-ঞ্যোহ্লা মং
পাহাড়ে ছেলেবেলায় দেখেছি ‘প্ণা’/ ‘পুনাহ্’ (মারমা ভাষা জানা ব্রাক্ষণদের মারমারা এই নামে ডাকে) রা গ্রাম থেকে গ্রামে নতুন বছরের ভবিষ্যৎবাণী নিয়ে ঘুরে ঘুরে অর্থ সংগ্রহ করতেন। জাতিতে প্ণারা হিন্দু ব্রাক্ষণ হলেও তারা ভাঙ্গা ভাঙ্গা মারমা ভাষা বলতে পারতেন। বাড়ি বাড়ি ঘুরে ‘বার্তা বিতরণের’ জন্য দানীয় কম দেখলে মন খারাপ করে অনেক পণাকে আরো দান চাইতেও দেখেছি। ‘সাংগ্রাইং চা’ (বছরের রাশিফল) পড়ার শেষে গৃহিনীদের সাথে প্ণার প্রশ্ন-উত্তর পর্ব চলতো। প্ণাদের ঘুরে ঘুরে বার্তা প্রেরণের মধ্যদিয়ে পাহাড়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে সাংগ্রাই প্রস্তুতি পর্ব শুরু হতো। গত এক দশকে প্ণাদের দেখা গেছে কদাচিৎ কোথাও কোথাও। প্ণারা কেন আর আসছেন না তা জানা নেই, তবে মারমা সমাজে প্ণাদের স্থান ছিল বৌদ্ধ ভিক্ষুদেরও ওপরে। যার প্রমাণ ‘প্ণা/পুনাহ্ ফ্রয়তে আরোহ্, রাহাইং ফ্রয়তে আরি”। অথাৎ আক্ষরিক অর্থ করলে হয় ‘প্ণারা হলেন শরীরের হাড় আর ভিক্ষুরা হলেন চামড়া’। সে থেকে বুঝা যায়, এক সময় পাহাড়ে প্ণাদের কি পরিমাণে গুরুত্ব দিয়ে বরণ করা হতো। প্ণাদের থেকে সাংগ্রাই চা শুনার জন্য টাকা, চাল, মরিচ, কাপড়, শুটকি, ধান ইত্যাদি দান করা হতো। প্রাপ্ত দানীয় স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে অর্থ নিয়ে চলে যেতো। রামগড় বাজার চৌধুরী ও হেডম্যান মংশে প্রু চৌধুরী’র মতে, ‘পাহাড়ে পড়ালেখা জানাশুনার সুবাদে প্ণাদের প্রশ্ন করছি। তাছাড়া আগেকার দিনের তুলনায় পর্যাপ্ত দান করা হয় না বলেও প্ণাদের আনাঘোনা হয়তো কমেছে’। আমার মা’ হ্লা ক্রা প্রু’র মতে, ‘দুই ধরনের প্ণা দেখা যেতো ‘পে’ প্ণা আর ‘হ’ প্ণা। পে প্ণাদের থেকে ‘পঞ্জিকা’ কিনতে পাওয়া যেতো, বিভিন্ন প্রশ্নে উত্তর দিতে পারতো আর হ প্ণারা খুব বেশি জানতো না, তাই তারা খুব একটা দান দখিনাও পেতো না।’ এক একটি পাড়ায় কয়েকটি প্ণার দল বেড়াতো। মজার ব্যাপার হলো এই প্ণারা খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলায় মারমা পাড়াগুলোতে যাওয়া আসা থাকলেও বান্দরবানে প্ণাদের উপস্থিতি নিয়ে খুব একটা জানা যায় না। তবে সেখানে ‘ডুং’য়ের দল ঘুরে ঘুরে গান গাইতো যা এখনো কিছু কিছু পাড়ায় যায় বলে শুনা যায়। খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি চাকমা পাড়াগুলোতে ‘ডুং’য়ের দল গান গাইতে যাওয়ার ঘটনা আছে।
মারমাদের কাছে প্ণাদের জনপ্রিয়তার কথা প্রফেসর মংসানু চৌধুরী’র একটি লেখায় পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, “বিগত শতকের ষাটের দশক পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমা অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে সমতল থেকে মারমা ভাষা বলতে জানা কিছু হিন্দু ব্রাক্ষণ ঘরে ঘরে সাংগ্রাইং চা সুর করে পড়ে শুনাতেন। ঘরের বয়স্ক পুরুষ ও মহিলারা খুব মনযোগ দিয়ে প্ণাদের সুর করে পড়া সাংগ্রাইং চা শুনতেন”।
এখনকার তরুণরা পাহাড়ে এক সময়ে প্ণাদের জনপ্রিয়তার কথা উপলব্ধি করতে পারার কথা নয়। চুক্তির আগে পর্যন্ত পাহাড়ে নতুন বছরের বার্তা বাহক ছিল এই প্ণারা। সময়ের পরিবর্তনে এখন প্ণাদের বার্তা গৌণ শুধু হয়নি তাদের দেখাও যায় না আর। প্ণাদের কাছ থেকে আগামী এক বছরটি কেমন যাবে আপ্রু আচি (চাল) আনি আচির (শস্য) দাম কেমন হবে, রোদ, বৃষ্টি, বর্ষা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেমন থাকবে জানিয়ে যেতো। কিংবা বয়স্ক গৃহিণীরা প্রশ্ন করে করে জেনে নিতো। পাহাড়ে দিন বদলেছে, বার্তা বাহকের ধরনও বদলেছে। চুক্তির পরে পাহাড়ে অনেক চাংক্রান, বিজু, সাংগ্রাই পাহাড়িরা নিজেরা বজর্ন করেছে আবার কিছু কিছু বছরে বিজু, সাংক্রাই হতেই পারেনি। এমন অনেক সাংগ্রাই গেছে যেখানে আনন্দ, খাওয়া-দাওয়া, খুশি আর নাচ গানের বদলে আয়োজন করা ‘শান্তির মিছিলে’ অংশগ্রহণ করেছে।
