অদিতি আফ্রোদিতি
এখনো ঘুমঘোরে দুর অতীতে ফিরে যান সুজিত কুমার দাশ। জীবনের ফেলে আসা সুবর্ণসময়ে সুর আর সঙ্গীতেই কাটতো যার দিনমান,সেই একই মানুষের জীবন কাটছে এখন নির্বাক বিষন্নতায়,জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অথচ একটা সময় পার্বত্য শহর রাঙামাটির সংস্কৃতি অঙ্গনে অপরিহার্য মুখ ছিলেন তিনি। দীর্ঘসময় ধরে এই শহরে সংস্কৃতি চর্চা ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সত্ত্বেও ‘কিছু ভুল কিছু অনুযোগ অভিযোগ’ তার জীবনকে যেমন বিপন্ন করে দিয়েছিলো,তেমনি তিনিও ভুগেছেন নিদারুন কষ্ট যন্ত্রনা অপমান গঞ্জনায়। কিন্তু হাল ছেড়ে দেননি ‘অপবাদ’ আর ‘অন্যায় চাকুরিচ্যুতির প্রতিবাদ’-এ লড়াই করেছেন পুরোটা জীবনই। এখন পড়ন্ত সময়ে রোগশোক যখন বাসা বেঁধেছে শরীরে,তখন অসহায় নি:স্ব রিক্ত শিল্পী সুজিত এখন নির্বাক ! সংসারের টানাপোড়েন, আশেপাশের মানুষের অবহেলা আর জীবনযন্ত্রনা কি তাকে তবে ‘স্তব্ধ’ করে দিলো সারাজীবনের জন্য ! কে জানে ! নিয়তির হাতেই সমর্পিত জীবনে,এখন আর অনুযোগ অভিযোগ জানানোর ক্ষমতাও যে হারিয়েছেন এই প্রবীণ শিল্পী !
কে এই সুজিত কুমার দাশ ?
রাঙামাটির সংস্কৃতি অঙ্গণের বেশ চেনা মুখ সুজিত। রাঙামাটি ও চট্টগ্রাম বেতারের প্রথম শ্রেণীর নিয়মিত সঙ্গীত শিল্পী এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের শিল্পী হিসেবে খ্যাতিও ছিলো বেশ। রাঙামাটি বেতারে সুরকার ও গীতিকার হিসেবেও ছিলেন তালিকাভূক্ত। তার সুরে চাকমা গানের একাধিক এ্যালবামও বের হয়েছিলো। সেই সময় সঙ্গীত বিষয়ক দেশের একমাত্র সাময়িকী ‘সরগাম’ এর রাঙামাটি প্রতিনিধিও ছিলেন তিনি। সত্তরের দশকের শেষে ১৯৭৯ সালে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউটে নজরুল সঙ্গীত প্রশিক্ষক হিসেবে চাকুরিতে যোগদান করেন। টানা দেড় যুগ চাকুরির পর ১৯৯৩ সালে একটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাকে চাকুরিচ্যুত করা হয় সাময়িকভাবে। দীর্ঘ তদন্তশেষে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় দুই বছর পর ফের তাকে চাকুরিতে যোগদান করতে বলা হয়। কিন্তু চাকুরিতে যোগদানের সাথে সাথেই তাকে বদলী করা হয় খাগড়াছড়িতে,যেখানে তখনো সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট এর কার্যক্রমই ছিলোনা।
তথাপি নিজের অসুস্থতার বিষয়টি জানিয়ে লিখিতভাবে অফিসকে তাৎক্ষনিক যোগদান করতে অপারগতা জানান সুজিত। বিধি বাম। এই কারণেই ফের তাকে আবারো অব্যাহতি দেয়া হয় সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট থেকে। কোন প্রকার নায্য হিস্যা বা পাওনা কোন কিছুই বুঝিয়ে না দিয়ে তাকে অব্যাহতি দেয়ার প্রতিবাদে এবং চাকুরি ফিরে পেতে বহু নেতা,সরকারি কর্মকর্তা,জনপ্রতিনিধির দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন সুজিত। এমনকি আদালতেও গেছেন। কিন্তু দীর্ঘসূত্রিতার নিগঢ় ছিঁড়তে পারেননি তিনি। ফিরে পাননি চাকুরিও,পাননি নিজের ন্যায্য পাওনা।
সংস্কৃতি কিংবা রাজনীতিতে, সর্বত্রই উপেক্ষিত সুরেশ
বরাবরই বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী সুজিত ছোটবেলা থেকেই ছাত্রলীগ হয়ে আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। আওয়ামীলীগ করার কারণে সামরিক শাসন জিয়ার আমলে একটি মিথ্যা মামলায় তাকে দশ বছর কারাদন্ড দেয়া হয় এবং কুমিল্লা কারাগারে ছয়মাস কারাভোগ শেষে মুক্তি পান তিনি। চাকুরি হারানোর পর ফের নব্বই দশকের মাঝামাঝিতে ফের সক্রিয় হন দলীয় রাজনীতিতে। এখনো তিনি রাঙামাটি পৌর আওয়ামীলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক। দলীয় পরিচয়ও কোন কাজে আসেনি এই অন্ত:প্রাণ আওয়ামীলীগ কর্মীর। নেতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে