যে সম্পর্ক আর হৃদ্যতার উপর ভর করে ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার মাত্র দেড়বছরের মধ্যেই ২৪ বছরের সশস্ত্র লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে অস্ত্র সমর্পন করে ফের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছিলো সাবেক শান্তিবাহিনীর গেরিলারা,দুই দশক পর সেই সম্পর্কের হদ্যতা কিংবা উঞ্চতার কিছুই অবশিষ্ট নেই ! যে চুক্তির মাধ্যমে ফিরে এসে শান্তিবাহিনী থেকে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’নামে প্রকাশ্যে রাজনীতির মাঠে নেমেছিলো সাবেক এই গেরিলারা,সেই ‘চুক্তি’ই এখন সেদিনকার চুক্তি সাক্ষরকারি দুই দলের সম্পর্কের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চুক্তি বাস্তবায়ন কতটুকু হয়েছে,এ নিয়ে দুই দলের পরস্পরবিরোধী দাবি আর কর্মসূচীর জেরে ধীরে ধীরে ভালোবাসার সম্পর্ক ফিকে হয়ে আসার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের হত্যা,হত্যাচেষ্টা এবং দলত্যাগে বাধ্য করার পর সম্পর্কের চরম অবনতি হয়েছে।
এতোদিন মাঠে ময়দানেই দুই দলের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যেই পরস্পরের বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ ও চরিত্রহনন করলেও গত ডিসেম্বরেই আওয়ামীলীগের একের পর এক নেতাকে হত্যা ও হত্যাচেষ্টা,দলত্যাগে বাধ্য করানোর পর দুই দলের সম্পর্কের টানাপোড়ের প্রকাশ্যেই সরাসরি বিবাদে রূপ নেয়। এইসব হত্যা,হত্যাচেষ্টা ও চাপ প্রয়োগের জন্য প্রকাশ্যে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতিকে দায়ি করে রাঙামাটিতে হরতালও পালন করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ। শুধু তাই নয়,জনসংহতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য নিয়ে মাঠে নামে আওয়ামীলীগ এবং জনসংহতির নৃশংসতার চিত্র নিয়ে ব্যাপক পোস্টারিংও করা হয়েছে জেলা জুড়ে আওয়ামীলীগের তরফে। জনসংহতি সমিতি বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি,চুক্তি বাস্তবায়ন না করে জনগণের দৃষ্টি ঘোরাতেই ভিত্তিহীন দাবি করছে আওয়ামীলীগ।
অন্যদিকে আওয়ামীলীগের দাবি,জনসংহতি সমিতির একঘুয়েমি,অসহযোগিতা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের নজিরবিহীন সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির কারণেই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
প্রেক্ষিত ডিসেম্বর : ১৯৯৭ থেকে ২০১৭
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি,যা দেশে বিদেশে শান্তিচুক্তি নামেই অভিহিত হয়েছে,তার সাক্ষর হয়। পার্বত্যবাসির পক্ষে জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও শান্তিবাহিনীর কমান্ডার জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা সন্তু এবং সরকারের পক্ষে তৎকালিন জাতীয় সংসদের চীফ হুইফ আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ চুক্তিতে সাক্ষর করেন। চুক্তির মাধ্যমে ২৪ বছরের গেরিলা জীবনের অবসান ঘটিয়ে অস্ত্র সমর্পন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে ১৯০০ গেরিলা। ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা হয় দেড়লাখ উদ্বাস্তুকে। যাদের সরকারি উদ্যোগেই পুনর্বাসন করা হয় এবং এখনো দেয়া হচ্ছে রেশন সুবিধা। গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ,যার চেয়ারম্যান এখনো সন্তু লারমা এবং পুনর্গঠিত হয় পার্বত্য তিন জেলা পরিষদ। সেই সাথে পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন,শরনার্থী বিষক টাস্কফোর্স। বাস্তবায়ন শুরু হয় চুক্তির বিভিন্ন ধারা উপধারা।
