বান্দরবানের রুমা উপজেলায় পাহাড়ের চূড়ায় রহস্যময় ‘বগা’ লেকের পানি হঠাৎ ঘোলাঠে হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অনেকের কাছে এটি ড্রাগন ও দেবতার লেক নামেও পরিচিত। কয়েকদিন দিন ধরে ঘোলা হওয়া প্রাকৃতিক এ লেকের পানি মঙ্গলবারও পরিষ্কার হয়নি। শুধু ঘোলাঠে নয়, রহস্যময় এই লেকের পানি থেকে এক ধরণের গন্ধ বের হচ্ছে।
জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়রা জানায়, গত শুক্রবার সকাল থেকে জেলার রুমা উপজেলার অন্যতম পর্যটন স্পট পাহাড়ের চূড়ায় স্বচ্ছ পানির বৃহত্তর প্রাকৃতিক লেক “বগা”র পানি ঘোলাঠে হওয়া শুরু হয়। কয়েকদিনের ব্যবধানে লেকের সম্পূর্ণ পানি কাদামাখা ঘোলাটে হয়ে গেছে। কিন্তু স্বাভাবিকত বগা লেকের পানি স্বচ্ছ এবং নীল রঙের। তবে বর্তমানে লেকের পানি চেহারা মাটির রঙের মতো হয়ে গেছে। ঘোলা পানি থেকে এক ধরণের গন্ধ বের হচ্ছে। প্রাকৃতিক এই লেকের পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। লোকজনেরা গোসলও করতে ভয় পাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ করে পানি ঘোলাঠে হওয়ার কারণ বলা যাচ্ছেনা।
রেমাক্রি প্রাংসা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রিয়ালদো বম ও বম ধর্মীয় নেতা রেভারেন্ট জারলম বম বলেন, পাহাড়ের চূড়ায় প্রাকৃতিক এই লেকের উৎপত্তি সর্ম্পকে বহু কথা প্রচলিত আছে। নামকরণ নিয়েও রয়েছে নানা-গল্প। তবে রহস্যময় “বগা” লেকের পানি ঘোলা হওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। চার-বছরের মধ্যে অন্তত একবার এই লেকের পানি ঘোলাঠে হয়ে ওঠে। সপ্তাহ দশদিন ঘোলা থাকার পর পুনরায় পানি পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু কেন পানি ঘোলাঠে এবং দূগন্ধ হয়ে ওঠে সেটি বলা মুশকিল। হয়ত রহস্যময় এই লেকের পিছনে কোনো রহস্য লুকায়িত আছে।
এদিকে প্রাকৃতিকভাবে বগা লেক সৃষ্টি নিয়ে রুমা উপজেলার স্থানীয় বম, মারমা, ম্রো, খুমি ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীদের পৌরাণিক কাহিনি বা কিংবদন্তি রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বগা লেক ছিল একটি সমৃদ্ধ ম্রো সম্প্রদায়ের গ্রাম। গ্রামের পাশে একটি সুড়ঙ্গে বড় আকারের সাপ থাকত। ঐ সাপ ধরে গ্রামবাসী একদিন খেয়ে ফেলে। ঐ সাপ খেয়ে ফেলায় নাগরাজার প্রতিশোধের কারণে গ্রামবাসী’সহ গ্রামটি দেবে গিয়ে বগা লেকের সৃষ্টি হয়েছে। এখনো অনেক বম, ম্রো বিশ্বাস, লেকের গভীরে থাকা নাগরাজ লেজ নাড়ালে পানি ঘোলাটে হয়ে ওঠে। বগা লেকের জন্ম ইতিহাস নিয়ে স্থানীয় পাহাড়ীদের মাঝে মজার আরও একটি গল্প প্রচলিত আছে। গল্পটি হচ্ছে “অনেক অনেকদিন আগে একটি চোঙ্গা আকৃতির পাহাড় ছিল। দুর্গম পাহাড়ে ঘন অরণ্য। পাহাড়ের কোলে বাস করত পাহাড়ীদের দল। ম্রো, বম, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, মারমা। পাহাড়ী গ্রাম থেকে প্রায়ই গবাদীপশু আর ছোট বাচ্চারা চোঙ্গা আকৃতির পাহাড়ের মধ্যে হারিয়ে যেত। গ্রামের সাহসী লোকেরা কারণ অনুসন্ধানে গিয়ে দেখে পাহাড়ের চূড়ার গর্তে ভয়ঙ্কর এক ‘বগা’ বাস করে। স্থানীয় বম ভাষায় বগা মানে ড্রাগন। স্থানীয় ক’জন পাহাড়ী মিলে আক্রমণ করে ড্রাগনটি মেরে (হত্যা করে) ফেলে। ফলে ড্রাগনের গুহা থেকে ভয়ঙ্কর গর্জনের সঙ্গে আগুন বেরিয়ে আসে। নিমিষেই পাহাড়ের চূড়ায় পানির মনোরম পাহাড়ী লেকের জন্ম হয়। তেমনটি এটি লেক, হ্রদ, না জলাশয় এনিয়েও বিতর্ক কম নেই।
তবে ভ্রমনকারী ভূ-তত্তবিদগণের মতে, বগাকাইন হ্রদ (বগা লেক) মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ কিংবা মহাশূন্য থেকে উল্কাপিণ্ডের পতনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে ধারণা ভূমিধসের কারণে এটি সৃষ্টি হয়েছে। বগা লেকটি বান্দরবন সদর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে এবং রুমা উপজেলা সদর থেকে ১৪ কিলোমিটার দুরত্বে অবস্থিত।
রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুল আলম জানান, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় পর্যটন স্পট “বগা” লেকের পানি কেন নির্দিষ্ট একটি সময়ে ঘোলাঠে হয়। সেটি বলা খুবই মুশকিল। পানির গভীরে কোনো আলোড়ন সৃষ্টির কারণে অথবা কোনো জলজ উদ্ভিদ নির্দিষ্ট সময়ে মরে পচে গেলে পানি ঘোলা হয়ে থাকতে পারে।
Previous Articleরাবেতা ক্যাম্পাসে নিজেদের একটা দিন
Next Article ‘সাময়িক বহিষ্কৃত’ হলেন রাঙামাটির ৬ ছাত্রলীগ নেতা
