খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি
বাকি দশটা ছেলের চেয়ে একটু অন্যরকম মুকুল কান্তি ত্রিপুরা(১৮)। তাই সমাজের বাঁকা চোখ তাকে তাড়িয়ে বেড়ালেও এতে ভ্রক্ষেপ নেই তার। আপন গতিতে নিজের স্বপ্নপূরণের পথে ছুটছে প্রতিবন্ধি মুকুল। ছোটবেলা থেকে যে চিত্রাংকনে বুদ থাকত তা ইতিমধ্যে তাকে এনে দিয়েছে আলাদা পরিচয়। মুখ ফিরিয়ে নেয়া মানুষগুলোও তাকে নিয়ে গর্বিত। এলাকার শিশুদের গর্বিত চিত্রাংকন শিক্ষক সে।
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার দুর্গম মায়াফা পাড়ার মহেশ^ও ত্রিপুরার ছেলে মুকুল কান্তি ত্রিপুরা। সে জন্মগতভাবেই খর্বাকৃতির। তার উচ্চতা ৪ফুট ২ ইঞ্চি। জুম চাষি বাবার ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট মুকুলের বেড়ে ওঠা হয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতায়। শিশু অবস্থা থেকে চিত্রাংকনের এর প্রতি বিশেষ দুর্বলতা ছিল মুকুলের। দীঘিনালার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় চতুর্থ শ্রেণিতে উপজেলা পর্যায়ে শিশু চিত্রাংকন প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পায় সে। পরে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয় মুকুল।
সেখানে ৪ বছর ধরে লেখাপড়াসহ চিত্রশিল্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ হয় তার। চিত্রাশিল্পী রিগেন চাকমার কাছ থেকে ছবি আঁকার ওপর প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করে মুকুল। তার আঁকা ছবিগুলো একটা পর্যায় মানুষের প্রশংসা কুড়ায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহনের আগেও মুকুল অনায়াসে আঁকতে পারে যে কোন ছবি। এঁকেছে বিশিষ্ট ব্যক্তি, খরা, বন্যা আর দূর্ভিক্ষের নানা ছবি। অনেক ছবি পছন্দ হওয়ায় অনেককে উপহার হিসেবে দিয়েছেন।
এ প্রজন্মের শিশুদের তার মত করে ছবি আঁকায় পারদর্শী করে তুলতে এখন তিনি নিজ গ্রামে বিনা পয়সায় আর্ট শেখাচ্ছেন। স্থানীয় একটি মন্দিরে শিশুদের চিত্রাংকন শেখাচ্ছে। চিত্রাংকন শিখতে পেরে তাতে খুশি শিশুরাও। তার শেখানোতে এলাকার কিছু শিশু ভালোমানের ছবিও আঁকতে পারে। গ্রামের বাসিন্দারাও গর্বিত মুকুলের এমন উদ্যোগে।
দীঘিনালা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী পিপাসা ত্রিপুরা জানায়, গত দুই বছর ধরে মুকুল স্যারের কাছে আমি আর্ট শিখি। সপ্তাহে দুইদিন করে ক্লাস নেয়। বিনিময়ে তিনি কোন টাকা নেন না। পুনিতা ত্রিপুুরা ও শাপলা ত্রিপুরা জানায়, মুকুল স্যারের কাছে আর্ট শিখতে পেরে আমরা আনন্দিত। আমাদের মত অনেকে স্যারের কাছে আর্ট প্রশিক্ষন নিচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা খনি রঞ্জন ত্রিপুরা জানান, ছোটবেলা থেকে মুকুল ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ ছিল। আজ কয়েক বছর ধরে বিনা পয়সায় গ্রামের ছেলেমেয়েদের ছবি আঁকা শেখাচ্ছে। প্রশাসন একটু নজড় দিলে সে আরো বহুদুর এগিয়ে যেতে পারতো।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে প্রতিবন্ধী মুকুলকে এখন অনেকে চেনেন। মুকুল কান্তি ত্রিপুরা জানায়, ছোটবেলা থেকে ছবি আঁকার প্রতি আমার নেশা ছিল। এখন নিজ গ্রামের শিশুদের আমি ফ্রিতে চিত্রাংকন শেখায়। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আর্ট শিক্ষক হিসেবে কাজ করি। আর কয়েকটা টিউশন করি। এসব করে যা পাই তা দিয়ে নিজের পড়ালেখার খরচ আর পরিবারে কিছু দেয়ার চেষ্টা করি। সবার সহযোগিতা পেলে আমার মত প্রতিবন্ধি, গরীব, অসহায় শিশুদের পাশে দাঁড়াতে পারবো। একটি আর্ট স্কুল করার স্বপ্নের কথা জানায় সে। যেখানে আর্ট শেখার সুযোগ পাবে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা।
মুকুল ত্রিপুরা গ্রামের বাইরে আর্ট শিখিয়ে কিছু টাকা আয় করেন। সেই টাকায় পড়াশোনা করেন দীঘিনালা কুজেন্দ্র-মল্লিকা মডার্ণ কলেজে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে। কলেজ থেকে বাড়ির দুরত্ব বেশি হওয়ায় এই টাকায়ও হয় না তার। মুকুলের এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন প্রশাসনের সহযোগিতা।
দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, মুকুল কান্তি ত্রিপুরা একজন প্রতিভাবান ছেলে। আমি তার প্রতিভা যাতে বিকশিত হয় এই ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করবো। এছাড়া আমি সরেজমিন গিয়ে দেখেছি তাদের ভালো ঘর নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দুর্যোগ সহনীয় প্রকল্পের মাধ্যমে তাকে একটি ঘর উপহার দিতে পারবো।
মুকুলের স্বপ্ন একদিন বাস্তবায়ন হবে; চিত্রাংকনের সুযোগ পাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অবহেলিত শিশুরা এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।
