছে কিন্তু সমস্যা আছে এখন দেয়া যাবে না। ফাতেমা খাতুনের স্বামী মো. আলী বলেন, রফিক মেম্বার আমাদের কার্ড নিজের কাছে রেখে ভিজিডির চাল আত্মসাত করেছে।
এদিকে অভিযোগকারী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট দায়েরকৃত অভিযোগের অনুলিপি প্রদান করেন লংগদু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার নিকট। সম্প্রতি লংগদু থানা পুলিশের একজন কর্মকর্তা (এসআই) বিষয়টি তদন্ত করেছেন। এ বিষয়ে পুলিশের ওই কর্মকতা বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন আছে তদন্ত শেষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, ভিজিডি কার্ডের যাবতীয় কাজ অনলাইনে হয়েছে। আমাদের কোনো পরিবর্তন করার বা আত্মসাত করার সুযোগ নাই। চেয়ারম্যান নিজ হাতে সব কার্ড বিতরণ করেছেন। যদি কারো অভিযোগ থাকে তা চেয়ারম্যানকে বললে তিনি সঠিক জবাব দিতে পারবেন। আমার বিরুদ্ধে কার্ড আত্মসাতের যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা ভিত্তিহীন। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমুলক অভিযোগ।
এ বিষয়ে ভাসান্যাদম ইউপি চেয়ারম্যান হযরত আলী বলেন, আমার কাছে কেউ কোনো অভিযোগ নিয়ে আসেনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাতৃত্বকালীন ভাতা, ভিজিডি, নারীর দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণসহ নারীদের নানা বিষয়ে কাজ করে উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর। অভিযোগের বিষয়ে লংগদু উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা তরুন চাকমা বলেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) স্যার এ বিষয়ে তদন্তের দায়িত্ব আমাকে দিয়েছেন। আমরা তদন্ত করে দেখব। তদন্তে ইউপি সদস্য দোষী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভালনারেবল গ্রæপ ডেভেলপমেন্ট (ভিজিডি) কর্মসূচি বাংলাদেশের গ্রামীণ দুস্থ মহিলাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাস্তবায়িত একটি বৃহত্তর সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি। যেটি সম্পূর্ণরূপে আর্থ-সামাজিকভাবে দুস্থ পরিবার বিশেষত মহিলাদের উন্নয়নে কাজ করে। মহিলারা ওয়ার্ড ভিত্তিক ক্ষুদ্র দলের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ ভিজিডি কমিটির কর্তৃক নির্বাচিত হয়। ভিজিডি মহিলারা প্রশিক্ষণ প্যকেজ (প্রশিক্ষণ, সঞ্চয়, ঋণ) সেবা গ্রহণের পাশাপাশি ২৪ (চব্বিশ) মাস ধরে মাসিক ৩০ কেজি চাল খাদ্য সহায়তা পেয়ে থাকে। খাদ্য সহায়তা প্রাপ্তির ২৪(চব্বিশ) মাস সময়কালে মহিলারা অনুমোদিত এনজিওর মাধ্যমে জীবন দক্ষতা ও আয় বৃদ্ধিমূলক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকে।