কিন্তু চুক্তি সাক্ষরের মাত্র তিনবছর পর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগকে সমর্থন দেয়নি জনসংহতি সমিতি,বরং প্রকাশ্যে নির্বাচন বর্জন করে নীরবে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা অবস্থান বিএনপির প্রার্থী মনিস্বপন দেওয়ানের পক্ষে। নির্বাচনে পরাজিত হয় আওয়ামীলীগ। এই অসহযোগিতাই দুই দলের সম্পর্কে প্রথম বিষফোড়া হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অনেকটাই ঢিমেতালে চলে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সরাসরি অংশ নেয় জনসংহতি সমিতি এবং পরাজিত হয়। কিন্তু জয়ী আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এসেই শুরু করে চুক্তি বাস্তবায়নের কাজ। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াটিই চলে ধীরলয়ে। ফলে চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে নানা কর্মসূচী পালন শুরু করে জনসংহতি সমিতি। দুই দলের পুরনো সম্পর্ক আর আগের মতো এগোয়নি,ফলে ২০১৪ সালের নির্বাচনে আবারো পৃথকভাবে মুখোমুখি হয় দুইদল। বিএনপিহীন নির্বাচনে জনসংহতির হাতির কাছে পরাজিত হয় স্থানীয় নৌকা। এই পরাজয়ের জন্য জনসংহতির সশস্ত্র তৎপরতা ও ভোটারদের উপর চাপ প্রয়োগের প্রকাশ্য অভিযোগ আনে আওয়ামীলীগ,যার সত্যতাও ছিলো অনেকাংশেই। ফলে দুরত্ব আরো বাড়তে মুরু করে পুরনো দুই বন্ধুর। ভালোবাসা পরিণত হয় বিবাদে। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বর মাঠে চুক্তির মধ্য দিয়ে দুই দলের ভালোবাসা প্রমাণিত হলেও ২০১৭ সালে চুক্তির দুই দশক পর সেই ভালোবাসাই পরিণত হয়েছে জিঘাংসায়।
পাল্টাপাল্টি অভিযোগ !
২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর আওয়ামীলীগ আর জনসংহতি সমিতির সম্পর্কে স্বাভাবিকলয়ে এগোয়নি। আওয়ামীলীগ চুক্তির ৭২ টি ধারার মধ্যে ৪৮ টি পূর্ণ বাস্তবায়িত এবং ১৫ টি আংশিক বাস্তবায়িত,বাকীগুলো বাস্তবায়নাধীন বলে দাবি করলেও জনসংহতি সমিতির দাবি চুক্তির ধারাগুলোর মধ্যে মাত্র ২৫ টি বাস্তবায়িত হয়েছে এবং এর মধ্যে মৌলিক ধারাগুলো একটিও বাস্তবায়িত হয়নি। এমন অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই গত ২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তির দুই দশক পূর্তিতে ঢাকায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে আবার পাহাড়ে আগুন জ্বলবে বলে হুঁশিয়ার করেন সন্তু লারমা। এর দুইদিন পর থেকে ৫ ডিসেম্বর রাঙামাটি জেলার জুরাছড়িতে আওয়ামীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দু চাকমাকে গুলি করে হত্যা,বিলাইছড়িতে আওয়ামীলীগের সহসভাপতি রাসেল মার্মাকে হত্যাচেষ্টা,রাঙামাটি শহরে মহিলা আওয়ামীলীগের সহসভাপতি ঝর্ণাখীসাকে হত্যাচেষ্টাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে আওয়ামীলীগের পাহাড়ী নেতাকর্মীদের মারধর,হুমকি এবং দলত্যাগে বাধ্য করা হয়। এক ডিসেম্বরেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আওয়ামীলীগ ছাড়তে বাধ্য হন প্রায় পাঁচ শতাধিক পাহাড়ী। প্রকাশ্যে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগের কথা বললেও জনসংহতির হুমকির কারণেই দল ছাড়ছেন তারা এমন কথা স্বীকার করেছেন গণমাধ্যমকর্মীদের কাছেই। যদিও জনসংহতি সমিতি এই দাবি বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।
