মাত্র ৯ মাসের ছোট্ট একটি শিশু। এখনো কারো কোল ছাড়া চলতেও পারে না। তবুও এই অবুঝ শিশুটি কি করে করোনা আক্রান্ত হলো এই নিয়ে বিস্মিত তার পরিবার,স্বজন,চিকিৎসক ও পুরো রাঙামাটি শহরবাসিই।
বুধবার পর্যন্ত ৬৪ জেলার মধ্যে একমাত্র করোনামুক্ত জেলা হিসেবে থাকা রাঙামাটিতে একই দিনে ৪ জনের করোনা পজিটিভ শনাক্ত হওয়ার পর প্রাথমিক ধাক্কা সামলিয়ে রাঙামাটি শহরবাসির মূল আলোচনার বিষয় এখন এটিই। কি করে সম্ভব একটা ছোট্ট শিশুর করোনায় আক্রান্ত হওয়া !
এনিয়ে শিশুটির পিতার সাথে কথা বলে জানা গেছে নানা তথ্য। শিশুটির পিতা পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কমকে অকপটে জানিয়েছেন ওই শিশুর চিকিৎসা ও আক্রান্ত হওয়ার আদ্যপান্ত।
রাঙামাটি শহরের এক নং পাথরঘাটা এলাকায় বসবাসকারি ওই শিশুর পিতা একজন কোরআনে হাফেজ। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কোরান শিক্ষা দেন তিনি। তার স্ত্রী ও সন্তানরা গ্রামের বাড়ী চাঁদপুরে ছিলেন বেশ কিছুদিন। কিন্তু গত ১৪ ফেব্রুয়ারি তারা গ্রামের বাড়ি থেকে রাঙামাটি আসে। তারা আসার পর তাদের রেখে শিশুটির পিতা নোয়াখালীর মাইজদীতে যান একটি কোরআন শিক্ষা কোর্সে প্রশিক্ষন দিতে। সেখান থেকে তিনি ফেরেন ১৫ মার্চ। তিন সন্তানের মধ্যে তার সর্বকনিষ্ঠ সন্তান আক্রান্ত শিশুটি। গত ২৭ এপ্রিল শিশুটি হঠাৎই প্রচন্ড জ্বরে আক্রান্ত হয়। অবরুদ্ধ শহরেই ওইদিনই তাকে বনরূপায় জনপ্রিয় ফার্মেসীতে চিকিৎসক ডা: ওয়াহিদের চেম্বারে নিয়ে যান তিনি। চিকিৎসক তাকে কিছু ঔষধ দেন এবং ২৪ ঘন্টা শিশুটিকে পর্যবেক্ষন শেষে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে হাসপাতালে কিংবা অন্য কোথাও উন্নত চিকিৎসার পরামর্শও দেন। বাস্তবিকভাবেই ২৪ ঘন্টায়ও শিশুটির অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। বরং জ্বর আরো বাড়ে,সেই সাথে যোগ হয় পাতলা পায়খানা। আর ঔষধের প্রভাবে বমিও করতে থাকে ছোট্ট শিশুটি। এমতাবস্থায় ২৯ এপ্রিল সকালে শিশুটিকে রাঙামাটি সদর হাসপাতালে নিয়ে যান তিনি।
তিনি জানান, হাসপাতালে নিলে ডাক্তার সেখানে শিশু ওয়ার্ডে তাকে ভর্তি করান এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দেয়া শুরু হয়। একইসাথে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনাও সংগ্রহ করে চিকিৎসকরা।
হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসায় শিশুটি সুস্থ হয়ে উঠে এবং ২ হাসপাতাল থেকে নিয়মিত রোগি হিসেবেই ছাড়পত্র দেয়া হয় তাকে। হাসপাতাল ত্যাগের পূর্বে জানানো হয়,তার করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট আসলে মোবাইলে জানানো হবে এবং তাকে একটি নাম্বার দিয়ে বলা হয়,তিনি নিজেও চাইলে যোগাযোগ করতে পারবেন রিপোর্ট এর খোঁজ নিতে।’ কিন্তু বাসায় ফেরার পর শিশুটিকে কিভাবে রাখতে হবে কিংবা করোনা সংক্রান্ত কোন পরামর্শ বা নির্দেশনাই দেয়া হয়নি বলে দাবি তার।
শিশুটির পিতা আরো বলেন-‘ বাসায় ফেরার পর সবকিছুই স্বাভাবিক আছে। আমার সন্তানও সম্পূর্ণ সুস্থ। তার মধ্যে অসুস্থতার কোন লক্ষণই দেখিনি কিংবা এখনো নেই। কিন্তু ৬ মে বুধবার দুপুরে আমাকে জানানো হয় যে,আমার সন্তান করোনা আক্রান্ত এবং বিকালে পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেট এসে আমার কাছে বিভিন্ন তথ্য জানতে চায় এবং আমাদের বাসা ও পুরো এলাকা লকডাউন করে দেয়। বিষয়টি আমার কাছে অবাক করার মতো।’