নিকট অতীতেও বিজু আয়োজনে চাকচিক্য না থাকলেও উৎসবকে ঘিরে আনন্দ করতো, মন প্রাণ খুলে ভয় ধরহীন ঘুরে বেড়াতো। খাওয়া দাওয়া চলতো। এখন বিহু এলে ‘বড় বড় অতিথি’ আনার প্রতিযোগিতা চলে। ব্যানারে বড় বড় ক্ষমতাশালীদের নাম লিখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার প্রচারণা চলে। বৈসু, সাংগ্রাইকে ঘিরে যে খেলা আয়োজন করলে হাজার হাজার লোকের সমাগম, ধুলাবালি, ঠেলাঠেলির একটি পরিস্থিতি তৈরি করবে, সেই সব খেলাই চলে।
সাংক্রাই, সাংগ্রাই কেমন হবে? সে বার্তা বাহক প্ণার বদলে পার্বত্য পাহাড়ে ‘মনুষ্যসৃষ্ট অপ্রাকৃতিক পরিবেশ পরিস্থিতি’ ঠিক করে দেয় বিজুটি কেমন হবে, বছরটি কেমন হবে। আজকালকার তরুণ, শিশুরা তাই প্ণাদের চেনার বদলে ‘অপ্রাকৃতিক কিছু উপাদানের’ দিকে তাকিয়ে থাকে। পাহাড়ে নানা প্রতিকুলতার মাঝেও বিজু এলে সকলে মনখুলে উদযাপন করতে চায়। তরুণদের কিছু অংশ বিজু আনন্দে মেতে উঠতে পারলেও পাহাড়ে প্ণাদের যুগকে পাওয়া বয়স্ক নাগরিকরা পরিবর্তনগুলো দেখে আনন্দ করার বদলে নিরব হতাশা নিয়ে সাংগ্রাইয়ের আনন্দময় দিনগুলোতে ঘরেই কাটিয়ে দিতে দেখা যায়।
পাহাড়ে এই সামাজিক উৎসবটি দিনদিন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠনে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন দলে, নানা রূপে উৎসব উদযাপন করছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও পাল্লা দিয়ে আয়োজনে অংশগ্রহণ করে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, আমাদের এই সামাজিক উৎসবটি সমাজের দুই এক শ্রেণি পেশার মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে। উৎসবকে সামনে রেখে মেলা, র্যালি, পানি খেলা হয়। এই সব আয়োজনে শিক্ষিত শহরকেন্দ্রিক চাকরিজীবি আর পড়ালেখা করিয়ে তরুণ-তরুণীরা অংশগ্রহণ করছে, মজা করছে, রঙবেঙের পোষাকে ছবি তুলে ফেসবুকে ভরে ফেলছে। বিজু সাংগ্রাইং উৎসবের উপকরণ সবই আসে গ্রাম থেকে, কিন্তু শহরকেন্দ্রিক সমাজ তাদের মেলায়, আনন্দে গ্রামবাসীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে দেখা যায় না। আমাদের গানে, নাচে, কবিতায়, গল্পে গ্রামবাসী জুমিয়াদের সবর উপস্থিতি থাকলেও আমাদের আনন্দ আয়োজনে তাদের অংশগ্রহণ দেখা যায় না। আমাদের অনুষ্ঠানগুলোও এমনভাবে সাজিয়ে ফেলি যেখানে গ্রামীণ সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ করার কোন সুযোগ থাকে না।
প্ণাদের ‘সাংগ্রাইং চা’ তে দেবরাজ ইন্দ্রকে এক এক বছর একএক প্রাণীর পিঠে চেপে লোকভূমিতে আসার বার্তা পাওয়া যায়। সে প্ণাদের যুগ নেই বলে সরকার বাহাদুরের মনমানসিকতা দেখে নতুন বছরটি কেমন যাবে অনুমান করতে হয়। সরকার বাহাদুর কি চান তা আমরা পাহাড়িরা প্রতি বছর মার্চ-এপ্রিল এলে কিছুটা টের পাই। এ বছর নতুন একটি বার্তা যুক্ত হয়েছে, যা পাহাড়ের শিক্ষিত মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্য মন খারাপের সাংগ্রাইং হিসেবে থেকে যাবে বলে আমার ধারণা। প্রতি বছর বিসিএস পরীক্ষায় কয়েকজন পাহাড়ি বিভিন্ন ক্যাডারে সুযোগ পেয়ে থাকেন। মেধাবী পাহাড়ি ছাত্রছাত্রীরা বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আনন্দের বন্যায় ভরে উঠতো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে জেনেছি, ৪০তম বিসিএস এ পাহাড় থেকে মোট ১১ জন মৌখিক পরীক্ষা দিলেও কেউ ক্যাডার কর্মকর্তা পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হননি। ফলে মেধাবী ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক এবং বর্তমান ও আগামীর বিসিএস পরীক্ষার্থীরা কিছুটা হতাশ।
