মাত্র ২৪ ঘন্টা আগেই নিজ ভাগিনার অপ্রাপ্তবয়স্ক এক কিশোরী কণ্যাকে ‘অপহরণ ও বিয়ে’র ঘটনার সাথে নিজের কোন সম্পৃক্ততা নেই দাবি করা নিয়াদ খানের মামা ও আওয়ামীলীগ নেতা পরচয়দানকারি লিয়াকত আলী খান ঠিক বিপরীত ভাষ্য নিয়ে হাজির হয়েছেন।
গত রবিবার রাঙামাটিতে গত ৮ সেপ্টেম্বর অপহৃত আজরা আতিকা আনান এর পিতা দেলোয়ার হোসেন ও মা উর্মিলা আলম এক সাংবাদিক সম্মেলনে তাদের মেয়ের অপহরণ ঘটনার মূল ক্রীড়নক ও পৃষ্ঠপোষক হিসেকে অপহরণকারি নিয়াদ খানের মামা লিয়াকত আলী খান,আব্দুল মালেক খান ও আব্দুল খালেককে ও তার পিতা নেসার আহমেদকে দায়ি করে শহরের একটি রেস্টুরেন্টে সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে তারা অভিযোগ করেছেন, ‘নিজের অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে হারিয়ে আমি যখন পাগলপ্রায়,সেইসময় অপহরণকারি নিয়াদ খানের মামা লিয়াকত আলী খান ও আব্দুল মালেক খান আমাকে ফোন করে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল,হুমকি এবং ‘পারলে কিছু করিস’ বলে দম্ভ প্রকাশ করে এবং লিয়াকত আলী খান আমার আপন ছোট ভাই সাইফুল আলম রাশেদকে ‘গুম করে ফেলা’র হুমকি দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে তথাকথিত সমঝোতার জন্য হুমকি দিচ্ছে,অন্যথায় আমাদের পুরো পরিবারকে ‘জেলের ভাত খাওয়ানো এবং নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। বিষয়টি আমরা আইনশৃংখলাবাহিনীকেও অবহিত করেছি। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমার মেয়ের ছবি ছড়িয়ে দিয়ে আমাদের সামাজিকভাবেও বিব্রত করার চেষ্টা করছে। নিজেকে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা দাবি করে লিয়াকত আলী খান আইনশৃংখলাবাহিনীর সদস্যদের সাথে দুর্ব্যবহার করে এবং আসামী গ্রেফতার না করার জন্য নানাভাবে চাপ তৈরি করছে। সে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে বলেছে,আমাদের মেয়ে তার কাছে আছে,হ্যাডম থাকলে যেনো কেউ উদ্ধার করে। ’
আনানের পিতা মাতার সংবাদ সম্মেলনের পর সাংবাদিকরা লিয়াকত আলী খানকে ফোন করলে তিনি এই ঘটনার সাথে জড়িত নন এবং তার ভাগিনা ও আনান কোথায় আছেন তিনি জানেন না বলে দাবি করেছিলেন। একই সাথে তিনি জন্মনিবন্ধন সনদের তারিখ মেয়ের মায়ের বিয়ের আগে হওয়ার জন্য ১৬ বছরবয়সী আনানকেই দায়ি করেছিলেন (তার বক্তব্যর রেকর্ড সাংবাদিকদের কাছে সংরক্ষিত আছে)। শুধু তাই নয়, তিনি কোন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করছেন না বলেও জানিয়েছেন।
কিন্তু এই বক্তব্য প্রদানের ২৪ ঘন্টা পরই সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ঠিক উল্টো অবস্থান নিয়ে আনানের পিতামাতার চরিত্র নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। নিজের ছাত্রলীগের সাবেক পরিচয় ও বর্তমানে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি পরিষদ এর চট্টগ্রাম মহানগর সাধারন সম্পাদক পরিচয় ব্যবহার করে কম্পিউটারে বানানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিজের অপহরণকারি ভাগিনার পক্ষে সাফাই গিয়ে লিয়াকত আলী খান বলেছেন, ‘গত ১৫ সেপ্টেম্বর বিকাল ৩ ঘটিকায় আজরা আতিকা আনান নিজেকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে প্রমাণের জন্য তার বাড়ী থেকে আনা জন্ম নিবন্ধন সনদ সাংবাদিকসহ বিশিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার সামনে উপস্থাপন করেন এবং নিজেই দাবী করেন আমার ভাগিনা নিয়াত আহম্মদ কে সেই নিজেই প্রয়োজনে আত্মহত্যা করার হুমকি দিয়েই চট্টগ্রামে নিয়ে আসে এবং আগ্রাবাদ কাজী অফিসে নিজেরাই তাদের জন্মসনদ প্রদর্শনপূর্বক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। আজরা আতিকা আনান সাংবাদিকদের কাছে বলেন ঈদুল আজহার ছুটিতে বাড়ীতে আসার পর থেকে আমাকে বাড়ীতে আটকিয়ে রাখেন এবং নিয়াত আহম্মদ কে স্ব-ইচ্ছায় ত্যাগ না করলে অক্টোবর ২০১৯ এর মধ্যে তাদের পছন্দনুযায়ী পাত্রকে বিয়ে দিতে বাধ্য হবেন।’
