রাঙামাটিতে দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল। কখনো আঞ্চলিক দলগুলোর আধিপত্য বিস্তার, অন্তঃকোন্দল বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে অথবা সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক নানা ইস্যুতে প্রায়শ ঝরছে প্রাণ। গত জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এই ১১ মাসে রাঙামাটি জেলার শুধু বাঘাইছড়ি ও রাজস্থলী উপজেলায় প্রাণ গেছে ২২জনের।
দুই দশকের রক্তক্ষয়ি বন্দুকযুদ্ধের পর ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি(শান্তিচুক্তি) সংগঠিত হয়। কিন্তু শান্তিচুক্তির পরও পেরিয়ে গেছে দুই দশক। তবুও যেন থামছে না পাহাড় লাশের মিছিল। ঝড়ছে কখনো এক, কখনো জোড়া আবার মাঝে মাঝে সাত আট জনের তাজা প্রাণ। সর্বশেষ গত ১৮ নভেম্বর রাজস্থলী উপজেলার ২নং গাইন্দ্যা ইউনিয়নের বালুমুড়া মারমাপাড়া এলাকায় আঞ্চলিক দলগুলোর আধিপত্য বিস্তারে গুলিবিনিময়ে তিনজনের প্রাণ যায়। নিহত তিন জনের এখনো পরিচয়ও পাওয়া যায়নি।
এছাড়াও গত ১৯ মে রাতে রাজস্থলী বাঙ্গালখালীয়া ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি ক্যহ্লাচিং মারমা কে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ৯ অক্টোবর রাজস্থলী উপজেলার বাঙালহালিয়া ইউনিয়নের কাঁকড়াছড়ি এলাকা থেকে অংসুই অং মারমা(৫০)নামে একজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ২২ অক্টোবর অপহরণের পর ২৩ অক্টোবর সকালে রাজস্থলী উপজেলার হেডম্যান হলুদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য দ্বীপময় তালুকদারের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া য়ায় এবং ১৮ আগস্ট সকালে নিয়মিত সেনা টহলে সন্ত্রসী হানায় মো. নাসিম নামে এক সেনাসদস্য গুরুতর আহত হয় এবং চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
রাজস্থলী উপজেলায় ৭জন ছাড়াও বাঘাইছড়ি উপজেলায় বিগত ১১ মাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মারা যায় ৭জন এবং সরকারি দায়িত্ব তথা উপজেলা নির্বাচন শেষ করে ফেরার পথে দুবৃর্ত্তের হামলায় প্রাণ ৮জন। এদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষক, আনসার সদস্য এবং আহত হন প্রায় ৩০জন।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর বাঘাইছড়ি উপজেলার মারিশ্যা ইউনিয়নের দুর্গম গ্রাম নবছড়ায় প্রতিপক্ষের গুলিতে এমএন লারমা সমর্থিত জনসংহতি সমিতির সমর্থক রিপেল চাকমা(২৫) ও বর্ষণ চাকমাকে(২৪)হত্যা করা হয়েছে।
এছাড়াও বাঘাইছড়িতে এই বছরের বিভিন্ন সময়ে জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা) সমর্থিত বসুদেব চাকমা, চিক্কোধন চাকমা, শতসিদ্ধি চাকমা, এনো চাকমা প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হয়েছেন। গত ২৩ আগস্ট সুমন চাকমা নামে এক ইউপিডিএফ কর্মী আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।
শান্তি চুক্তির এত বছর পরও কেন থামছে না প্রাণহানি এই বিষয়ে সুশীল সমাজে রয়েছে বিভিন্ন মত।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান বলেন, পাহাড়ে শান্তি স্থাপনের জন্য চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে আইন যদি তার নিজস্ব গতিতে চলতে পারে তাহলে এখানে শান্তি আসতে বাধ্য। শান্তিচুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে পাওয়া না পাওয়ার থেকে সংগঠনের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হতাশাও। আর এই কারণে হানাহানির সংখ্যাও বাড়ছে। প্রাণহানির ঘটনা কমাতে হলে রাষ্ট্রকে ও শান্তিচুক্তির পক্ষে বিপক্ষে যেসব দল রয়েছে তাদেরকে সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হতে হবে, তাহলেই পাহাড়ে শান্তি স্থাপন হবে বলে আমি মনে করি।
শিক্ষাবিদ প্রফেসর বাঞ্ছিতা চাকমার মতে পাহাড়ে শান্তি ফিরাতে হলে সবপক্ষকে আন্তরিক হতে হবে। আন্তরিকতাই কোন ধরণের ফাঁকফোঁকর থাকা যাবে না। তাহলেই পাহাড়ে অবশ্যই শান্তি ফিরবে।
প্রবীণ সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে বলেন, পাহাড়ের হত্যাকান্ড একটি রাজনৈতিক সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে শান্তিচুক্তির সম্পাদনকারী উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থা স্থাপন করতে পারলেই পাহাড়ে শান্তি ফিরবে বলে আমি মনে করি।