অসহায় কন্ঠে এই পিতা আরো বলেন, ‘আমার সন্তান কিভাবে আক্রান্ত হবে ? ওতো একা একা কোথাও যেতেও পারেনা,সম্ভবও না। তাকে বাসা থেকে হাসপাতালে নিলাম,সেখান থেকে সুস্থ হয়ে বাসায় আনলাম। সে নিজে নিজে করোনা আক্রান্ত হলো কোথা থেকে ? ’ হাসপাতালে আক্রান্ত নার্সের সংস্পর্শে এসেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না,ওই নার্স শিশু ওয়ার্ডের দায়িত্বে ছিলেন না।’
আক্রান্ত শিশুটির পিতা পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম’কে বলেন- ‘আমার সন্তান যদি করোনা সম্ভাবনার হতো তাহলে কেনো আমাকে হাসপাতাল ছাড়ার সময় বলা হলোনা। আমরা তাহলেই সেভাবেই তাকে রাখার ব্যবস্থা নিতাম। আমার ৯ মাস বয়সী সন্তানের নমুনা নেয়া হলো করোনার জন্য, কিন্তু সে তো একা হাঁটতে বা চলতে পারেনা,স্বাভাবিকভাবেই আমার বা আমার স্ত্রীর নমুনাও তো নেয়ার কথা,সেটাও তো নেয়নি ! আবার হাসপাতাল থেকে আসার পর ছোট্ট শিশুটি আমাদের সবার কোলে ছিলো,আশপাশের প্রতিবেশিরা এসেছে,তারাও কোলে নিয়ে আদর করেছে। এখন কি হবে বুঝতে পারছিনা।’
আক্রান্ত শিশুটির পরিবারের প্রতিবেশি মো: মনজু। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ২৯ এপ্রিল যখন শিশুটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়,তখন আমিও সাথেই ছিলাম। ওর করোনার নমুনা সংগ্রহ করার সময় নার্স বলেছিলো,এখন যে রোগির আসছে তাদের সবারই করোনার নমুনা নেয়া হচ্ছে। তাই তারও নেয়া হলো। কিন্তু সত্যিই যদি তার করোনা উপসর্গ ছিলো,তবে আমাদেরকে তো বলা উচিত ছিলো,আমরা সেইভাবে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিতাম। এখন যদি এই শিশুটি করোনা আক্রান্ত হয়,তবে সেটা কোথা থেকে,কিভাবে হলো ! ’
শিশুটির করোনা ইনফেকশন কোথা থেকে হতে পারে ? জানতে চেয়েছিলাম রাঙামাটি সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা: শওকত আকবরের কাছে। তিনি বলেন-‘ এই ছোট্ট শিশুর আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি আসলেই বিস্ময়কর। আমরাও কোন ক্লু পাচ্ছিনা। কারণ ছোট মানুষ,সে তো একা একা কোথাও যাওয়ারও সুযোগ নাই। এখন আমরা তার সংস্পর্শে আসা চিকিৎসক,নার্সসহ তার পরিবারের সবার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছি,সেই রিপোর্ট না আসা অবধি কোন কিছুই বলা যাচ্ছেনা।’ তবে বাচ্চাটিকে ‘কোন সন্দেহের কারণে নয়, নিয়মিত রোগি হিসেবে’ই করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিলো, বলে জানান হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা এই আবাসিক চিকিৎসক,যিনি নিজেও শহরে একজন খ্যাতিমান শিশু চিকিৎসক হিসেবে সুপরিচিত।
অন্যদিকে রাঙামাটি সিভিল সার্জন কার্যালয়ের করোনা ইউনিটের ইনচার্জ ডা: মোস্তফা কামাল বলেন-‘শিশুটি কিভাবে আক্রান্ত হয়েছে বিষয়টি বলা খুবই কঠিন। পরিবারের কারো সংস্পর্শ ছাড়া সেটা সম্ভবও নয়। যতটুকু জেনেছি,শিশুটির বাবা বাইরে যান,তার মাধ্যমেও হতে পারে। তবে বৃহস্পতিবার ওই পরিবারের বাকি তিনজনের নমুনা এবং শিশুটির নমুনা পুনরায় সংগ্রহ করা হয়েছে, পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। সেই রিপোর্ট আসলেই পরিষ্কার বোঝা যাবে কি করে আক্রান্ত হলো শিশুটি।’
