সকাল বেলা বাসা হতে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। লাঠিতে ভর দিয়ে বয়োবৃদ্ধা এক নারী এসেছেন দু’মুঠো চাল পাওয়ার আশায়। গ্রামের এ-বাড়ি, ও-বাড়ি ঘুরে এখানে এসেছেন। দান এ’ঘরে মেলে তো ঐ’ঘরে মেলে না। তবুও সব বাড়ি যেতে হয়। আসলে না গিয়ে উপায় নেই। বাড়ি-বাড়ি গিয়ে যা পান, দিনশেষে সেগুলোর বিনিময়ে বাজারসদাইসহ অন্যান্য চাহিদা মেটাতে হয়। বয়সের ভারে দুর্বল শরীর। সপ্তাহে ২-৩ দিনের বেশি দানখয়রাত পাবার জন্য বের হতে পারেন না। এদিকে এছাড়া চলাও দায়। একা হলেও না-হয় কথা ছিল। কিন্তু তাকে নিজের সাথে আরেকটি মুখের অন্নের যোগান দিতে হয়। সম্পর্কে আপন নাতি। নাম বেলাল হোসেন। প্রতিবেশি থেকে ১০০ টাকা ধার নিয়ে এ’বছর নাতিকে প্রাইমারিতে ভর্তি করিয়েছেন। ধারদেনায় জীবন ভরে যাচ্ছে! এই তো জীবন; চলে যাচ্ছে পরের দয়ায়।
গল্পটি কাল্পনিক নয়। এটি সত্তর ঊর্ধ্ব বয়োবৃদ্ধ নারীর জীবনের চলমান চিত্র। নাম- নুরের নাহার। এই বয়োবৃদ্ধা থাকেন খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার উত্তর দমদম গ্রামে। তাঁর আদি গ্রামের বাড়ী ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার দক্ষিণ যশপুর গ্রামে। জায়গাজমি যা ছিলো তার সবটাই নদীর গর্ভে চলে যায় এবং নিরূপায় হয়ে পরে জীবিকার সন্ধানে চলে আসেন এই সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জনপদে। পিতার নাম মৃত নুরুল ইসলাম ও মাতা- রেজিয়া খাতুন। বছর দশেক হয় স্বামী আব্দুল বারীক মারা গেছেন। বারীক-নুরের নাহার সংসারে একটি মাত্র সন্তান আরমান হোসেন। স্বামীর মৃত্যুর পর বাকিটুকু পথ এই নাড়িছেঁড়া ধনকে নিয়ে পাড় করে দিচ্ছিলেন। অনেক আশা নিয়ে কয়েকবছর আগে ছেলেকে বিয়ে দিয়েছিলেন। দুই নাতি হওয়ার পর একপর্যায়ে স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তানকে ফেলে অজানায় চলে যায় আরমান। গর্ভধারিণী মা নুরের খোঁজখবর নেয় না প্রায় ৫ বছর। নুরের নাহারের দিনবদলের স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসে। সময়ের স্রোতে ছেলের বউও জীবন-জীবিকার তাগিদে চট্টগ্রামে গার্মেন্টসে চাকরি নেয়। দুই সন্তানের মধ্যে ছেলেকে নানির কাছে রেখে, মেয়েকে নিয়ে চট্টগ্রাম চলে যায়। বউ আগে বছরে ২-১ বার এসে ছেলেকে দেখে গেলেও, এখন বউয়ের সে সময়ও হয়ে উঠে না। ব্যস্ত জীবন। টাকা পয়সা যা পান, তা দিয়ে জীবন চলে না। এক খন্ড জমি আছে কিন্তু ঘর তোলার সামর্থ্য নাই। নাতি নিয়ে থাকেন অন্যের ঘরে। জমি, ছেলে-ছেলে বউ সব থেকেও যেন এখন কিছুই নেই। সব হারিয়ে এখন ভিক্ষাবৃত্তিই নুরের নাহারের বেঁচে থাকার শেষ ভরসা! অর্ধাহার অনাহারে, রোগশোক সয়ে পথে পথে হাত পেতে ভিক্ষা করে জীবন চালাতে হয়। দুটি পেট চলে পরের দয়ায়।
বাড়িতে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। কথা বলেন আঞ্চলিক মিশ্র ভাষায়। তিনি বলেন ‘শরীর আর চলে না। বাবারে, বহুত জাগাত ধরণা দিছি। বেকে কয়, আর কয়ডা দিন অপেক্ষা করেন। অপেক্ষার দিন আর হুরায় না। হেডের দায়ে এইদেশো আইসি। বয়স্ক ভাতা, ভিজিডি রেশন কার্ডসহ কুনু কিছু কেউ দিলে না।’
ভিক্ষুক পুনর্বাসনসহ নানান কার্যক্রম চলছে। আপনি এই ধরণের সুবিধা পাননি? কেউ কিছু বলেনি?- জানতে চাইলে, তিনি বলেন, ‘আমি কিছু হাই ন যখন, তয় কি করমু। এহন ত আমি ভিক্ষা করিয়া খাইতে অইবো। সাহায্য তুলি খাইতে অইবো। খাওন লাইগবো। চলনত লাইগবো। আঁই সরকারি কোনো কিচ্ছু হাই না। ত অহনকা কেন্নে চলন?
কোন কার্ড নাই। ভিজিডি কার্ড নাই; এক্কান বয়স্ক ভাতার কার্ড নাই। কিচ্ছু নাই; আমার কাছে। কেও-উ কিচ্ছু কয় না। মাতেও না। এই আল্লাহ্ আছে- আঁই আছি। খাইদাই হেডে-হেডে চলিযার। একদিন আঁই বাইর অইলে, তিনদিন বাইর অই না।’
সহায়তার পাওয়ার জন্য কারও কাছে গিয়েছেন?- জানতে চাইলে, নাম বলতে সমস্যা আছে জানিয়ে তিনি বলেন, গিয়েছেন। কিন্তু সহযোগিতা পাননি।
তিনি জানালেন, ‘কী কাগজটাগজ লাইগবো! দিন যায়, মাস যায়। আঁই ন খাই মরি, হেতেরা আইন দেহায়। এই দেশত ট্যাহা ছাড়া হুনো কাম অয় না। হাজার ট্যাহা লাগে। আমি ভিক্ষা করিয়া খাই। ভিক্ষা ছাড়া ভাত জুটে না। বহুত কষ্টে আছি। অতো ট্যাহা কই পামু?’
