পার্বত্য শহর রাঙামাটির সবচে ‘বনেদী’ আর ‘অভিজাত’ ক্লাব হিসেবে পরিচিত,ফ্রেন্ডস ক্লাবের নতুন স্থাপনা নির্মিত হচ্ছে কাপ্তাই হ্রদ দখল করে ! এই দখলের কারণে ‘ঝুঁকিতে পড়বে’ শহরের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ‘তবলছড়ি নৌযান ঘাট’।
জেলার অন্যতম উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান পার্বত্য রাঙামাটি জেলা পরিষদের অর্থায়নেই নির্মিত হচ্ছে এই ক্লাবের বর্ধিত ভবন। হ্রদের উপর নির্মাণাধীন এই ভবন নির্মাণে মানা হচ্ছেনা কোন নিয়ম, এমনকি রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের নিষেধের পরও নির্মাণ কাজ অব্যাহত রাখা হয়েছে।
অথচ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সারাদেশেই সব জেলাতে নদী-খাল দখল মুক্ত করার কাজ অব্যাহত হচ্ছে। খোদ রাজধানীর কাছে তুরাগ পাড় এবং রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীবর্তী অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলছে সেখানকার মানুষ। এমন সময়ে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে প্রশাসনের ‘নাকের ডগায়’ কাপ্তাই হ্রদ দখল করে এমন ক্লাব নির্মাণে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তবলছড়ি টেক্সটাইল মার্কেটের পিছনে অবস্থিত ক্লাবটি তার নিজস্ব জায়গা ফেলে কাপ্তাই লেকের মাঝখান থেকে এ নতুন ভবনটি তুলছে। ইতোমধ্যে পাইলিং শেষ করে দ্রুত কাজ করে যাচ্ছে। ক্লাব সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পাঁচ তলা ভবনটি বোট ক্লাব ও কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ফ্লোর হবে ৭০০০ স্কয়ার ফিট। জেলা প্রশাসন থেকে এমন ভবন নির্মানে বাধা দিলেও ক্লাব এবং জেলা পরিষদ সে নিষেধাজ্ঞা আমান্য করে নির্মাণ কাজ চলমান রেখেছে বলে জানা গেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ রাঙামাটি জেলার পরিষদের অর্থায়নে ইতোমধ্যে (২০১৮-১৯) ও (২০১৯-২০) অর্থ বছরে প্রায় দুই কোটি টাকা শেষ হয়ে গেছে এই নির্মাণ কাজে। ক্লাবটি তৈরীতে আরো অনেক টাকার বরাদ্দ প্রয়োজন বলে জানিয়েছে পরিষদ সংশ্লিষ্টরা। মুলত শুকনো মৌসুমে যখন হ্রদের পানি কমে যায় তখনই ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। ভবন নির্মানের কাজটি করছেন জসিম নামের একজন ঠিকাদার।
রাঙামাটি পৌর নাগরিক অধিকার সংরক্ষন কমিটির সদস্য সচিব মো: বখতেয়ার উদ্দিন বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে নদী খাল সব দখলমুক্ত করার কথা বলছেন, সেখানে কি করে কাপ্তাই হ্রদ দখল করে ক্লাব নির্মান করা হয়, তাও আবার সরকারি অর্থায়নে সেটা বুঝতে পারছি না।’ অতি দ্রুত ভবনের নির্মাণ কাজ বন্ধ করে হ্রদকে দখলমুক্ত করার আহবান জানান তিনি।
রাাঙমাটি পৌরসভার সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর পুলক দে বলেন, এতোদিন তবলছড়ির দিকের হ্রদের অংশটা ভালোই ছিলো, কিন্তু ফ্রেন্ডস ক্লাব যেভাবে হ্রদ দখল করে ভবন তৈরী করছে, তাতে অন্যরা সবাই এখন দেখা যাবে হ্রদ দখল করে বাড়ি তৈরী করবে, তখন আমাদের আর কিছু বলার থাকবে না। কারণ তখন তারা সবাই ফ্রেন্ডস ক্লাবের উদাহরণ দিবে। একই সাথে সকল প্রশাসনের সামনেই এমন ক্লাব কিভাবে নির্মাণ হয় সেটি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই কাউন্সিলর।
পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাহী প্রকৌশলী বিরল বড়ুয়া বলেন, বরাদ্দ আনুযায়ী আমাদেরকে ক্লাব নির্মাণের যে জায়গা দেখিয়ে দেয়া হয়েছে সে স্থানেই নির্মান কাজ পরিচালনা করছি। সেটি খাস বা বন্দোবস্তি সেটা আমরা দেখি নাই।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশিদ বলেন, আমরা আমাদের কাজ করেছি। ইতোমধ্যে তাদেরকে লেক থেকে খুঁটি সড়িয়ে ফেলতে বলেছি। তারা কথা দিয়েছেন, লেক থেকে খুঁটি সরিয়ে ফেলবেন। ক্লাবটি সরকারি অর্থ দিয়ে হ্রদের এমন জায়গায়, কিভাবে নির্মাণ হয়, তার উত্তর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দিতে পারবে।
এই ব্যাপারে কথা বলার জন্য যোগাযোগ করা হলে, ফ্রেন্ডস ক্লাবের সাধারন সম্পাদক ওয়াশিংটন চাকমা, ‘ব্যস্ত আছি, পরে ফোনে কথা বলব’ বলেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
প্রসঙ্গত, ১৯৬০ সাল প্রমত্তা কর্ণফুলি নদীতে বাঁধ দিয়ে দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এর ফলে পানির নীচে তলিয়ে যায় রাঙামাটি শহর সহ বিস্তির্ণ এলাকা। সৃষ্টি হয় কাপ্তাই হ্রদের। রাঙামাটি জেলা শহরের সাথে অন্তত সাতটি উপজেলার যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম এখন এই হ্রদ। শুধু তাই নয়,শহর ও দূর পাহাড়ের হ্রদবর্তী মানুষের খাবার ও ব্যবহার্য পানির প্রধান উৎসও এই হ্রদ। সাম্প্রতিক সময়ে হ্রদের পাড়ের বিস্তির্ণ এলাকা দখল করে নির্মিত হচ্ছে বিপুল সংখ্যক অবৈধ স্থাপনা।