পাহাড়ে বম, খুমী, খিয়াং, ম্রো জনগোষ্ঠী থেকে একজনও বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা নেই। এই সব জনগোষ্ঠী থেকে সবেমাত্র দুই একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শুরু করেছেন। আগামীতে এই সব জনগোষ্ঠী থেকে বিসিএস পাশ করা সরকারি কর্মকর্তা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটা বন্ধ হয়ে গেল।
পাহাড়ে সাংগ্রাইং, বিজু, সাংলান, বিষু আছে বলেই সমতলের লোকজন দলবেঁধে পাহাড় দর্শনে যায়। প্রকৃতির সন্তানদের পেয়ে শত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও পাহাড়ে কিছু বন, প্রাণ-বৈচিত্র্য এখনো টিকে আছে। বিসিএসে কোটা বন্ধ করে দেয়ার ফলে শুধু ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীরাই বঞ্চিত হলো না, সরকার, প্রশাসন, উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের মাঝেও বৈচিত্র্য, ভিন্নভাবে দক্ষ-মেধাবী এবং দেশকে নানা জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ হারালো। এবারের সাংগ্রাইং শুধু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের মন খারাপের সাংগ্রাইং নয়, একইসাথে বাংলাদেশও বৈচিত্র্যময়, সুন্দর এক দেশ হয়ে উঠার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে চললো। যারা স্বপ্নের বাংলাদেশ দেখার লক্ষ্যে মনপ্রাণ দিয়ে কাজ করছেন, তাদেরকেও সমানভাবে ব্যথিত করবে বলে আমার ধারণা।
পাহাড়ে জন্ম নেয়া তরুণ-তরুণীরা নানা পরিবেশ পরিস্থিতি, সামাজিক- রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রাকৃতিক পরিবেশের বাধা পেরিয়ে পড়ালেখা করে যদি বিসিএসের নানা ধাপ পেরিয়ে নন ক্যাডারে সুপারিশ প্রাপ্ত হতে পারেন, তারা সত্যিকার অর্থেই সেরা মেধাবী। তাদের মেধাকে মূল্যায়ন করতে না পারাটি ছাত্রছাত্রীদের ব্যর্থতা নয়, বরং নির্বাচন প্রক্রিয়ারই একটি সীমাবদ্ধতা। ক্যাডার কর্মকর্তা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বৈচিত্র্য ধারণে (যদি) ব্যর্থ হয়ে থাকলেও, কিন্তু পাহাড়ে নানা জনগোষ্ঠীর মানুষ একত্রে বসবাস করতে জানে। পাহাড় সারা দেশকে তার নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আজও ভাল কিছু উদাহরণ দেখানোর ক্ষমতা রাখে। পাহাড়ে সামাজিক উৎসব বিজু, সাংলান আকর্ষণীয় হয় সেখানে সকল জনগোষ্ঠী পালন করে বলে, অংশগ্রহণ করার সুযোগ থাকে বলে। দেশ গঠনেও সকল শ্রেণি পেশার মানুষের মেধা নিয়ে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলার সুযোগ থাকা চাই। সবাইকে পাহাড়ের সামাজিক উৎসব বিষু , বিজু, সাংগ্রাইং শুভেচ্ছা।
লেখক : একজন উন্নয়নকর্মী ও গবেষক,পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে একজন সচেতন চিন্তাশীল মানুষ
( খোলা জানালা’ বিভাগে প্রকাশিত সকল লেখার ভাবনা লেখকদের নিজস্ব। এই বিভাগের কোন লেখার-ভাবনার বা চিন্তা পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম এর সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে সম্পর্কিত নয়)
