সুন্দর এই পৃথিবী যিনি সৃষ্টি করেছেন সে সৃষ্টিকর্তা তাঁর পছন্দ অনুসারে মানব জাতিকে বিভিন্ন সাজে সাজিয়েছেন। নারী কিংবা পুরুষ শুধু এতটুকু নই, তার পাশাপাশি তৃতীয় লিঙ্গ বা উভয় লিঙ্গ নামে পরিচিত কিছু মানুষকেও তিনিই সৃষ্টি করছেন। কিন্তু মানুষ সৃষ্টিকর্তার অন্য সকল সৃষ্টিকে সহজে গ্রহণ করে নিলেও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষগুলোকে মানুষ ভেবেও গ্রহণ করতে পারে না। সমাজ, দেশ, পরিবার-পরিজনদের থেকে তারা শুধুই বঞ্চনা ও ঘৃণা পেয়ে বড় হয়। বয়সের নানান সময়ে তারা শুধুই মানুষের কাছ থেকে ধিক্কার পেয়ে বড় হয়। কেউ তাদেরকে ভালোবেসে কাছে টেনে নেয় না। কিন্তু তারাও মানুষ, তাদেরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে, অধিকার আছে অন্য সকল মানুষের মত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার।
আসন্ন নির্বাচনের দিনে অনেক তৃতীয় লিঙ্গের মানুষই ভোট কেন্দ্রে যাবেন তাদের নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করার জন্য। কিন্তু তাদের জন্য ভোটের দিনে আলাদা কোন লাইনের ব্যবস্থা না থাকায় তাদের মনে প্রশ্ন জেগেছে ‘আমি কোন লাইনে দাঁড়াবো?’। ভোট প্রদানের অধিকার ও নবনির্বাচিত এমপি কাছে নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা হয় এমনই তিনজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সাথে।
তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ খোরশেদা বেগম বলেন, ‘আমাদের জন্ম বাংলাদেশে, আমরা বড় হয়েছি এখানেই, আমাদের সব কিছু এখানে। তাই আমরা নাগরিকত্ব চাই। আমাদেরকে নিয়ে নানান জনে নানান রকম কথা বলে, আমাদেরকে কেউ পাত্তা দেয় না, মানুষ বলেও কেউ মনেই করে না আমাদেরকে। সবার কাছে আমরা শুধু ঘৃণার পাত্র। এভাবে আমরা থাকতে চাই না। আমরা চাই আমাদেরকে চাকরি দেওয়া হোক। আমরা বাবা-মা এর সম্পদের ভাগ পাই না। আমার নিজের ভাইরা আমাকে আমার বাবার সম্পদের ভাগ দেয়নি। কারণ আমি দেখতে তাদের মত নই বলে। আমি আমার অধিকার নিশ্চিত চাই। সবার মত করে আমরাও স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকতে চাই।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদেরকে চেনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি কার্ড দেয়া হোক। অন্য সকল মানুষের মত করে আমরাও সকল সুযোগ-সুবিধা পেতে চাই।’
ঝিনুক বলেন, ‘আমি ছোট বেলায় মা বাবাকে হারিয়েছি, আমি পড়ালেখা করতে পারিনি। অন্য শিশুদের মত স্বাভাবিক নিয়মে বড় হতে পারি নি। আমি চাই আমাদের পড়ালেখার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হোক। আমরাও যেনো স্কুল-কলেজে গিয়ে পড়ালেখা করতে পারি। এছাড়া আমাদের বসবাসের জন্য স্থান ও কাজ করে খাওয়ার জন্য চাকরি যেনো আগামী দিনের নবনির্বাচিত এমপি নিশ্চিত করে দেয়।’
তৃতীয় লিঙ্গ মানুষগুলোর সর্দার নামে পরিচিত নয়ন তারা বলেন, ‘রাঙামাটিতে বর্তমানে প্রায় ৭০জন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ বাস করে। আমাদের থাকার কোনও স্থায়ী জায়গা নেই। যেখানে থাকি সেখানে মানুষ আমাদেরকে নানান ভাবে হয়রানি করে। অনেকে চায় না আমরা যেনো এখানে থাকি। তাই আমাদের ওপর নানানভাবে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয় এবং বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করে। ইতিমধ্যে রিজার্ভ বাজারে আমাদেরকে টাকা তোলা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এছাড়া মানুষ আমাদেরকে নানান ভাবে হেয় করে। তাই আমরা স্থায়ী ভাবে একটি নিদিষ্ট স্থানে বসবাসের জন্য জায়গা চাই আগামী দিনের এমপির কাছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা ভিক্ষুক নই। সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে ভিন্নভাবে তৈরি করলেও হাত-পা দিয়েছে। আমরা কিছু একটা করে খেতে পারি। রাঙামাটি পৌরসভার মেয়র আমাদেরকে চাকরি দিবে বলেও পরে সে বিষয়ে আর কোন খোঁজ খবর আমরা পাইনি। তাই আমরা চাই আমাদের যোগ্যতা অনুসারে আমাদেরকে চাকরির সুযোগ করে দেয়া হোক। আমরা দোকান থেকে এভাবে টাকা তুলে পেট চালাতে চাই না। মানুষের নানান কথা শুনতেও চাই না। সকল মানুষের মত করেই বেঁচে থাকতে চাই। তাই একজন মানুষের যে অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আমরাও সে অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে চাই, এমপি যেনো সে অধিকারগুলো নিশ্চিত করেন সে আশা রাখি।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি একজন ভোটার, আমি ভোট দিতে ৩০ ডিসেম্বর ভোট কেন্দ্রে যাবো। কিন্তু সেখানে তো দুইটি লাইন থাকে পুরুষ ও নারী। আমাদের জন্য আলাদা কোন লাইন নেই। তাই আমি জানি না- ‘আমি কোন লাইনে দাঁড়াবো?’ তবে আমি বোরকা পড়ে যাবো। নারীদের লাইনে দাঁড়াবো, যাতে কেউ আমাকে চিনতে না পারে। আমাকে দেখলে নানান জনে নানান কথা বলবে এবং পাশের আপারাও অস্বাভাবিক হয়ে যাবে। তাই আমি কারো বিরক্তের কারণ হতে চাই না।’
