ইয়াছিন রানা সোহেল ॥
রাঙামাটির আসামবস্তি আগরবাগান এলাকায় সিএনজি অটোরিকশা পুড়িয়ে দেয়ার পর শনিবার রাতে শহরে সিএনজি অটোরিকশা ও চালকের ওপর হামলার প্রতিবাদে রবিবার অনির্দিষ্টকালের জন্য সিএনজি অটোরিকশা বন্ধের ঘোষণা দেয় সিএনজি অটোরিকশা চালক সমিতি। রবিবার সকাল থেকে শহরের একমাত্র চলাচলের বাহন সিএনজি অটোরিকশা চলাচল বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়ে শহরবাসী। এসময় স্থানীয় সাংসদ দীপংকর তালুকদার ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং দোষীদের গ্রেপ্তারের প্রশাসনের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে সকাল এগারোটার পর আবারো শহরে অটোরিকশা চলাচল শুরু হয়।

এসব ঘটনায় তাৎক্ষণিক রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রবিবার বেলা সাড়ে এগোরটায় জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি দীপংকর তালুকদার এমপি। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অংসুইপ্রু চৌধুরী, ডিজিএফআই রাঙামাটি কমান্ডার কর্নেল খন্দকার তারিকুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মীর মোদ্দাছ্ছের হোসেন, রাঙামাটি সদর জোন কমান্ডার লে. কর্নেল আশিকুর রহমান, জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. মুছা মাতব্বর, পৌর মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সরকারি উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে দীপংকর তালুকদার এমপি বলেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সকলকে নিয়ে প্রতিরোধ করতে হবে। রাজনীতিবিদদের সত্য কথাটা বলার সাহস থাকতে হবে। তিনি বলেন, আমরা অবৈধ সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তুলেছিলাম। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে অনেক মানুষ সাহসী হয়েছে, সচেতন হয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকজন এখন চাঁদা দিতে চায় না, প্রতিরোধ করতে শিখেছে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত চালক কামাল হোসেনের জন্য একটা নতুন সিএনজি অটোরিকশা কিনে দেয়ার আশ্বাস দেন। ক্ষতিগ্রস্ত সিএনজি চালকদের আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, হামলার পাল্টা হামলা চালানো সমাধান নয়। অরাজকতা করে শান্তি আসবে না। সস্ত্রাসীদের জাতপাত নাই। এদের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানান তিনি। তিনি বলেন, অপ্রীতিকর যেসব ঘটনা ঘটেছে সেসব ঘটনা যেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দিকে না যায়। সেজন্য সকলকে সজাগ থাকতে হবে।
সভায় জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অংসুইপ্রু চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্যে করছি যারা ঘটনা ঘটায় তাদের লক্ষ্য চাঁদাবাজি এবং এলাকায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। আগে অনেকবার হয়েছে। এটা দুঃখজনক। এই ধরনের ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে না ঘটে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা এবং প্রশাসনের আন্তরিকতায় দেশে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড কমে আসছে।
ডিজিএফআই কমান্ডার কর্নেল খন্দকার তারিকুল ইসলাম বলেন, সবার উদ্দেশ্য একটাই শান্তি সম্প্রীতি চাই। তারপরেও কেন শান্তি সম্প্রীতি বিনষ্ট হচ্ছে। কেউ কেউ শান্তি সম্প্রীতি চায় না। এজন্য বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। সকলকে সমন্বিতভাবে প্রচেষ্টা চালাতে হবে এদের প্রতিরোধ করার জন্য। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত দুই চালক চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের উদাহরণ। তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঠিক। কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথানত করেনি। তারা চাঁদা না দিয়ে প্রতিরোধ করেছে। তিনি চাঁদাবাজদের প্রতিরোধে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহবান জানান।
পুলিশ সুপার মীর মোদ্দাছছের হোসেন বলেন, শান্তি চুক্তির প্রথম শর্তই ছিল অস্ত্র সমর্পণ করা। কিন্তু তারা সেটাই করেনি। তিনি বলেন, যাদের কাছে চাঁদা চায় তারা পুলিশের সাথে যোগাযোগ করবেন। সাদা পোশাকে পুলিশে আপনাদের সহযোগিতা করবে। তারপরেও চাঁদা দিবেন না। তিনি বিট পুলিশ দিয়ে প্রতিটি ওয়ার্ডে একাধিক সম্প্রীতি সমাবেশ করার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সদর সার্কেলকে নির্দেশ দেন। সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত নয় শুধু; তাদেরকে ধরে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।
রাঙামাটি সদর সেনা জোন কমান্ডার লে. কর্নেল আশিকুর রহমান বলেন, সন্ত্রাসীরা তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করছে। মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে চাঁদাবাজি হচ্ছে। সমন্বিত প্রচেষ্টা তৈরি করতে হবে যেন এর থেকে উত্তরণ হওয়া যায়। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করতে। সামাজিকভাবে সমন্বিতভাবে প্রতিরোধ করতে হবে সন্ত্রাসীদের।
জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. মুছা মাতব্বর বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছিলাম। আবারো করব। আমরা চুক্তি করেছি, চুক্তি বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না জেএসএসের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের কারণে। তাদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বন্ধ করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে জেলাপ্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কোন মতেই সহ্য করা হবে না। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টিকারীদের কঠোরভাবে দমন করা হবে। তিনি বলেন, সম্প্রীতি বিনষ্ট করে সমাজে শান্তি আসবেনা। সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানান।
এতে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন শিক্ষাবিদ নিরূপা দেওয়ান, রাঙামাটি প্রেসক্লাব সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন রুবেল, রাঙামাটি সিএনজি অটোরিকশা চালক সমিতির সভাপতি পরেশ মজুমদার, কাউন্সিলর কালায়ন চাকমা, রবি মোহন চাকমা, স্কাউটসের সহকারী কমিশনার নুরুল আবছার, জাতীয় পার্টি রাঙামাটি জেলা সভাপতি হারুন মাতব্বরসহ বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ।
