পাঁচবছর আগে ‘অন্তর্বতী কালীন পরিষদ’ এর চেয়ারম্যান মনোনীত হয়ে অনির্ধারিত পথচলায় ‘স্বাভাবিক সময়’র বাড়তি আরো ৮ মাসসহ ৬৮ মাস দায়িত্ব পালন করেছেন চেয়ারম্যান হিসেবে,আলোচনায় ছিলেন পুনর্গঠিত পরিষদেও ফের দায়িত্বপ্রাপ্তদের সংক্ষিপ্ত তালিকায়,কিন্তু শেষাবধি ভাগ্য সহায় না হওয়ায় নতুন পরিষদে ঠাঁই মিলেনি তার। কিন্তু নানান কারণেই আলোচিত ও সমালোচিত চেয়ারম্যান ‘বৃষ কেতু’ আলোচনায় ছিলেন,আছেন এখনো,আগামীতে থাকবেন কিনা সে নিয়ে যদিও সংশয় আছে অনেক। কিন্তু নিজে ঘোষণা দিয়ে দৃঢ়তার সাথে জানালেন,পদ গেলেও রাজনীতি ছাড়ছেন না তিনি,থাকবেন রাজনীতির মাঠে আগের মতোই,যদ্দিন শরীর সহযোগিতা করে।
বৃষ কেতু চাকমা। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান। জেলা পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান গৌতম দেওয়ানের মতো স্মার্ট ছিলেন না,ছিলেন না শিক্ষাবিদ চেয়ারম্যান মানিক লাল দেওয়ানের মতো মেধাবীও। রাঙামাটি শহরের খুব চেনা মুখও ছিলেন না তিনি। কিন্তু ‘দাদার ভরসার’ পাত্র হয়ে দশ বছর আগে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য হন,বাঘাইছড়ি থেকে,‘ড্যাশিং চেয়ারম্যান’ খ্যাত নিখিল কুমার চাকমার সাথে। এরপর ২০১৫ সালের পুনর্গঠিত পরিষদে সবাইকে চমকে দিয়ে সেই তিনিই চেয়ারম্যান ! বাঘাইছড়ি আওয়ামীলীগের এই নেতা হয়ে উঠেন পুরো জেলার সবচে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটির হর্তাকর্তা।
শুরুতে জেলা শহরের নেতাকর্মীদের কাছে বড় বেশি ‘অচেনা’ এই নেতা ‘সদস্য’ ও ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে দুই দফায় দায়িত্ব পালনের দশ বছর পরও নেতাকর্মীদের খুব বেশি ‘আপন’ হতে পারেননি, পছন্দের গুটিকয়েক নেতাকর্মীর বলয়ের বাইরে গিয়ে তৈরি করতে পারেননি ‘সার্বজনীনতা’। একদিকে বাগ্নিতার অভাব আর অন্যদিকে আটপৌঢ়ে মফস্বলের জীবন থেকে উঠে আসা বৃষ কেতু শহুরে রাজনীতিবিদ কিংবা কর্মীদের মন জয় করতেই পারেননি,কথায়-কাজে কিংবা ভালোবাসায়। যার ফল, দশ বছরেও দুরত্ব ঘোচাতে না পারার ব্যর্থতা নিয়েই বিদায় নিলেন জেলা পরিষদ থেকে,যেখানে ‘সদস্য কিংবা চেয়ারম্যান’ হিসেবে আর কখনই ফিরে আসার পথ খোলা নেই তার জন্য !
