ভূমি বিরোধের জের ধরে রাঙামাটিতে নিজ বসত থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন এক বীর মুক্তিযোদ্ধা। দীর্ঘদিন বসবাসের পর পরিবারসহ উচ্ছেদ হতে হয়েছে বৃদ্ধ এই মুক্তিযোদ্ধাকে। তবে মুক্তিযোদ্ধার এই দুরবস্থার কথা শুনে পাশে দাঁড়িয়েছেন জেলা প্রশাসক।
এলাকাবাসী জানায়, বীর মুক্তিযুদ্ধা অনিল সেন একাত্তরে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন। যুদ্ধের পর রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নে স্ত্রী, চার মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে বসবাস করে আসছেন। তবে স্থানীয় রাজ্য মনি ও বিশ্বজিতের সাথে জমি নিয়ে মামলা মোকদ্দমার পর আদালতের রায়ে পাশের জমি থেকে উচ্ছেদ হতে হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা অনিল সেনের পরিবারকেও। বৃহস্পতিবার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পল্বব হোম দাশের নেতৃত্বে আদালতের নির্দেশে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। উচ্ছেদের পর মুক্তিযোদ্ধার পরিবার খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে।
মুক্তিযোদ্ধার পরিবারকে উচ্ছেদের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। এর প্রতিবাদে শুক্রবার সকালে ঘাগড়া এলাকায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। রাঙামাটি চট্টগ্রাম সড়কের ঘাগড়া প্রধান সড়কে ঘন্টা ব্যাপী মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় ব্যবসায়ী মোঃ জাফর আলী, ছাত্রলীগ নেতা সাজীব দাশ, ক্ষতিগ্রস্ত বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান রুবেলসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। মানববন্ধনে ঘাগড়া বাজার, কলাবাগান সহ বিভিন্ন এলাকার কয়েকশত লোক অংশগ্রহণ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা নুরুল আমিন বলেন, ‘বৃহস্পতিবার দুপুরে আমরা খবর পেয়ে এখানে আসি। কিন্তু কথা বলার চেষ্টা করা হলেও আমরা দায়িত্বশীল কারো সাথে কথা বলতে পারি নাই। তারা কেউ আমাদের কথা বলার সুযোগ দেয়নি। আমরা বারবার বলার চেষ্টা করেছি অনিল সেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা আর ক্ষতিগ্রস্ত কাউকে আগে নোটিশ দেয়া হয়নি।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সজীব বলেন, ‘দেশের একজন সূর্য সন্তানকে এভাবে খোলা আকাশের নিচে গতকাল(বৃহস্পতিবার) থেকে থাকতে হচ্ছে বিষয়টি আমাদের সকালের জন্য দুঃখজনক। যারা জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন করেছিল সেই ব্যক্তি আজ নিজ দেশে বাড়িঘর ছাড়া। আমরা এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষিদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।
অনিল সেনের বড় মেয়ে রুমা দে, ‘আমি খবর পেয়ে আমার শ্বশুর বাড়ি থেকে এসে দেখি আমাদের সাজানো গোছানো সংসার সব এলোমেলো অবস্থায় পড়ে আছে। আমার বাবা বাইরে বসে কান্না করছে। মা অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে।
ঘাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জগদীশ চাকমা বলেন, এটা যে ভাঙচুর করবে আমরা জানি না। পরে মেম্বার আমাকে বলে দুপুরে এসে দিকে এই অবস্থা। এই জায়গায়টি বন্দোবন্তির জন্য আগের হেডম্যান সুপারিশ করেছিল সেটা জানি। আসলে বিষয়টি দুঃখজনক।
রাঙামাটির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পল্বব হোম দাশ জানান, ‘আদালতের নির্দেশে পেয়ে আমরা কাগজ দেখে উচ্ছেদ করি।
এদিকে মুক্তিযোদ্ধার অনিল সেনের বাড়ি উচ্ছেদের খবর পেয়ে শুক্রবার দুপুরে কাউখালী উপজেলার ঘাগড়ায় ছুটে যান জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ। তিনি মুক্তিযোদ্ধার পরিবার, স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বারদের সাথে কথা বলেন। এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নজরুল ইসলাম, কাউখালী নির্বাহী অফিসার এ এম জহিরুল হায়াত, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উত্তম কুমার দাশ।
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক এ কে এম মামুনুর রশিদ বলেন, ‘অনিল সেন দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছে। জায়গাটি নিয়ে কোর্টে মামলা হয়েছে। আদেশ মতে এখানে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। উনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এই কথাটি শুনে আমি ছুটে আসি এবং জেলা প্রশাসন থেকে আপতত দশ হাজার টাকা সহায়তা প্রদান করা হয়। তিনি আরো বলেন, এই জায়গাটি আসলে কি খাস জমি নাকি বাদি পক্ষের জমি যেহেতু কোর্টের আদেশ আছে তাই এবিষয়ে কথা বলতে চাই না। তারপরও আমি ওনার সাথে আছি। ওনার পুর্নবাসনের জন্য যা করা দরকার সব কিছু করা হবে।
মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের বর্তমান সরকারের আমলে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিজ বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনায় এলাকায় বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব এই মুক্তিযোদ্ধার বাড়ির বিষয়টি সুরাহার তাগিদ দিয়েছেন এলাকাবাসী।
