ঝুলন দত্ত, কাপ্তাই ॥
১৯৭১ সালে যুক্তরাজ্যের ব্যাপ্টিস্ট মিশনারী সোসাইটি (বিএমএস) এর প্রোগাম অফিসার মিস শু হেডলাম নামক এক বিদেশিনী সর্বপ্রথম আন্ডার ফাইভ কর্মসূচির মাধ্যমে কাপ্তাই উপজেলা চন্দ্রঘোনা মিশন হাসপাতালে সামাজিক স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম শুরু করেন। প্রকল্পের মাধ্যমে পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের পুষ্টি ও টিকা প্রদান কার্যক্রম এবং গর্ববতী ও প্রসুতি মায়েদের মাঠ পর্যায়ে সেবা প্রদান কার্যক্রম শুরু করেন। সেইসময় কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনা, কাপ্তাই ও রাইখালী ইউনিয়ন এবং পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার চন্দ্রঘোনা-কদমতলী ও মরিয়মনগর ইউনিয়নে এই কার্যক্রম শুরু করা হয়। মাত্র আটজন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়ে এই কার্যক্রম শুরু হলেও বর্তমানে ৭১ জন স্বাস্থ্য সেবিকা ও ১৪ জন সুপারভাইজার/ফ্যাসিলিটের নিয়ে কাপ্তাই উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন এবং রাঙ্গুনিয়া উপজেলার চন্দ্রঘোনা-কদমতলী ইউনিয়নে প্রতিটি বাড়ি ও জনগণের দোরগোঁড়ায় স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
কমিউনিটি হেলথ প্রোগামের প্রোগাম ম্যানেজার বিজয় মারমা জানান, এই সামাজিক স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, ম্যালেরিয়া রোগ নিয়ন্ত্রণে করণীয়, স্বাস্থ্য সচেতন কার্যক্রম, সরকারি টিকা প্রদান কার্যাক্রমে সহায়তাকরণ, গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও নার্সদের কাছ থেকে সেবা গ্রহণে উৎসাহিত করা, নারীদের উন্নয়ন বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ প্রদানসহ আত্মনির্ভরশীল হবার জন্য তাদের সঞ্চয় মনোভাব সৃষ্টি করার জন্য উৎসাহমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে।
তিনি আরোও জানান, এই কর্মসূচির মাধ্যমে কাপ্তাই ইউনিয়নের সবচেয়ে দুর্গম বারুদগোলা মৌজা, হরিণছড়া পাংখোয়া পাড়া, রাইখালী ইউনিয়নের দুর্গম পানছড়ি মৈদং, সীতাপাহাড় এবং চিৎমরম ইউনিয়নের দূর্গম আড়াছড়ি, চাকুয়া ও পেকুয়া পুনর্বাসন এলাকায় আমাদের মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
সামাজিক স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র হতে সেবা গ্রহণকারী রাইখালীর মাইনু মারমা, মনুচিং মারমা, বারুদগোলার কালাচান চাকমা জানান, চন্দ্রঘোনা মিশন হাসপাতালের কমিউনিটি হেলথ প্রোগামের মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ করেছি এবং তাদের বিভিন্ন অবহিতকরণ সভায় অংশ নিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা সম্পর্কে জানতে পেরেছি।
কমিউনিটি হেলথ প্রোগামের সুপারভাইজার মাসাং মারমা জানান, দুর্গম অঞ্চলে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার জন্য আমরা স্বাস্থ্য সেবীকাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা, উপকরণ সরবরাহসহ প্রতিনিয়ত নানা পরামর্শ প্রদান করে আসছি।
চন্দ্রঘোনা মিশন হাসপাতালের পরিচালক ডা. প্রবীর খিয়াং জানান, কাপ্তাই উপজেলার স্বাস্থ্য সেবার ক্ষেত্রে কমিউনিটি হেলথ প্রোগামের ভূমিকা প্রশংসনীয়। আমাদের স্বাস্থ্য কর্মীরা শুধুমাত্র স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে না, সামাজিক অন্যান্য কর্মকান্ডে বিশেষ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ে যখন অন্যান্য পেশাজীবি লোকজন ভয়ে আতংকিত হয়ে ঘরে বসে ছিল সেই সময়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা ন্যুনতম সুরক্ষা নিয়ে ঘরে ঘরে গিয়ে স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দিয়েছেন। এইছাড়া বাল্যবিবাহ, নারী শিক্ষা, বিবাহ রেজিস্ট্রেশন ইত্যাদি সচেতনতা বিষয়ে আমাদের কর্মীরা প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন।
কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনতাসির জাহান জানান, পার্বত্যঞ্চলে অনেক দুর্গম এলাকার লোকজন যারা সদর কিংবা কমিউনিটি ক্লিনিকে এসে স্বাস্থ্য সেবা নিতে পারে না, সেইসব এলাকায় গিয়ে সামাজিক স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মীরা স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন।
কাপ্তাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাসুদ আহমেদ চৌধুরী জানান, সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলে চন্দ্রঘোনা কমিউনিটি হেলথ প্রোগামের স্বাস্থ্যকর্মীরা স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন। পাশাপাশি তাঁরা আমাদের অনেক কাজে বিশেষ করে টিকা প্রদান কার্যক্রম এবং কমিউনিটি ক্লিনিকসমূহে স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যক্রমে তাঁরা সহযোগিতা করে আসছেন।