চেয়ারম্যান বৃষ কেতু সফল নাকি ব্যর্থ,এই আলোচনায় তার ব্যর্থতার পাল্লাই ভারি হয়ে উঠে। ‘চলনে বলনে’ সহজসরল ও ‘সোজাসাপ্টা’ কথাবার্তার জন্য ‘ঠোঁটকাটা’ খ্যাতি পাওয়া এই চেয়ারম্যানকে ঘিরে ‘মিথ’ও ছিলো অনেক। তার আমলে শহরে বঙ্গবন্ধুর সুবিশাল ভাস্কর্য নির্মাণের কৃতিত্ব যেমন আছে,তেমনি সেই ভাস্কর্য নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগও আছে। কাপ্তাই হ্রদ দখল করে একের পর এক স্থাপনা নির্মাণে অর্থায়নও তাকে বিতর্কিত করেছে বারবার। যেকোন সমস্যা সমাধানে নিজের প্রজ্ঞা বা মেধাকে ব্যবহার না করে ‘…..জানে’ কিংবা ‘…এর সাথে কথা বলেন’ জাতীয় শব্দের ব্যবহার তার পদমর্যাদা ও সম্মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে । দায়িত্ব নেয়ার শুরুতেই শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিক অনুসন্ধানি রিপোর্টের পর সংসদী তদন্ত কমিটি গঠন তাকে বেশ বেকায়দায় ফেলেছিলো।
আর মেয়াদের শেষার্ধে নানা প্রকল্প আর কাজে নয়ছয় এর অভিযোগে দুদক এর কড়া নজরদারিও ভাবনায় ফেলেছিলো তাকে। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের জন্য কয়েক কোটি টাকার বাংলো আর সেই বাংলোয় যেতে আরো কয়েককোটি টাকার সেতু নির্মাণের কাজের সমালোচনা জেলাজুড়ে। করোনাকালে কার্যকর ভূমিকা রাখতে জেলা পরিষদের ব্যর্থতা কিংবা পুরো দায়িত্বকালেই জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয়হীনতায়ও ভুগেছেন তিনি। সমালোচনা আছে,সৃজনশীল কোন প্রকল্প গ্রহণে ব্যর্থতারও। পর্যটন শিল্পের বিকাশে নানান সময় কোটি কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণের গল্প শোনালেও বেলাশেষে তার কিছুই করতে পারেননি তিনি। এমনকি ‘সিম্বল অব রাঙামাটি’ খ্যাত ফিসারি সংযোগ সড়কের কাজটিও পৌরসভা এবং উন্নয়ন বোর্ডকে করতে না দিয়ে নিজেরা করার জন্য নিয়ে,সেটাও আদৌ শুরুই করতে পারেননি। পার্বত্য মন্ত্রনালয় থেকে বৈচিত্রপূর্ণ কিংবা ভিন্নরকম কর্মসূচীনির্ভর কোন প্রকল্পও আনতে ব্যর্থ হয়েছেন পুরো মেয়াদেই। নিজের পদের চেয়েও ‘বড়পদের’ ও ‘প্রভাবশালী’ জেলা পরিষদের সদস্যদের ‘নিয়ন্ত্রন’ কিংবা ‘পরিচালনায়’ তার ব্যর্থতা এতো বেশি ছিলো যে,এনিয়ে জেলাজুড়েই হাস্যরস হতো। মোটা দাগে, পার্বত্য জেলা পরিষদের ইতিহাসের সবচে ব্যর্থ চেয়ারম্যান হিসেবেই তাকে মনে করছেন অনেকেই।
বৃষ কেতু চাকমাকে তাই ‘সফল’ বলতে নারাজ, রাঙামাটি দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ওমর ফারুক। তিনি বলেন- তার আমলে এমন কোন উল্লেখযোগ্য কাজ তিনি দেখাতে পারেননি,যাতে তাকে সফল বলা যায়। তিনিও আরো অনেকের মতো ‘গতানুগতিক’ একজন চেয়ারম্যান, ‘ভিন্নতর’ কোন কিছু দেখাতে পারেননি তিনি,করার চেষ্টাও করেননি। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে অবশ্যই ‘সৃজনশীল’ এবং ‘ মেরুদন্ডওয়ালা’ হতে হবে,তাকে অবশ্যই ‘রাঙামাটিঅন্ত:প্রাণ’ও প্রমাণ করতে হবে নিজেকে,কাজের মাধ্যমেই।’
