একমাত্র পুত্র তিরাজ এর জন্মদিনেই মৃত্যু হলো পিতা মিঠুন চাকমার ! বুধবার তিরাজ দুবছর পূর্ণ করলো,কিন্তু অবুঝ এই শিশুটি বুঝতেই পারলোনা পৃথিবীর সবচে বড় নির্ভরতাটিকে হারিয়ে ফেলেছে সে।
বুধবার নিজ বাসা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা ইউপিডিএফ নেতা মিঠুন চাকমার স্বজন দীপনা চাকমা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে বিষয়টি তুলে ধরেন। তার হৃদয়স্পর্শী বিবরণ অনেককেই আপ্লুত করেছে। তিরাজ এর নাম রাখার ইতিবৃত্তও তুলে ধরেন এ নারী।
ফেসবুকে তিনি লিখেন-‘আজ সাবেক ছাত্র নেতা ইউপিডিএফ র সংগঠক মিঠুন দা ‘র একমাত্র ছেলের জন্মদিন। দুই বছর পূর্ণ করলো তার ছেলে। তার ছেলেকে যখন দেখতে গিয়েছিলাম তখন মিঠুন দা ‘র হাসিমাখা মুখ এখন চোখে ভাসছে। সেদিন তিনি ছেলের নাম দেয়ার জন্য আমার কাছ থেকে সমর্থন চাইছিলেন। বললেন, জানুয়ারির তিন তারিখ,রাতের বেলা । তাই তিন তারিখের তি,রাতের বেলার রা, আর জানুয়ারির জা। এই তিন প্রথম অক্ষর মিলে “তিরাজ ” নাম দিলে কেমন হয়। আমার কাছে নামটা পছন্দ হওয়ায় সম্মতি দিয়ে বললাম যে, হ্যাঁ মিঠুন দা এটাই ডাকনাম হিসেবে রাখো। খুব সুন্দর নাম। কিন্তু নিয়তির কি নির্মম পরিহাস বাবা- ছেলের জন্ম- মৃত্যু দিবস একসাথেই হয়ে গেলো!’
তিনি আরো লিখেন- ‘তার সাথে শেষ দেখা পনেরো দিনের বেশি হবেনা। আমি কমলছড়ি রোডে টমটমে চড়ে যাচ্ছিলাম। তাদের বাড়ির গেটে মিঠুন দা দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাকে দেখে ইশারায় জানতে চান কোথায় যাচ্ছি ।
প্রেরক মিঠুন চাঙমা নামে ২০০২ সালে প্রথম আমার কাছে একটা চিঠি আসে । মেয়েলি ধরণের গোটা গোটা হাতের লেখা চাকমা ভাষায়। একটা লিটল ম্যাগাজিনে কবিতা লিখতে গিয়ে তিনি আমার সন্ধান পান । চিঠির সবটুকু লেখাই ছিলো সাহিত্য বিষয়ক। ঠিকানা ছিল রুম নং – ( এখন মনে নেই),ভাষাতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
তার পরিচয় সেটুকুই জানি। কিন্তু আমাদের দুজনের মধ্যে নিয়মিত সাহিত্য- সংস্কৃতি বিষয় নিয়ে চিঠি আদান – প্রদান হতো। আমার জীবনে লেখালেখির ক্ষেত্রে একমাত্র তাকেই পথপ্রদর্শক হিসেবে পেয়েছি। তাকে না পেলে সিরিয়াস ভাবে হয়তো লেখালেখি করতাম না।
তিনি কে ,কি করেন সেটা জেনেছি ২০০৪ সালে প্রথম দেখা হওয়ার মধ্য দিয়ে। সেদিন তার পরনের প্যান্ট ছিল ডিসকালার হওয়া এবং প্যান্টের নিচের অংশ গোড়ালির উপর খানিকটা গোটানো। আমি অবাক হয়েছিলাম যে মানুষটা আমার সাথে এত সুন্দর চিন্তা চেতনা নিয়ে কথা বলে সে কতবড় সাধাসিধে হতে পারে। অত্যন্ত অমায়িক,বিনয়ী ব্যবহারে তিনি প্রথম সাক্ষাতে আমার সমস্ত জড়তা ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। সেদিন তার সাথে আর একজন ছাত্রনেতা অলকেশ চাকমা দা ছিলেন।তাকেও আমি প্রথম সেদিন দেখি।
ভুল করে ও কখনো ভাবিনি যে কোনদিন মিঠুন দাকে নিয়ে এভাবে স্মৃতিচারণ করে লিখতে হবে। যে মানুষটা কৃতিত্বের সাথে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সুযোগ পেয়ে ও তা না করে জুম্মজাতির জন্য অধিকার ছিনিয়ে আনার লক্ষ্যে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন সেই মানুষটাকে অল্প বয়সে কিছু বিপথগামী স্বজাতীয়র হাতে নির্মম ভাবে প্রাণ দিতে হল।’
দীপনা চাকমা আরো লিখেছেন-‘১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙ্গালিকে মেধাশূণ্য করতে পাকিস্তানিরা বাঙালি বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করেছিল। আর আমরাই নিজেরা নিজেদের মেধাশূণ্য করতে হিংসাত্মক রাজনীতির মাধ্যমে নিজেদের মেধাবী সন্তানদের হত্যা করছি। সাধারণ জনগণ আজো ভুলেনি রূপক,অনিমেষ,সুদীর্ঘদের নাম। তাদের পাশে যুক্ত হলো আজ আরেক মেধাবী সন্তান মিঠুন চাঙমার নাম। আর একটা অপূর্ণ আশা থেকে গেলো মিঠুন দার সাথে আমার ফেসবুকে বন্ধুত্ব করা হয়ে উঠেনি।আর কতকাল চলবে এই সংঘাত?’
এদিকে সহযোদ্ধার মৃত্যুতে ভেঙ্গে পড়া ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমা পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কমকে বলেন, তার সাথে আজই (বুধবার) আমার দেখা হওয়ার কথা ছিলো। কিছু সাংগঠনিক আলাপও ছিলো । কিন্তু কি এক কাজে সে বাসায় চলে যায়। কে জানতে মৃত্যুই তাকে টেনে নিয়ে গেছে !
মিঠুন চাকমার সহযোদ্ধা অলকেশ চাকমা কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন,কিছু বলার নাই,কিচ্ছু বলার নাই,কিইবা বলব। মিঠুন ছিলো আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য সম্পদ। কিন্তু……………….’
ইউপিডিএফ নেতারা জানিয়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব বিভাগের ছাত্র মিঠুন অনলবর্ষি বক্তাও ছিলেন,ছিলেন দক্ষ সংগঠকও।
