থানচি প্রতিনিধি ॥
বান্দরবানে থানচিতে দুর্গম রেমাক্রী ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবায় গর্ভবতী ও প্রসূতিদের নিরাপদ আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে গ্রীন হিল মা-মনি প্রকল্পের মিডওয়াইফ রোয়ালজিম বম। একসময় এ দুর্গমে গর্ভবতী ও প্রসূতি মা-দের নিরাপদ প্রাতিষ্ঠানিক প্রসূতি স্বাভাবিক ডেলিভারি সেবা কার্যক্রম রেমাক্রী মত এলাকার ছিলো একটা স্বপ্ন। বর্তমানে এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের স্থানীয় রেমাক্রী ইউপি চেয়ারম্যান মেম্বারদের সহায়তায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে রোয়ালজিম।
সম্প্রতি রেমাক্রী ইউপি ভবনে সাব সেন্টার সার্ভিস ডেলিভারি পয়েন্ট কার্যক্রম শুরু করলে গত শনিবার প্রথম একটি নিরাপদ প্রাতিষ্ঠানিক নরমাল ডেলিভারি হয়। স্বাস্থ্য বিভাগের সহায়তায় ইউএসএআইডি অর্থায়নে বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন ও গ্রীন হিল যৌথ উদ্যোগে মাতৃত্ব স্বাস্থ্যসেবা মান উন্নয়নের জাতীয় প্রোগ্রাম ‘মা-মনি-এমএনসিএস’ এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
সরেজমিনে জানা গেছে, পরিবারে সদস্যদের পরামর্শে ২০১৮ সালে বান্দরবানে নার্সিং হোমের মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং স্বাভাবিক প্রসূতি সেবা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে চার বছর পর প্রশিক্ষণ শেষ করে ২০২১ সালে শেষ দিকে রেমাক্রী বাজারে চলে আসেন থানচি উপজেলা সন্তান রোয়ালজিম বম। পরে, মা-মনি প্রকল্পের সাথে মিডওয়াইফ পদে সংযুক্ত হলে নিজ এলাকায় নিরাপদ সন্তান প্রসবের জন্য বিভিন্নভাবে সচেতন কার্যক্রম শুরু করেন তিনি। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেম্বারদের সহযোগিতায় পরিষদে দুইটি কক্ষ বরাদ্দ পান। সেখানে গত ২১ এপ্রিল সাব সেন্টার সার্ভিস ডেলিভারি পয়েন্ট কার্যক্রম শুরু করেন তিনি। তাদের নতুন কার্যক্রমে স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে রেমাক্রী ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডে মংম্যা কার্বারি পাড়া (বর্তমানে গ্রোপিং পাড়া) বাসিন্দা নব দম্পতি উচমে মারমার গত শনিবার রাতে প্রসবের যন্ত্রণা শুরু হলে ঐ সার্ভিস সেন্টারে ছুটে যান। সেখানে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে একজন কন্যা সন্তান প্রসব করা হয়। মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা নতুন করে সম্ভাবনা স্বপ্ন দেখে দুর্গম রেমাক্রী ইউনিয়নের বাসিন্দাদের।
রেমাক্রী ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডে মেম্বার হ্লাথোয়াইপ্রু মারমা বলেন, গত নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গর্ভবতী ও প্রসূতি মা সন্তান প্রসবে সময় মৃত্যু নয়, এবার ইউনিয়ন পর্যায়েও মা ও শিশুদের নিরাপদ স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছিয়ে দিতে সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগ, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর নিরলসভাবে কাজ করছে। এরই ধারাবাহিকতা রেমাক্রী ইউনিয়নও এর সুফল পেতে শুরু করেছে।
একই ইউনিয়নের ১,২,৩ নং ওয়ার্ডে সংরক্ষিত নারী সদস্যা উমাচিং মারমা বলেন, একজন গর্ভবতী নারী স্বাভাবিক প্রসবের জন্য রেমাক্রী হতে থানচি সদর পর্যন্ত যেতে ৪-৫ ঘন্টা সময় লাগে। যাতায়াত খরচ হয় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। ঐ সময়ের যদি দুর্ঘটনা ঘটে সে দায় কে নিবে? বর্তমানে বিনা খরচে এখানে নিরাপদ প্রাতিষ্ঠানিক নরমাল ডেলিভারি সেবা পাওয়া এলাকার জন্য স্বস্তির খবর।
কথা হলে রোয়ালজিম বম এর সফলতা খবর পেয়ে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি অর্থায়নের সেভ দ্যা চিলড্রেন ও বান্দরবানে স্থানীয় এনজিও সংস্থা গ্রীন হিল বাস্তবায়নের মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা মা-মনি প্রকল্প হাতে নেন ২০২১ সালে। থানচি উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরে যৌথ তত্ত্বাবধানের প্রকল্পটি শুরু করেন গত জুলাই ২০২১ সালে। প্রয়োজন যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র ও বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে গত এপ্রিল ২১ তারিখ বৃহস্পতিবার মা-মনি প্রকল্প নামে চালু করেন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পরিষদের ভবনের ২য় তলা দুইটি কক্ষ বরাদ্দ দেন।
কথা হয় নব দম্পতি উচমে মারমা বলেন, আমার স্বামী জুম চাষী খুবই গরীব। সন্তান প্রসবের জন্য খুবই চিন্তা ছিলাম, এলাকার গর্ভবতীদের খোঁজখবর নেন রোয়ালজিম বম। ওনার পরামর্শে সুস্থভাবে স্বাভাবিক প্রসব করে সাফল্য পেয়েছি। তাকে হাজারো দোয়া করি তার কর্মজীবনে আরও সফলতা আসুক।
রোয়ালজিম বম জানান, অত্র এলাকার অনেক গর্ভবতী রয়েছে আমার একা পক্ষে সম্ভব নয়। এই কাজে সহায়তা করছেন পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের পরিবার কল্যাণ সহকারী ওয়ানুচিং মারমা, স্বেচ্ছাসেবক নাংজিংপ্রু মারমা। আমি আমার দায়িত্ব ও কাজ ভালবেসে যাবো এবং ক্লান্তিহীন কাজ করে যাবো।
যোগাযোগ করা হলে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ওয়াহিদুজ্জামান মুরাদ বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আছে বলে আজকের স্বাস্থ্য বিভাগকে গ্রামেগঞ্জে অতি দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অনাদির রঞ্জন বড়ুয়া বলেন, বিনামূল্যে মা ও শিশু সুরক্ষায় নরমেল ডেরিভারি টিমের কাজ করছেন অনেক। অত্র উপজেলা সদর ছাড়াও বলিপাড়া ইউনিয়নের সরকারিভাবে পরিবার কল্যান কেন্দ্র রযেছে। অপর দুই ইউনিযনের মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্র্ণ ছিল। আমাদের অধিদপ্তরে সহযোগিতায় রেমাক্রীতে মা- মনি প্রকল্পের সার্ভিস পয়েন্ট চালু হয়েছে এবং সফলতা পেয়েছে। এ কার্যক্রম সফলতা পাওয়া প্রতিদিনই বাড়বে প্রসূতি মায়ের সেবা প্রার্থীর সংখ্যা। সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছে আমাদের স্বাস্থ্য সেবা কর্মীরা।
