শ্যামল রুদ্র, রামগড় ॥
খাগড়াছড়ির ভারত সীমান্তসংলগ্ন রামগড় উপজেলা ও এর আশপাশের পার্বত্য গ্রামীণ জনপদে মাদকের ব্যবহার ও পাচার প্রবণতা আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধির খবর পাওয়া গেছে। এতে অভিভাবকমহল ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন। এই মরণনেশার ছোবল থেকে এলাকাবাসীকে বাঁচাতে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় পুলিশকে কঠোর হওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে রামগড় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বিশ্বপ্রদীপ কুমার কারবারি বলেন, মাদক সংক্রান্ত খবরাখবর এলাকাবাসী আমাকে বিভিন্ন সময় জানান। এগুলো বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর হতে বলেছি। বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখা হবে।
উপজেলা মাসিক আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক প্রতিটি সভায় বিষয়টি ওঠে আসে। রামগড় একনম্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শাহ আলম মজুমদার বলেন, প্রতিটি বৈঠকে মাদক প্রতিরোধে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের কথা বলা হলেও কাজে কিছুই হচ্ছে না। দিন দিন যেন মাদক বেড়েই চলছে এলাকায়। উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি (দুপ্রক) সভাপতি মো. শাহ আলম বলেন, পুরো এলাকা মাদকে ছেয়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এখনই সাঁড়াশি অভিযান জরুরি।
এদিকে রবিবার ৪৩ বিজিবি বেলা ১১টায় বিভিন্ন সময় আটক ৫৩ লাখ ১২ হাজার ৩২৫টাকার মাদকদ্রব্য ধ্বংস করে। ব্যাটালিয়ন বাস্কেট গ্রাউন্ডে জব্দকৃত এসব মাদক ধ্বংস করা হয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন বিজিবি ৪৩ ব্যাটালিয়নের জোন কমান্ডার লে. কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির অংশ হিসেবে আমরা এই কার্যক্রম করেছি। এই ধারা অব্যহত থাকবে। যেকোনো মূল্যে আমরা দেশকে মাদকমুক্ত রাখতে বদ্ধপরিকর।
এ সময় খাগড়াছড়ির বিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম নাজমুল হোসেন চৌধুরী, রামগড় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বিশ্ব প্রদীপ কারবারী, পৌর মেয়র রফিকুলআলম কামাল, সহকারী পুলিশ সুপার মাটিরাঙা সার্কেল মিজানুর রহমান, খাগড়াছড়ি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো.আবদুল হালিম রাজ, ওসি মিজানুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
সরেজমিন ঘুরে সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রামগড় সীমান্তের বিভিন্ন হাটবাজারে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, চোলাইমদসহ নানা ধরনের মাদকদ্রব্য অবাধে বিক্রি হয়। ভারত থেকে পাচার হয়ে আসা ফেনসিডিল, ভারতীয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ, গাঁজা এবং দেশি চোলাইমদ এখানে খুবই সহজলভ্য। রামগড় ও এর আশপাশের নির্দিষ্ট কিছু স্থানে এসব নেশাজাতীয় দ্রব্য পাওয়া যায়।
দুপ্রক সভাপতি মো. শাহ আলম আরও বলেন, সাংগঠনিকভাবে একতাবদ্ধ হয়ে মাদকসেবীদের প্রতিহত করা না হলে এই মরণ নেশায় এলাকার যুব সমাজ ধংস হয়ে যাবে। রামগড় সীমান্ত এলাকায় অসংখ্য মাদকসেবীর আস্তানার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ক্রমান্বয়ে যেন এ সংখ্যা বাড়ছে। এদের এখনি প্রতিরোধ করা না হলে মাদক নামক বিষবৃক্ষ একসময় ডাল পালা মেলে মহীরুহে পরিনত হবে। মাদকের অপব্যবহার রোধে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহবান জানান তিনি।
রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. খোন্দকার মো. ইখতিয়ার উদ্দিন আরাফাত বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে একশ্রেণির বখাটে এসব অবৈধ কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত, তবে এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন খুবই সজাগ। ইতিমধ্যে রামগড়ে মাদকবিরোধী একটি সেমিনার সম্পন্ন করার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
সূত্র জানায়, রামগড়ের মহামুনি, সোনাইপুল, দারোগাপাড়া, ফেনীরকূল, আনন্দপাড়া, আবাসিক এলাকা, পর্যটন এলাকা, জগন্নাথপাড়া, বল্টুরাম, গর্জনতলী, সিনেমা হল এলাকা, মাস্টারপাড়া, চৌধুরিপাড়া, তৈচালা, লালছড়ি, লামকুপাড়া, খাগড়াবিল, গার্ডপাড়া, বাংলাবাজার, বাগানবাজার, বাঘমারা, বড়বিল, চিকনছড়া, হেঁয়াকো, বালুটিলা, আমতলা, কয়লামুখ, জালিয়া পাড়া, নাকাপা প্রভৃতি এলাকায় মাদকসেবীদের দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি।
সম্প্রীতি খবর পেয়ে এই প্রতিনিধি ও অন্য একজন সংবাদকর্মী রামগড় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখতে পান, পেছনের সীমানা প্রাচীরের ভেতর বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহার করা অসংখ্য ফেনসিডিলের খালি বোতল পড়ে রয়েছে। প্রধান শিক্ষক আবদুল কাদের বলেন, নেশার সিরাপ খেয়ে খালি বোতল ছুড়ে ফেলে বিদ্যালয়ের ভেতর। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক বলেন, সন্ধ্যার পর বিদ্যালয়ের সামনের খোলা অংশে স্থাপিত শহীদ মিনার এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা লক্ষণীয়। ভয়ে কেউ কিছু বলার সাহস পায় না।
