পাহাড়টোয়েন্টিফোর প্রতিবেদন
পিচঢালা সড়কের পাশেই উঁচু সুবিশাল পাহাড়। আগে যেখানে ছিল বিভিন্ন প্রজাতির গাছে পরিপূর্ণ সবুজের আচ্ছাদন। কিন্তু এখন পুরো পাহাড়টির অর্ধেকের বেশি অংশই খাড়াভাবে কেটে সমান করার ফলে যেনো কৃত্রিম ‘মরুভূমি’ তৈরি হয়েছে। এভাবে এর পিছনে ও রাস্তার বিপরীতে হরেক রকমের কায়দায় নির্বিচারে চলছে পাহাড় ধ্বংসযজ্ঞ। প্রায় দুইমাস প্রতিনিয়ত পরিবেশের ওপর এই ভয়াবহ আগ্রাসন চললেও যেন কারো মাথাব্যথা নেই। পরিবেশ সুরক্ষায় পাহাড় কাটায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে এভাবে আইনের তোয়াক্কা না করে নির্বিচারে পাহাড় কাটা চলছে।
রাঙামাটি শহরতলীর জনবর্ধিঞ্চু এলাকা রাঙ্গাপানি। শহরের পাশের এই এলাকার লুম্বিনী পাড়ায় পাহাড়ি পরিবেশে গ্রামীণ জনজীবন। এলাকার বেশিরভাগ মানুষই কৃষিকাজ, জুমচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। পুরো এলাকা জুড়ে সারি সারি পাহাড়। পাহাড় জুড়ে কেউ করেছে মিশ্র ফলের বাগান আবার অনেক পাহাড় জঙ্গলে আবৃত।
লুম্বিনী পাড়ার একেবারে শেষে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়লো সবুজ পাহাড়ে খনন যন্ত্রের দাগ। শুধু একটা পাহাড় নয়; কয়েকটা পাহাড় কেটে একেবারে মাঠ তৈরি করা হয়েছে। পিছনে গিয়ে দেখা যায় আরো পাহাড় কাটা চলছে। শরীরজুড়ে যেন আঘাতের চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়গুলো।
স¤প্রতি লুম্বিনী পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, পিচঢালা পুরো সড়কটিতেই মাটির আস্তরণ। বোঝাই যাচ্ছে মাটি পরিবহন করতে গিয়ে গাড়ি থেকে মাটি পড়ে পুরো সড়কটিতে এ আস্তরণ পড়েছে। ধুলামিশ্রিত সড়কটি ধরে একেবারে শেষ মাথায় যাওয়ার পর দেখা মেলে সবুজের মাঝে পাহাড় কাটার ক্ষতচিহ্ন।
সড়কের পাশেই পুরো কয়েকটি পাহাড় কেটে সাবাড় করে ফেলা হয়েছে। দেখলে মনে হবে কোনো একটা ধূলোবালির মাঠ। মাঠ পেরোলেই পেছনের পাহাড়ের দিকে উঠলে আরো বিশাল কর্মযজ্ঞ। যেখানে আরো কাটা হচ্ছে সবুজ পাহাড়। এক-দুইটি পাহাড় নয়; অন্তত সাত-আটটি পাহাড়ে পড়েছে খননযন্ত্রের দাগ। পাহাড় কাটা অংশে প্রবেশ না করার জন্য ইতোমধ্যে অস্থায়ীভাবে খুঁটি গেড়ে সীমানা প্রাচীর এবং গেট দেওয়া হয়েছে। প্রায় ২০ একর জায়গাজুড়ে চলছে এই পাহাড় কাটার উৎসব।
শুধু এই পাহাড়গুলো নয়; পিচঢালা সড়কের উভয় পাশে চলছে পাহাড় কাটা। স্থানীয়রা এসব পাহাড়ে তাদের গরু-ছাগল ছেড়ে দিলেও এখন পাহাড় কেটে মাঠ হয়ে যাওয়ার কারণে কাটা পাহাড় পিছনে ফেলে আরো কিছু দূরে গরু-ছাগল ছেড়ে দিতে হচ্ছে খাদ্যের জন্য।
পুরো এলাকা ঘুরে কাউকে পাওয়া না গেলেও গরু-ছাগল নিয়ে আসা কয়েকজন স্থানীয়কে এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তারা ‘কিছুই জানেন না’ বলে এড়িয়ে যান। তবে তাদের মধ্যে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘শুনেছি হাউজিং প্রকল্প করবে, এজন্য পাহাড় কাটা হচ্ছে, আগে এসব পাহাড়ে গরু-ছাগলের খাদ্যের জন্য ছেড়ে দিলেও এখন পাহাড় কাটায় আরো অনেক দূরে গিয়ে গরু-ছাগল ছেড়ে দিতে হচ্ছে। পরিশ্রম বেড়েছে।’
রাঙামাটি জেলা শহরের আসামবস্তি-ভেদভেদী সড়কের লুম্বিনী বিহার এলাকায় সাধনাপুরে বিশালাকৃতির বেশ কয়েকটি পাহাড় কেটে ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। সরেজমিন এলাকাটি পরিদর্শন করে দেখা গেছে, পিচঢালা রাস্তার পাশের বড় একটি উঁচু পাহাড় ৯০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেল বা খাড়াভাবে অর্ধেকের বেশি অংশ কাটা সম্পন্ন হয়েছে। পুরো পাহাড়ের গায়ে রয়েছে এক্সকেভেটর দিয়ে কাটার চিহ্ন। রাস্তার পাশের এই পাহাড়টির পেছনের দিকের আরও বেশ কয়েকটি পাহাড়ও কাটা চলছে। পাহাড় কাটার পর পরিত্যক্ত মাটি সরানো হচ্ছে ভারী ট্রাকের মাধ্যমে। তাই ট্রাক চলাচলের জন্য তৈরি করা হয়েছে রাস্তা। এই রাস্তা দিয়েই পাহাড়ের মাটি ট্রাকে করে অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। ট্রাক চলাচলকারী এই পথ ধরে সামনে এগুতেই দেখা পড়ল ভয়াবহ দৃশ্য! প্রথম দিকের উঁচু পাহাড় পিছনের বিশালাকৃতির বেশকয়েকটি পাহাড় কেটে সমান করা হয়েছে। যেখানে একটি এক্সকেভেটরও রয়েছে। তবে ঘটনাস্থলে কাউকে পাওয়া যায়নি। পুরো ধবংসযজ্ঞ স্থানের আয়তন প্রায় ২০ একর হতে পারে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। যার মালিক স্থানীয় প্রভাবশালী মোহন চান দেওয়ান। তবে পাহাড় কাটার সঙ্গে আরও বেশকয়েকজন জড়িত থাকার কথা জানা গেলেও তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সমতল করা জায়গায় একসঙ্গে বেশকিছু খুঁটিও দেখা গেছে। কয়েকটি স্থানে একই খুঁটি স্থাপন করা হয়েছে। আবার পিচঢালা সড়কটির বিপরীতদিকে আরেকটি পাহাড় কেটে সমতল করা হচ্ছে। এতে করে পাহাড়টির উপর দিয়ে তৈরি সড়কটিও ঝুঁকিতে পড়েছে। এই পাহাড়ের মালিক হিসেবে জনৈক রনেল দেওয়ানের নাম জানা গেছে।
এদিকে, পাহাড় কাটার পর পাহাড়ের পরিত্যক্ত মাটিগুলো ট্রাকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রতিনিয়ত মাটিভর্তি ট্রাক যাতায়াতের কারণে এলাকার সরু সড়কটিও উঁচু-নিচু খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। ধুলোয় ধূসর হয়ে পড়েছে সড়কটি। যে কারণে স্থানীয়রাও পড়ছেন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে। তবে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে পাহাড় কাটার বিষয়ে স্থানীয় কয়েকজনের কাছে জানতে চাওয়া হলেও তারা এ ব্যাপারে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় এক ব্যক্তি জানালেন, ‘যারা পাহাড় কাটছেন তারা সবাই এলাকার প্রভাবশালী মানুষ। তারা অবশ্যই সবকিছু ম্যানেজ করেই পাহাড় কাটছেন। স্থানীয়দের এভাবে পাহাড় কাটার পক্ষে না থাকলেও প্রতিবাদ করার মতো অবস্থা কারো নেই।’
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক সাধনাপুর এলাকার এক বাসিন্দা জানান, গত দুইমাস ধরে পাহাড়গুলো এক্সকেভেটর দিয়ে খাড়াভাবে কাটা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বড় বড় বেশকয়েকটি পাহাড় কেটে সমান করা হয়েছে। আরো কয়েকটিও কাটার কাজ চলছে। বড় পাহাড়গুলোর ভূমির মালিক মোহন চান দেওয়ান। তবে পাহাড় কাটার সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন থাকতে পারেন। শুনেছি পাহাড়গুলো ব্যবহার হচ্ছে না বিদেয় সমতল করা হচ্ছে। সেখানে আবাসন প্লট তৈরি করা হবে।’ আরেক বাসিন্দা জানান, পাহাড় কাটার কারণে প্রতিনিয়ত এক্সকেভেটরের বিকট শব্দ দূর থেকে শোনা যায়। আবার ট্রাক যাতায়াতের কারণে সরু সড়কটি ধুলোবালিতে পূর্ণ ও উঁচু-নিচু হয়ে যাচ্ছে। প্রতি ট্রাক মাটি বিক্রয় হচ্ছে ৬০০ টাকা দরে।
পাহাড় কাটার ঘটনায় অভিযুক্ত মোহন চান দেওয়ান বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় সবকিছুতেই উঁচু-নিচু পাহাড়। সামান্য বৃষ্টি পড়লেই পাহাড় কাটতে হয়। নিজেদের জায়গা সেজন্য অনুমতির বিষয়টি দেখা হয়নি আর প্রশাসন থেকেও আমাদের কোন বাধা দেওয়া হয়নি। পতিত পাহাড়টি মূলত কেটে সমান করা হচ্ছে। এখানে বিভিন্ন ফলের চারা রোপন ও খামার করার কথা ভাবছি। তাই পাহাড়ের উপরিঅংশ কেটে একটু সমান করা হচ্ছে। পাহাড়ের মাটির কিছু অংশ জায়গা সমান করার কাজে আর কিছু মাটি বিক্রয় করা হচ্ছে। আমরা মাটির দামও বেশি নিচ্ছি না। মোহন চানের দাবি, কেবল তিনিই নয়; সেখানে আরো কয়েকজনের জায়গা রয়েছে। তারা মোহন চান দেওয়ানের আত্মীয়। তবে তিনি আত্মীয়দের পরিচয় দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে মোহন চান দেওয়ানের সঙ্গে কথা বলার কিছুক্ষণ পরেই মোহাম্মদ নামের এক ব্যক্তি নিজেকে মোহন চান দেওয়ানের বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি বলেন, ‘আমার নাম মোহাম্মদ, আমি মোহনের বন্ধু। এখানে ঘরবাড়ি করব, বাগান করবো। সংস্কার ছাড়া তো করা যায় না; তাই কিছু কাটাকাটি হচ্ছে। সমস্যা নেই একসঙ্গে চা-নাশতা খেয়ে কথা বলব।’ তবে আরেকটি পাহাড়ের মালিক রনেল দেওয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, পাহাড় একটি দেশের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাহাড় বনজ সম্পদ, জীবপ্রজাতি এবং খনিজ ও কৃষিজ পণ্যের উৎস। পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশির ভাগ পাহাড়ের অনেক গভীর পর্যন্ত বালির আধিক্য রয়েছে। ফলে পাহাড় কাটলে ভূমিধসের একটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়। এদিকে পরিবেশবাদীরা বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলাতে সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড় কাটা নিত্যঘটনায় রূপ নিয়েছে। অবাধে পাহাড় কাটার কারণে ঝুঁকিতে পড়ছে পরিবেশ। বিশেষ প্রয়োজনে পাহাড় কাটারক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদফতরের অনুমতির বিধান থাকলেও কেউ অনুমতির তোয়াক্কা করছেন না। রাজনৈতিক ও বিভিন্ন চাপের কারণে দেখা যায় স্থানীয় প্রশাসনও পাহাড় কাটারোধে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করছে না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদারকি না বাড়াতে পারলে ভূ-প্রকৃতি আরো ঝুঁকিতে পড়বে। এছাড়া পাহাড় কাটা বন্ধে স্থানীয়রা সচেতন না হলে কেবল সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষেও এর রোধ করা কঠিন।
রাঙামাটির পরিবেশবাদী সংগঠন গ্লোবাল ভিলেজের নির্বাহী পরিচালক ফজলে এলাহী জানান, পাহাড় কাটার কারণে ভূমিধসের ঝুঁকি থাকে। পাহাড় কাটার বিরূপ প্রভাব কী হতে পারে সেটি রাঙামাটিসহ সারাদেশের মানুষ ২০১৭ সালে দেখেছেন। পাহাড় কেটে অপরিকল্পিতভাবে বসতি গড়ে তোলার কারণে ২০১৭ সালে রাঙামাটিতে শতাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তবুও পার্বত্য এলাকায় পাহাড় কাটা থেমে নেই। কখনো সরকারি, কখনো ব্যক্তি মালিকানাধীন কাজে পাহাড় ধ্বংস চলছে। পরিবেশকে বাঁচাতে স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদফতরে ভূমিকা রাখতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় অধিবাসীদের আরো সচেতনতার প্রয়োজন।
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এর ৬(খ) অনুযায়ী পরিবেশ সুরক্ষায় পাহাড় কাটায় স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই আইনে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারি বা আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কাটা যাবে না বলে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে অধিদপ্তরের ছাড়পত্র গ্রহণক্রমে কোন পাহাড় বা টিলা কর্তন বা মোচন করা যেতে পারে। পরিবেশ আইনের ধারা ১৫ এর দ-বিধানে বলা আছে, পাহাড় বা টিলা কাটার প্রমাণ পাওয়া গেলে অনধিক এক বছর কারাদ- বা অনধিক ৫০ হাজার দ- বা উভয় দ-ের বিধান রয়েছে।
পাহাড় কাটার অনুমতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাঙামাটি জেলাপ্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রাঙামাটিতে পাহাড় কাটার কোন অনুমতি নেই। আমি সদর ইউএনওকে বলে দিচ্ছি। তিনি মোবাইল কোর্ট (ভ্রাম্যমাণ আদালত) পরিচালনা করবেন।
রাঙামাটি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমা বিনতে আমিন বলেন, বিষয়টি জানার পর ইতোমধ্যে আমি স্পটে গিয়েছি। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমরা প্রসেসিংয়ে আছি। এই বিষয়ে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি।
পাহাড়ি জেলা রাঙামাটিতে পরিবেশ অধিদফতরের কার্যালয় না থাকায় এখানে এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নেই বললেই চলে। এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানটির চট্টগ্রাম অঞ্চল কার্যালয়ের পরিচালক মুফিদুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও বক্তব্য জানা যায়নি।