কঠোর অবস্থানে আওয়ামীলীগ
একের পর এক নেতাকর্মীকে হত্যার প্রতিবাদে হঠাৎ করেই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় দীর্ঘদিন কার্যত চুপচাপ থাকা আওয়ামীলীগ। জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র সন্ত্রাসের প্রতিবাদে রাঙামাটি জেলাজুড়ে হরতাল পালন এবং নিয়মিত কর্মসূচী দিতে শুরু করে দলটি। দলের পক্ষ জনসংহতি সমিতির নৃশংসতার ছবিসহ বের করা হয় রঙিন পোস্টার। এসব পোস্টারে সরাসরি জনংসতি সমিতির বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র ধারণের যে পোস্টারের কারণে জেলাজুড়ে শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। পোস্টারে লেখা হয় ‘ জেএসএস সন্ত্রাসীদের এ কেমন নৃশংসতা’ ‘জেএসএস অবৈধ অস্ত্রধারি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলুন’,সাথে হামলায় আহত নিহত নেতাদের রক্তাক্ত ছবিও আছে পোস্টারে। সাধারন মানুষও এসব পোস্টার দেখে জনসংহতির উপর ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে চিন্তায় পড়ে যায় জনসংহতি সমিতিও। এরই মধ্যে এই পোস্টারের বিরুদ্ধে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে সংগঠনটি।
গত রবিবার পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা প্রেরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে-‘সম্প্রতি রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগ কর্তৃক প্রচারিত ও প্রকাশিত “জেএসএস সন্ত্রাসীদের এ কেমন নৃশংসতা!!” শিরোনামে একটি পোস্টার পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির দৃষ্টিগোচর হয়েছে। উক্ত পোস্টারে গত ৫ ডিসেম্বর বিলাইছড়িতে ‘রাসেল মারমাকে পাশবিক ও নিষ্ঠুর নির্যাতন’ ও জুরাছড়িতে ‘অরবিন্দু চাকমাকে খুন’ এবং ৬ ডিসেম্বর ‘ঝর্ণা চাকমাকে পাশবিক হামলার’ ঘটনায় জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করা হয়। ভিত্তিহীন ও বানোয়াট অভিযোগ এনে জনমতকে বিভ্রান্ত ও জনসংহতি সমিতির ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতে রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগ কর্তৃক এ ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক পোস্টার প্রচার ও প্রকাশের ঘটনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে।’
বিবৃতিতে ‘এ ধরনের অবিমৃষ্যকারী রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার থেকে বিরত থাকার জন্য এবং রাজনৈতিক হীনউদ্দেশ্যে প্রকাশিত এই ষড়যন্ত্রমূলক পোস্টার প্রত্যাহার করার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগকে আহ্বান জানিয়েছে’ জনসংহতি সমিতি।
তবে আওয়ামীলীগ এটাকে নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদ হিসেবেই দেখছে। রাঙামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক হাজী মুছা মাতব্বর বলেছেন, জেএসএস এর ব্যাপক অবৈধ অস্ত্র,সন্ত্রাস, চাঁদাবাজির পরও আমরা দীর্ঘদিন সব সহ্য করে গেছি, কিন্তু এখন আমাদের একের পর এক নেতা কর্মীকে হত্যা ও হত্যাচেষ্টা এবং দলত্যাগে বাধ্য করার পর স্বাভাবিকভাবেই আমরা চুপ করে থাকতে পারিনা। তাই আমরাও পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সকল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবিতে কর্মসূচী গ্রহণ করেছি এবং জনমত গঠন করতে পোস্টারিংসহ নানান পদক্ষেপ নিচ্ছি।’
