সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন থাকা সাবেক ছাত্রনেতা শ্যামল দেব অবশেষে চলেই গেলেন। বুধবার রাতে চট্টগ্রামের এক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নব্বই দশকজুড়ে রাঙামাটির রাজপথের এই ‘লিটল শ্লোগান মাস্টার’। রাঙামাটি সরকারি কলেজ,রাঙামাটি জেলা ছাত্রলীগের সাবেক এই নেতা বাংলাদেশ আওয়ামী মৎসজীবিলীগের রাঙামাটি পৌর কমিটির সাধারন সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। একসময়কার ছাত্রলীগের তুখোড় এই নেতা শেষ সময়ে বেশ আর্থিক সংকটেই ছিলেন। রিজার্ভমুখ স্পোটিং ক্লাব,একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি,বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথেও জড়িত ছিলেন।
রাঙামাটি শহরের রিজার্ভমূখ এলাকার বাসিন্দা শ্যামল ব্যক্তিগতজীবনে বিবাহিত এবং দুই সন্তানের জনক। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করা শ্যামল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দেশের সকল প্রগতিশীল আন্দোলনের সামনের সারির কর্মী ছিলেন এ জেলায়।
এদিকে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান না হওয়ায় ও জরুরী চিকিৎসা নিশ্চিত না হওয়ার কারণে শ্যামল দেবের মৃত্যু হয়েছে, এমন অভিযোগ এনে সামাজিক যোগাযোগ মাধমে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সংগঠনটির বিভিন্নস্তরের নেতাকর্মীরা। অনেকেই শ্যামল দেবের চিকিৎসা কার্যক্রম মনিটর না করায় দলের শীর্ষ নেতাদের দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তুলেছেন। কেউ কেউ আত্মসমালোচনাও করেছেন।
রাঙামাটি সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক ফিরোজ আল মাহমুদ সোহেল লিখেছেন ‘ আমি যেদিন মরে যাবম সেদিন আমায় নিয়ে হবে অনেক সভা,মিছিল,মিটিং চলাকালে কেউ কেউ চাপকে ভেঙ্গে ফেলবে টেবিলও..বাদ দাও এই মরনোত্তর পুরষ্কার,জীবদ্ধশায় যার মূল্যায়ন হলো না,এখন মরণের পর মূল্যায়ন করে তার কি লাভ ? ভালো থাকবেন দাদা ওপাড়ে…ক্ষমা করবেন আমাদের প্রিয় রাজপথকে….’
যুবলীগ নেতা রিপন ত্রিপুরা বাবু লিখেছেন ‘ জীবিত অবস্থায় মূল্যায়ন করতে গেলে নেতাদের পুঁজি বেশি লাগে,মৃত্যুর পর মূল্যায়ন করতে লাগে মাত্র একটি ফুলের মালা।’
স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা জামিল মোস্তফা লিখেছেন ‘ শ্যামল এর মৃত্যুর পর সমবেদনার নাটক দেখে নিজের প্রতি ঘৃণা হচ্ছে। হয়তো আমিও একদিন এভাবেই চলে যেতে পারি,সেই দিন আমাকে নিয়েও নাটক হবে। অথচ বেঁচে থাকতে কর্মীদের খবর নেয় কে ?’
শফিউল আজম নামের এক যুবনেতা লিখেছেন ‘ যে পরিমাণ ফুলের তোড়া,ব্যানার বা ফেসবুক স্ট্যাটাস নিয়ে এমবি খরচ করলেন সে টাকা শ্যামল দাকে সবাই মিলে দিলে চিকিৎসাটা হয়ে যেতো। এখন এর ওর দোষ খুঁজি,আরে আগে আমি কি সেটা চিন্তা করেন।’
জেলা যুবলীগের সহসভাপতি শহীদুল আলম স্বপন লিখেছেন ‘নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অকুতোভয় সৈনিক শ্যামল দেব, আমাদের নিজেদের মাঝে কাদা ছোঁড়াছুড়ি দেখে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ওপাড়ে ভালো থেকো বন্ধু,ক্ষমা করে দিও আমাদের।’
এমন অজস্র ভালোবাসা,ভালোলাগা,অভিমান,অভিযোগ আর অনুযোগের ফুলঝুড়ি মাখা স্ট্যাটাস,শ্রদ্ধায় আর সমর্পনে বৃহস্পতিবার শেষ বিকেলে রাজবাড়ী মহাশশ্মানে দাহক্রিয়া সম্পন্ন হলো নব্বই দশকের শুরু থেকে একবিংশ শতাব্দীর ২০২০ সাল অবধি দীর্ঘ তিন দশক জুড়ে পাহাড়ী এক ছোট্ট শহরের রাজপথের এক নিরবিচ্ছিন্ন সার্বক্ষণিক কর্মীর। রাজনীতি যাকে বেলা শেষে কিছুই দেয়নি,নিজেকে উজাড় করে দিয়েও শূণ্যহাতে ঘরে ফেরা নিবেদিতপ্রাণ এক তরুণ, সহযোদ্ধারা যাকে ‘লিটল শ্লোগান মাস্টার’ হিসেবেই বড্ড বেশি ভালোবাসতো ! রাঙামাটির রাজপথ,পার্বত্য এই শহরের মানুষ যাকে মিস করবে এক অনলবর্ষী বক্তা আর ছান্দিক শ্লোগানিষ্ট হিসেবেও….
