পরিবেশ আইন কিংবা প্রশাসনের পরামর্শ,কোনভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছেনা,কাপ্তাই হ্রদের বুকে নির্মিতব্য ফ্রেন্ডস ক্লাব ভবনের নির্মাণ কাজকে। ফলে দ্রুতলয়ে এগিয়ে যাচ্ছে রাঙামাটি শহরের আবাসিক এলাকাখ্যাত তবলছড়ি লঞ্চঘাটের নৌ প্রবেশপথেই বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ। বরাদ্দকৃত ১ কোটি টাকা ইতোমধ্যেই শেষ,বাড়তি আরো দুই কোটি টাকা ছাড়ের জন্য চলছে জোর তদ্বির,কিন্তু থেমে নেই নির্মাণ কাজ। এ যেনো সবাইকে বৃদ্ধাঙ্গুলিই দেখানো ! অথচ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হ্রদ দখল করে তবলছড়ি লঞ্চঘাটের নৌ চলাচলের পথে বহুতল ভবন নির্মাণ কাজের তীব্র বিরোধীতা ও সমালোচনা করছেন স্থানীয়রা। এমনকি এইসব আপত্তির মুখে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক ক্লাব কর্তৃপক্ষের কাছে কৈফিয়ত চাইলে, ক্লাবের একটি প্রতিনিধি দল তার সাথে দেখা ও পরামর্শ করে,নির্মিতব্য স্থাপনাটি আরো দশ ফুট ভেতরে সরিয়ে নেবেন বলে আশ্বস্ত করে এসেছিলেন। কিন্তু জেলা প্রশাসককে দিয়ে আসা সেই আশ্বাস বাস্তবায়নও করতে দেখা যাচ্ছেনা ক্লাবটিকে।
অবশ্য যে পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে এই ক্লাবটি,সেই পরিষদের হাতেই ন্যস্ত পার্বত্য জনপদের প্রশাসনিক ও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পার্বত্য শান্তিচুক্তির কারণে রাঙামাটির সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর সরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান হলো পার্বত্য জেলা পরিষদ। সংস্থাটি নিজেই পরিবেশ আইন লংঘন করায় ক্ষুদ্ধ শহরের সচেতন নাগরিকরাও।
শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বৃষ্টি ও সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে দ্রুত গতিতে নির্মাণকাজ চালাচ্ছে শ্রমিকরা। প্রাত্যহিক শ্রমিকদের সাথে নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে বাড়তি শ্রমিক।
নির্মাণ ঠিকাদার এসএস ট্রেডার্স, যার সত্ত্বাধিকারী মো: জসিম হ্রদের মধ্যে ভবন নির্মাণের কথা স্বীকার করে বলেন, আমি জেলা পরিষদের ঠিকাদার, জেলা পরিষদ যেখানে বলেছে, আমি সেখানেই কাজ করছি। হিল ট্র্যাক্টের নিয়ম অনুযায়ী সব জায়গার মালিক জেলা পরিষদ। হিল ট্র্যাক্টে এমন কত কিছুইতো হয়, বুঝেন, আর এ ক্লাবের বিষয়টাতো একটু অন্যরকম! জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সহ সবাই উপস্থিত থেকে কাজটা উদ্বোধন করেছেন।
এই ঠিকাদার আরো জানিয়েছেন, প্রথমে কাজটি ১ কোটি টাকার ছিলো, যা বর্তমানে বেড়ে তিন কোটি হয়েছে। তবে এই টাকায়ও হবে না। আরো বরাদ্দ প্রয়োজন হবে।
সংশ্লিষরা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে বোট ক্লাবটি নির্মাণে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয় হয়ে গেছে, আরো বরাদ্দ পাবার জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর কাজ চলছে। প্রতিটি তলা ৭০০০ স্কয়ার ফিট হবে আর মূল ভবনটি হবে পাঁচ তলা। পুরো ভবনটিই করা হচ্ছে কাপ্তাই হ্রদ দখল করে, হ্রদের উপরই।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আশরাফুল ইসলাম বলেন, আমি নতুন যোগদান করেছি, প্রকল্পটি গত অর্থবছরের, তাছাড়া প্রকল্পটি চেয়ারম্যান মহোদয় সহ সম্মানিত সদস্যরা গ্রহণ করেছেন। আমি ক্লাবের স্থাপনা বিষয়টি সম্পর্কে খুব ভালো করে জানি না। আমি অবশ্যই বিষয়টি নিয়ে চেয়ারম্যানের সাথে আলোচনা করব।’
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপ পরিচালক মো: জমির উদ্দিন বলেন, পরিবেশ আইন অনুযায়ী হ্রদ দখল করে যেকোন স্থাপনা নির্মাণ করা বেআইনি। আমাদের কাছে বিষয়টি নিয়ে এখনো কেউ অভিযোগ করে নাই। হ্রদ দখল করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ কেউ করলে আমরা অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মেজবাহুল ইসলাম বলেন, লেকের পাড়ে এটি হচ্ছে বলে আমি জানতাম, কিন্তু লেকের মধ্যে হচ্ছে বলে জানতাম না। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এটির জবাব ভালো দিতে পারবে। আমি দেখছি বিষয়টি।’ তবে ‘ক্লাবটি নির্মাণে বরাদ্দকৃত টাকা খরচ করে ফেলায়,নতুন বরাদ্দের জন্য বারবার তদবির করছে’ বলেও জানান সচিব।

এদিকে হ্রদের বুকে বহুতল ভবন নির্মাণের বেস ইতোমধ্যেই শেষ করে ফেলা হলেও, ভবন নির্মাণের অনুমোদনই নেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন রাঙামাটি পৌরসভার। রাঙামাটি পৌর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ভবনটি নির্মাণের জন্য পৌর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেয়া হয়নি। পৌর এলাকায় কোন স্থাপনা নির্মাণ করতে পৌরসভার অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও এ ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে পৌরসভাকে জানানোই হয়নি বলে জানিয়েছে পৌরসভা কতৃপক্ষ।
সরকারি নির্দেশনা না মেনে সরকারি অর্থে কোন ক্লাব নির্মাণে অর্থ ব্যয়কে অনেকটা ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। রাঙামাটির সবচেয়ে বনেদি ও অভিজাত ক্লাব হিসেবে পরিচিত ফ্রেন্ডস ক্লাব অবৈধভাবে হ্রদ দখল করে ভবন নির্মাণ কাজ শহরের কাপ্তাই হ্রদ তীরবর্তী স্থানের দখল কার্যক্রমকে আরো বেশি অনুপ্রাণিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা বখতেয়ার উদ্দিন বলেন, জনগণের অর্থ ব্যবহার করে মাত্র ৬০/৭০ জন অভিজাত মানুষের জন্য এত বিশাল অর্থ ব্যয় এবং হ্রদ দখল করে স্থাপনা নির্মাণ,দুটি কাজই নৈতিকতার দোষে দুষ্ট। জেলার মানুষকে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে যখন বাইর থেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থ সাহায্য লাগছে,সেইসময় এমন অপ্রয়োজনীয় অর্থব্যয়ের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
এই বিষয়ে কথা বলার জন্য যোগাযোগ করা হলে ফ্রেন্ডস ক্লাবের সাধারন সম্পাদক ওয়াশিংটন চাকমা ‘পরে কথা বলবেন’ জানিয়ে মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
প্রসঙ্গত, গত ১৬ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রামের জনপ্রিয় অনলাইন দৈনিক,পাহাড়টোয়েন্টিফোর ডট কম-এ এনিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। কিন্তু এরপর থেকে আরো দ্রæতগতিতে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার।
