শুভ্র মিশু ॥
পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে সম্প্রীতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে রাঙামাটি জেলা প্রশাসক প্রাঙ্গণে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
এতে রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি দীপংকর তালুকদার এমপি। তিনি বলেন, একজন প্রকৃত ধার্মিক কখনো সাম্প্রদায়িক হতে পারেন না। যা মানুষ ধারণ করতে পারে তাই ধর্ম। সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশীপে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ পাহাড়ি-বাঙালি সকলে দেশের জন্য খেলে সুনাম বয়ে এনেছে। আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেলে বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক সমৃদ্ধশালী, ক্ষুধা, দারিদ্রমুক্ত একটি দেশে রূপ নিবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে, তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা বলেন, আমরা যখন ব্লাড ব্যাংকে যায় সেখানে রক্তে এ বি পজেটিভ নেগেটিভ খোঁজা হয়, হিন্দু, মুসলিম খোঁজা হয় না। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড যে কাজ করছে তা সম্প্রতির জন্য, পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের জন্য। আমরা অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ক্ষুধা দারিদ্র মুক্ত বাংলাদেশ গঠনে প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে চলেছি। পঞ্চাশ কোটি টাকার ব্রিজ প্রকল্প আমরা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। সে প্রকল্পে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশীপে সেরা গোলরক্ষক রুপনা চাকমার বাড়ি যাওয়ার বাঁশের সাঁকোর স্থলে ব্রিজ নির্মাণের কাজও রয়েছে। আশা করি প্রকল্পটি বাস্তবায়ের অর্থ আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে পাব।
রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সেলিনা আখতার বলেন, যুদ্ধের সময় তৃতীয় শ্রেণিতে পড়তাম তখন কাপ্তাইয়ে আমাদের বাড়ি থেকে পালিয়ে এক মারমা পরিবারে আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম। তারা আমাদের খাবার যোগিয়ে ছিল। সেসময় হিন্দু পরিবারদের তো নির্যাতন করতোই, পাকিস্তানিরা বাঙালি মুসলমানদেরও মালাউন বলতো। প্রাথমিকে আমার শিক্ষক ছিল খ্রিস্টান, মাধ্যমিকে ও খ্রিস্টান হিন্দু বৌদ্ধ শিক্ষক ছিল প্রায় সবাই। এমই অসাম্প্রদায়িক পরিবেশের মধ্যদিয়ে আমার বেড়ে উঠা। সকলের সাথে কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে বুকে বুক মিলিয়ে অসাম্প্রদায়িকভাবে বিশ^বিদ্যালয় পরিচালনা করতে চাই এতে আশা রাখি আপনাদের সকলকে পাশে পাব।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অংসু প্রু চৌধুরী বলেন, আমরা মনে প্রাণে সকলে বিশ^াস করি সম্প্রীতির বাংলাদেশকে। আমরা কেউ কাউকে হিংসা করি না। কিন্তু মাঝে মধ্যে কেউ কেউ চাই সে সম্প্রীতিকে নষ্ট করতে। তাদের চিহ্নিত করতে হবে। তাহলেই আমাদের সোনার বাংলা কালিমা মুক্ত থাকবে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সেক্টর কমান্ডর কর্নেল মো.তরিকুল রহমান বলেন, কেউ যাতে সম্প্রীতি সমাজে নষ্ট করতে না পারে সেজন্য আপনাদেরই খেয়াল রাখতে হবে। আমরা আপনাদের সহযোগীতায় পাশে আছি সব সময়।
রাঙামাটির জোন কমান্ডার লে. কর্নেল আশিকুর রহমান (পিএসসি) বলেন, সমাজের শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রত্যেকের মাঝে সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে এবং সকলকে সহযোগীতার মনোভাব রাখতে হবে।
রাঙামাটির চাকমা সার্কেল চিফ রাজা দেবাশীষ রায় বলেন, মানুষ মূলত সাম্প্রদায়িক নই। তারা সংঘাত চায় না। আমাদের সমাজে সংঘাতের চেয়ে সম্প্রীতির উদাহারণ অনেক বেশি। সকলের জগতের সকল সত্তার প্রতি মৈত্রি থাকতে হবে, সম্মান থাকতে হবে।
রাঙামাটির পুলিশ সুপার মীর আবু তৌহিদ বলেন, বৈশ্বিক নান কারণে সমাজে বিভক্তি দেখছি। যার কারণে আজকের এই সম্প্রীতি সমাবেশ প্রাসঙ্গিক। কোন দেশ ঐক্য ছাড়া সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে না। বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে অসাম্প্রদায়িকভাবে। এখানে যে সাম্যের বন্ধন যুগ যুগ ধরে চলে আসছে তা আমরা ধরে রাখতে চাই। সে জন্য সকলে একসাথে কাজ করতে হবে।
রাঙামাটির পৌর মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী বলেন, প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর বসাবাসের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্প্রীতির অন্যান্য দৃষ্টান্ত। সে সম্প্রীতি আমরা ধরে রাখতে চাই।
সম্প্রীতি সমাবেশের আয়োজক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সভাপতির বক্তব্যে বলেন, গতবছর দুর্গাপূজায় দেশের অনেক জায়গায় যে সংঘাত হয়েছে, তা মানুষ নই দানবের আচরণ হয়েছে। এই আচরণে আমাদের কি লজ্জা করে না। আমরা যখন মানুষ আমাদের আচরণও মানুষের মত হতে হবে। রাঙামাটিকে আমরা সকলে মিলে গত বছর দুর্গাপূজায় ভালো রাখতে পেরেছি। আমার বিশ^াস এই বছরও আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে দুর্গাপূজা, প্রবারণা পূণিমাসহ সকল ধর্মের সকল অনুষ্ঠান পালন করবো। এই জেলা তার সম্প্রীতির অন্যন্য দৃষ্টান্ত বজায় রাখবে।
সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন, রাঙামাটি প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি সুনীল কান্তি দে, স্কাউট সংগঠক নুরুল আবসারসহ ধর্মীয় প্রতিনিধিবৃন্দ।
সমাবেশ শেষে গত কয়েকদিন আগে সন্ত্রাসী হামলায় পুড়িয়ে দেয়া ও ভেঙ্গে দেয়া তিন সিএনজি চালককে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ লক্ষ চল্লিশ হাজার টাকার চেক হস্তান্তর করা হয়। এতে পুড়িয়ে দেওয়া সিএনজি চালককে পাঁচলক্ষ ত্রিশ হাজার ও গ্লাস ভেঙ্গে দেওয়া দুই চালককে পাঁচ হাজার করে দশ হাজার টাকা প্রদান করা হয়।