নিজের সমস্যাটির সুরাহা যেমন করতে পারেননি,তেমনি পারেননি নিজের একমাত্র কন্যার জন্য একটি চাকুরির সুবন্দোবস্ত করতে। জীবনের কঠিন সংকটকালেও ‘তানসেন সাংস্কৃতিক পর্ষদ’ নামে একটি সঙ্গীত শিক্ষা কেন্দ্র খুলেছিলেন,ছিলো তার অজস্র ছাত্রছাত্রীও। লেখালেখির পুরনো অভ্যাসটিও চলমান ছিলো। দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রামসহ স্থানীয় ও আঞ্চলিক দৈনিক দৈনিক ও সাময়িকীতে লেখাও ছাপা হত তার নিয়মিত। কিন্তু উপেক্ষা আর অপ্রাপ্তি তার বুকের ভেতর যে নিজস্ব শূণ্যতা তৈরি করেছে,সেখান থেকে আর বের হতে পারেননি এই অশীতিপর শিল্পী।
রাঙামাটি পৌর আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মনসুর আলী বলেছেন-‘সুজিত দাদার জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে সবসময়ই পাশে থাকার চেষ্টা করেছি,সহায়তা করেছি। চাকুরির বিষয়টাতেও আমি চেষ্টা করেছিলাম, তিনি যেনো ন্যুনতম হলেও নায্য পাওনা পান। কিন্তু বিভাগীয় কিছু জটিলতার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। আমি তার মেয়ের জন্যও একটি সরকারি চাকুরির চেষ্টা করেছি। কিন্তু নানা কারণে হয়ে উঠেনি বা পারিনি। তবে আমি আবারও চেষ্টা করব।’
রাঙামাটির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউট এর পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) রুনেল চাকমা জানিয়েছেন, ‘আমি সুজিত কুমার দাশের বিষয়টি কিছু জানিনা,এসব আমি যোগদানের আগের ঘটনা হতে পারে। তবে আমাদের অফিসে দুই ধরণের কর্মচারি আছেন,রাজস্ব এবং খন্ডকালিন। যারা খন্ডকালিন তারা চাকুরি শেষ হলে কোন সরকারি সুযোগ সুবিধা পান না।’ আর অসুস্থ সুজিত কুমার দাশের জন্য কোন সহায়তা করা সম্ভব কিনা জানতে চাইলে তিনি ‘এই বিষয়ে আমরা ব্যক্তিগতভাবে কিছু করা হয়ত সম্ভব,কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কিছু করার সুযোগ নেই।’
যা বলছেন সুজিতের মেয়ে সুরশ্রী !
সুজিত কুমার দাশের কণ্যা সুরশ্রী দাশ জানিয়েছেন, ‘ আমার বাবা জীবনভর রাঙামাটির সংস্কৃতি অঙ্গণের জন্য কাজ করেছেন। রাজনৈতিকভাবেও তিনি যদ্দিন শক্ত সামর্থ্য ছিলেন দলের এমন কোন কর্মসূচী নাই যে অংশ নেননি। আজ যখন তার জীবনের কঠিন দু:সময়ে তিনি শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে বাসায় পড়ে আছেন,তখন কেউ কি নেই আমার বাবার পাশে দাঁড়ানোর ? আমি বাবার সহকর্মী ও সহযোদ্ধাদের প্রতি বিনীত আহ্বান জানাই, আমার বাবাকে বাঁচান। বাবা ছাড়া তো কেউ নাই,কিচ্ছু নাই আমাদের।’ সুরশ্রী বলেন, আমার বাবাকে একবার মিথ্যা অভিযোগে অব্যাহতি দেয়া হলো,দীর্ঘতদন্ত শেষে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় কাজে যোগদানের জন্য নির্দেশ দেয়া হলো। আবার কাজে যোগ দেয়ার দিনই পুনরায় বদলী করা হলো খাগড়াছড়িতে,অসুস্থতার কারণে তাৎক্ষণিক যোগ দিতে না পারায় আবার অব্যাহতি দেয়া হলো! কিন্তু কেনো ? দেশে কি কোন ন্যায় বিচার নেই ? কথা বলার একজন মানুষও ছিলোনা ?’ তাকে প্রথমবার যখন বরখাস্ত করা হলো,তার তিনবছর পর তো তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে চাকুরিতে যোগ দিয়েছিলেন,সেই সময়ের নায্য পাওনাও তিনি পেলেন না কেনো ? ’
ভেজা চোখে গানের পাখি সুজিত এর আত্মজ সুরশ্রী বাবার মূল্যবান সব কাগজ,পুরনো ডায়রি,ছবির এ্যালবাম বারবার উল্টেপাল্টে দেখেন নিয়ম করে। পিতার পুরনো দিনেই যেনো ফিরে যায় মেয়ে,যেখানে বিপন্ন এক বাবার সমৃদ্ধ ইতিহাস থৈ থৈ করে । সিকি শতাব্দী ধরে নিজের বৈধ চাকুরি হারিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরে ক্লান্ত অসহায় এক শিল্পী পিতার কষ্ট বেদনা ক্ষোভ অভিমান কেনো বুঝলো না তার নিজের শহর কিংবা শহরবাসি, এমন ভাবনাই হয়তো সুরশ্রীকে আরে সুরহীন, বিবর্ণ-বেদনার্ত করে তোলে।