উন্নয়নকর্মী ও গবেষক ললিত চন্দ্র চাকমা পুরো বিষয়টি দেখছেন একটু ভিন্নভাবে। তিনি বলছেন, ‘বৃষ কেতু চাকমা তার পুরো মেয়াদতো পূর্ণ করেছেন,সরকার যে উদ্দেশ্যে তাকে মনোনীত করেছে,সেই উদ্দেশ্যতো সফল!’ কিন্তু রাঙামাটিবাসির আশা আকাংখার প্রতিফলন ছিলোনা তার কাজেকর্মে। তার সাথে তো সাধারণ মানুষ বা সিভিল সোসাইটির সমন্বয় বা পরামর্শগ্রহণ করার কোন উদ্যোগ, কোন কিছুই ছিলো না। একজন চেয়ারম্যানের যে ‘স্বপ্ন বা প্রভাবলয় বা জনসম্পৃক্ততা’ থাকার কথা,সেটাও ছিলোনা তার ।’
রাঙামাটির সিনিয়র সাংবাদিক এম শামসুল আলম ‘বৃষ কেতু চাকমা’ কে ‘ব্যর্থ চেয়ারম্যান’ হিসেবে মন্তব্য করে বলেন,দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিজেকে সকল জনগোষ্ঠির অভিভাবক হিসেবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি এমন একটি কাজও করে যেতে পারেননি,যে কারণে রাঙামাটিবাসি তাকে মনে রাখবে। রাঙামাটিবাসির দুর্ভাগ্য যে তার মতো একজন ব্যক্তি রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলো।’
তবে নিজেকে ‘ব্যর্থ’ মানতে রাজি নন বৃষ কেতু। তিনি বলেছেন, আমি সফল নাকি ব্যর্থ,সেটা রাঙামাটিবাসি মূল্যায়ন করবেন। আমি এমন কোন কাজ করিনি যার জন্য আমাকে কেউ অপবাদ দিবে। নানান সীমাবদ্ধতায়ও আমি চেষ্টা করেছি। আমি আমার দায়িত্ব পালনে কখনই অসততা করিনি।’
বৃষ কেতু চাকমা বলেন, ‘একজন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান চাইলেই অনেক কিছু করতে পারেন না। পদমর্যাদা নেই,প্রয়োজনীয় বরাদ্দও নেই,আয়ও নেই। এই অবস্থায় বহু স্বপ্নই বাস্তবায়ন সম্ভব হয়না।’
নতুন পরিষদের প্রতি শুভকামনা জানিয়ে বৃষ কেতু বলছেন, নতুন চেয়ারম্যান বিগত দুইটি পরিষদেও ছিলেন। তিনি তার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে সেই মোতাবেক নিশ্চয়ই ভালো কিছু দেখাতে পারবেন,আমিও সেই প্রত্যাশাই করছি।’
জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদ হারানো বৃষ কেতু চাকমা এখনো বাঘাইছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি,গত প্রায় দেড়যুগ ধরেই এ পদে আছেন তিনি। এখন রাঙামাটি শহরে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করলেও বাঘাইছড়িতে নিয়মিত আসা যাওয়া শুরু করেছেন তিনি। চেয়ারম্যান পদ ছাড়ার পর বাঘাইছড়িও গেছেন বলে জানিয়েছেন উপজেলা আওয়ামালীগের সাধারন সম্পাদক মোঃ গিয়াসউদ্দিন। নিজের সভাপতিকে ‘সফল চেয়ারম্যান’ তকমাও দিলেন বেশ জোরগলায়।
তবে রাঙামাটিবাসি সম্ভবত রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের ‘বৃষ কেতু অধ্যায়’কে ভুলতে চাইবে নানান যৌক্তিক কারণেই। ‘শীর্ষে বসেও সিদ্ধান্তের জন্য অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকা নতজানু এক নেতাকে’ কেউবা মনে রাখতে চায় ! ফলে ইতিহাস নির্ধারিত নিয়তি কিংবা গন্তব্য হিসেবেই, নিজের ফেলে আসা জনপদ বাঘাইছড়ির রাজনীতি নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হবে এই প্রবীণ আওয়ামীলীগ নেতাকে,যিনি ‘কপালগুণে’ পাওয়া নিজের জীবনের ‘শ্রেষ্ঠতম সময়টি’ সম্ভবত চিরতরেই পেছনে ফেলে এসেছেন !