লিয়াকত আলী খান আরো বলেছেন, ‘গতকালের অনলাইনে ও আজকের প্রকাশিত পত্রিকার বক্তব্য যদি সত্যি হয় আজরা আতিকা আনান কি তাহলে তাদের অবৈধ সম্পর্কের ফসল। তিনি আরো বলেন বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকা ও বাস্তবতায় আরো দেখা গেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সমাজের প্রতিনিধিরা ‘‘মায়ের বিয়ের আগেই মেয়ে বা ছেলের জন্ম’’ এই ধরনের অনেক অভিযোগের নিস্পত্তি করেছেন এবং কাবিননামার মাধ্যমে তা স্থায়ীভাবে রেজিস্ট্রি করিয়েছেন।’

শুধু তাই নয়,সাবেক ছাত্রলীগের পরিচয় ব্যবহার করা এই ব্যক্তি তার পাঠানো বিবৃতিতে আরো বলেছেন, ‘যেহেতু আমি রাজনীতি করি তাই রাঙ্গামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুসা মাতব্বর সাহেব কে ফোন করে আমি বলেছিলাম ছেলে মেয়ে দুইজনই আওয়ামী পরিবারের। যদি সম্ভব হয় তিনি যেন দুই পরিবারের সদস্যদের ডেকে উদ্যোগ নেন। ’
অপ্রাপ্তবয়স্ক বিয়ের পক্ষে সাফাই গেয়ে এই প্রবীণ বিবৃতিতে আরো বলেছেন, ‘যেহেতু নিয়াদ এবং আনান দুই জনই তাদের প্রদর্শিত জন্মসনদ অনুযায়ী প্রাপ্ত বয়স্ক। তাই বাংলাদেশ সংবিধান মোতাবেক স্বামী ও স্ত্রী হিসেবে নিজেদের মধ্যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে কোন বাধা নেই। ’
অপহরণ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীকে বিয়ের মামলায় অভিযুক্ত নিয়াদ খানের আওয়ামীলীগের নেতা পরিচয়দানকারি মামা লিয়াকত আলী খানের বিবৃতি প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে অপহৃত আনানের মামা ও রাঙামাটি জেলা ছাত্রলীগের সিনিয়র সহসভাপতি সাইফুল আলম রাশেদ বলেন, ‘লিয়াকত আলী খান একজন বদ্ধ উম্মাদ ও ক্রিমিনাল। সেই এই অপহরণ ঘটনার মাষ্টারমাইন্ড। আমরা তাকেও আইনের আওতায় আনার জন্য আইনশৃংখলাবাহিনীকে অনুরোধ জানিয়েছি। চট্টগ্রাম কিংবা কোথাও আওয়ামীলীগের কোন কমিটিতে না থেকেও সে আওয়ামীলীগের পরিচয় ব্যবহার করে এই অপকর্মের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করছে।’
প্রসঙ্গত, রাঙামাটি শহরের লেকার্স পাবলিক স্কুল থেকে এবছরই এসএসসি পাশ করাও এবছরই রাজধানীর লালমাটিয়া কলেজে ভর্তি হওয়া দেলোয়ার হোসেন ও উর্মিলা আলম দম্পতির জৈষ্ঠ্য কণ্যা আজরা আতিকা আনান গত ৮ সেপ্টেম্বর রাঙামাটি শহরের হ্যাপির মোড় এলাকায় প্রাইভেট পড়তে গিয়ে নিখোঁজ হন। এই ঘটনার পর মেয়েটির পরিবার থানায় শহরের কাঠালতলি এলাকার নিয়াদ খান,নেসার আহমেদ সহ কয়েকজনকে আসামী করে একটি অপহরণ মামলা করে। অপহরণের ৮ দিন পর ১৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে কিশোরীটিকে দিয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলন করানো হয়,তখন তার পাশে অভিযুক্ত নিয়াদ খান ও তার মামা লিয়াকত আলী খানও ছিলেন। তখন উপস্থিত চট্টগ্রামের সংবাদ কর্মীদের ভূয়া জন্মসনদ এর কপি সরবরাহ করে কিশোরীটি নিজেকে প্রাপ্তবয়স্ক দাবি করে অভিযুক্ত ওই তরুণকে বিয়ে করেছে জানিয়ে বিয়ের স্বীকৃতি দাবি করে আত্মগোপনে চলে যায়।
