সেদিন সকালে অল্প অল্প বৃষ্টি হচ্ছিল। আমার স্বামী (নয়ন) তখন বাসায় মাত্র ঘুম থেকে উঠে। বাচ্চাদের সাথে দুষ্টুমি করছিল। তখন বাইরে থেকে কে যেন ডাক দেয়, ও নয়ন দা, নয়ন দা, হুদু তুই (নয়ন ভাই, কোথায় তুমি)। তখন তিনি (নয়ন) বাসা থেকে একটা শার্ট ও জিন্স পড়ে বের হয়ে গেল এভাবে গত বছর দুর্বৃত্তের হাতে মোটরসাইকেল চালক ও সদর যুবলীগ নেতা নুরুল ইসলাম নয়ন’র স্ত্রী জাহেরা খাতুন স্মরণ করে বলছিলেন শেষ বারের মতো কথা হয়েছিল সেদিন।
গত ১জুন লংগদু সদর থেকে মোটরসাইকেল ভাড়ায় নুরুল ইসলাম নয়ন খাগড়াছড়ি যাওয়ার পর বিকেলে খাগড়াছড়ি চার মাইল এলাকায় তার লাশ পাওয়া যায়।
নুরুল ইসলাম নয়ন’র স্ত্রী জাহেরা খাতুন সেই স্মৃতি মনে করে বলেন, ‘চার বছরের ছোট মেয়েটা প্রায় বলে মা, ‘বাবা কেন আসে না। বাবা কই? বাবাকে কল দাও।’ তখন কোন জবাব দিতে পারি না ওরে। ছেলেটার পড়ালেখা করানো এখন কঠিন হয়ে গেছে। আমার এক ছেলে এক ছোট মেয়ে নিয়ে কিভাবে আছি কেউ কোনদিন খবর রাখে নাই। বড় মেয়ের বিয়ে হওয়ার কারণে সে এখন শ্বশুর বাড়িতে থাকে। স্বামী ছাড়া আমার আর কোন আয় করার মত লোক নাই। একবেলা খেলে আরেক বেলা না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। দলীয়ভাবে যা কিছু পেয়েছি তা দিয়ে বিভিন্ন এনজিও ঋণ ছিল, বাজারে বাকি টাকা ছিল সেগুলো দিয়ে এখন একেবারে হাত খালি। সরকার যদি আমার কোন সরকারি চাকুরির ব্যবস্থা করে দিত তাহলে আমিসহ আমার দুইটা বাচ্চার জীবনটা বেঁচে যেত। না হয় এই ছোট দুইটা বাচ্চা নিয়ে কয়েকদিন পর না খেয়ে মরে যেতে হবে।
তিনি আরো বলেন, ‘আমার স্বামীর সাথে অত্র এলাকার পাহাড়ি-বাঙালি সবার সাথে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি অনেকদিন রাতে বাড়ি ফিরতো না, তখন ফোন দিলে বলতো অমুক পাহাড়ি বন্ধুর বাসায় থাকবে। আমি নিশ্চিন্ত থাকতাম। কিন্তু তাকে কেন মারলো এখনো জানি না। আমার স্বামীর কোনও শত্রু ছিল কিনা আমার জানা নাই। ওনার সাথে সবার ভালো সম্পর্ক ছিল জানতাম। যতটুকু জানতাম জেএসএস এর কালেক্টরের সাথে একটু কথা কাটাকাটি হয়েছিল ওনার মৃত্যুর কয়েকমাস আগে। কারণ তিনি লাইনের প্রধান ছিলেন। কি কারণে তাদের সাথে ঝামেলা তাও এখনো জানি না।
নয়নের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এভাবে পাহাড়িদের বাড়িঘরে আগুন দেয়ার ঘটনাকে আাপনি সমর্থন করেন কিনা? এমন প্রশ্নে নুরুল ইসলাম নয়ন’র স্ত্রী জাহেরা খাতুন বলেন, এখনো না। কেন হলো? কিভাবে হলো, আমি কিছুই জানি না। হতে পারে অনেকে তার মৃত্যুকে মেনে নিতে পারে নাই।
সেদিন সকালে আমার স্বামীকে গোসল দিয়ে বিদায় দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে শুনি আগুন আগুন। আমরা তখনও বাসায় ছিলাম। কি করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। সরকার তো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য বাড়ি দিচ্ছে। আমার জন্য তো সরকার কিছুই করছে না। আমি কিভাবে চলবো? সরকারের পক্ষ থেকে আমাকেও চলার ব্যবস্থা করে দিক। এটা সরকারের সাথে আমার দাবি।
উল্লেখ, গত বছরের ১জুন লংগদু সদর ইউনিয়নের যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মোটর সাইকেল চালক নুরুল ইসলাম নয়ন ভাড়া নিয়ে খাগড়াছড়ি যাওয়ার পর বিকেলে খাগড়াছড়ি চার মাইল এলাকায় তার লাশ পাওয়া যায়। পরের দিন ২ জুন তার লাশ নিয়ে জানাজার জন্য বাইট্টাপাড়া থেকে লংগদু উপজেলা পরিষদ মাঠে রওনা দিলে তিনটিলা পাড়ায় মিছিল আসার পর মিছিল থেকে হঠাৎ করে পাহাড়িদের বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় ৩টি গ্রামের ২১৩টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকার মোট ১৭৬টি বসতঘর নির্মাণ করার জন্য মোট ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। তার কাজ গত ৩০ মে নির্মাণ কাজ শুরু হয়।
